প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আওয়ামী লীগে ঐক্যের চেষ্টা, বিএনপিতে ‘নবজাগরণ’

ভোরের কাগজ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢেলে সাজানো হচ্ছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে অতীতের হতাশা, দ্ব›দ্ব-সংঘাত ভুলে বিএনপিতে নবজাগরণের হাওয়া বইছে। ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের মাঠ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে এগিয়ে থাকতে চায় এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। প্রধান তিনটি দলের পাশাপাশি ছোট ছোট দলগুলোর নেতারাও নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সিলেট জেলার বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদ ও নেতাকর্মীরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। পুরো জেলায় বইছে নির্বাচনী হাওয়া।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ৬টি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূল পর্যায়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতারা পর্যন্ত রয়েছেন। নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ছোট আকারের সভা সমাবেশ আয়োজন করছেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটের ৬টি আসনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী দলের টিকিট পেতে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন। প্রত্যেকে নিজের গুরুত্ব ও জনসমর্থন দেখাতে দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রায় ৫০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দলের সাত নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণা শুরু করেছেন।

ঢেলে সাজানো হচ্ছে আওয়ামী লীগকে : আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দলের নেতাকর্মীদের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর স্থানীয় পর্যায়ের কোন্দল নিরসন এবং বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্য তুলে ধরতে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে।

বিগত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য অনেক কিছুর সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ সংকটও কিছুটা দায়ী ছিল। দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে আগামী নির্বাচনে শতভাগ জয় নিশ্চিত করতে সিলেটে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন জানান, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রত্যাশিত জয় পায়নি। এ অবস্থায় সিলেট মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সিলেট মহানগরী ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১-এ আসন থেকে যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনিই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচন থেকে এ ধারা চলে আসছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ আসনে অর্থমন্ত্রীর অনুজ জাতিসংঘের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে এম আবদুল মোমেন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ দলীয় মনোনয়ন চাইবেন।

বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনে মনোনয়ন লড়াই হবে সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর মধ্যে। তবে গত নির্বাচনে মহাজোটের সঙ্গে সমঝোতায় দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিলেন দলীয় মনোনয়ন পাওয়া শফিকুর রহমান চৌধুরী।

দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের একাংশ নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী কয়েস। এবারও তিনি মনোনয়ন চাইবেন। তবে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক হাবীবুর রহমান হাবীব।

জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ আবারও মনোনয়ন পাচ্ছেন এটা অনেকটা নিশ্চিত। এখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদ, গোয়াইনঘাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মো. ফজলুল হকও মনোনয়ন চাইতে পারেন।

কানাইঘাট-জকিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন চান জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আহমদ আল কবির। এ দুজনের মধ্যে মাসুক উদ্দিন গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান। তবে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে তিনি নির্বাচনের আগে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। মহাজোটের সঙ্গে সমঝোতায় জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল।

গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৬ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এবার এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন কানাডা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সারওয়ার হোসেন। তবে শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নৌকার মাঝি হবেন বলে দলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন।

সিলেট বিএনপিতে ‘নবজাগরণ’ : দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে, দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা- সবমিলিয়ে বিএনপিতে চলছে দুঃসময়। দলটির এই কঠিন সময়ের মধ্যে সামনে চলে এসেছে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিএনপি যাবে কি না, তা এখনও ধোয়াশাচ্ছন্ন। এ রকম অবস্থায় সিলেটে নীরবেই প্রস্তুত হচ্ছে বিএনপি। তবে গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে আরিফুল হক চৌধুরী যে চমক দেখিয়েছেন তাতে আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে বিএনপি। এই অবস্থায় সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে সিলেটের রাজনীতিতে পরিবর্তনে হাওয়া লেগেছে। এখন থেকেই তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। তবে, আপাতত জামায়াতকে দূরে সরিয়ে রেখেই নির্বাচনের চিন্তাভাবনা করছে সিলেট বিএনপি।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, ‘নির্বাচনের সুন্দর, সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। সরকার যাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে সেজন্য নির্বাচন ও আন্দোলন দুটির প্রস্তুতিই নিচ্ছে সিলেট বিএনপি। নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সে অনুসারে প্রস্তুতি আমাদের আছে।

সূত্র জানায়, দলের হাইকমান্ড সারাদেশের ন্যায় সিলেট জেলার ৬টি সংসদীয় আসনেরই প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেছে। সিলেট-১ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী হচ্ছেন দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানী নগর) আসনে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনার মনোনয়ন পাওয়া অনেকটা নিশ্চিত। সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন যুদ্ধ নেমেছেন সাবেক সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। এদের মধ্যে শফি চৌধুরী এগিয়ে রয়েছেন। সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর) আসনে সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম ও গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের দুবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী মাঠে রয়েছেন। তবে দিলদার হোসেন সেলিমের শারীরিক দুর্বলতার কারণে দলীয় মনোনয়ন পেতে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন আবদুল হাকিম চৌধুরী। সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ ফরিদ চৌধুরী, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর ভাই ও কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের শামীম ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সল আহমদ মনোনয়ন চাইবেন।

সিলেটে ৬টির মধ্যে ৩টিই চায় জাতীয় পার্টি : সিলেটে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে ২টি জাপাকে ছেড়ে দিলে এ আসনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় এমপি নির্বাচিত হন জাপা দলীয় প্রার্থীরা। এবারও শেষ পর্যন্ত জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের কাছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে ৩টি আসনে ছাড় চাইবে জাপা।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এমপি ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে দেশের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে আসন ভাগাভাগির বিষয় আসবে। সার্বিক পরিস্থিতিতে সিলেটে স্বাভাবিকভাবে জাতীয় পাৃর্টি গতবারের চেয়ে বেশি আসন চাইবে। এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের সঙ্গে জোট হওয়ায় তাদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। সিলেটে তারাও কয়েকটি আসনে নির্বাচন করতে চাইবে।

সিলেট-২ আসনে ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া ও সিলেট-৫ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম উদ্দিন আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অবশ্য সেলিম উদ্দিন নিজের বাড়ির সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে নির্বাচনের কথাও ভাবছেন। আবার নিজেদের জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের একাংশের আমির প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবর রহমানের জন্য সিলেট-৬ আসন দাবি করার কথা ভাবছে জাতীয় পার্টি। এ ছাড়া দলের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য এ টি ইউ তাজ রহমানের জন্য সিলেট-৪ (গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর-কোম্পানীগঞ্জ) আসনে সমঝোতা চাইবে জাতীয় পার্টি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ