প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফুটপাত ভাড়ায় পকেট ভারী

কালের কন্ঠ : বগুড়া শহরের ব্যস্ততম রেলস্টেশন এলাকা। এক সপ্তাহ আগেও সেখানে ফুটপাত ছিল। লোকজন ব্যস্ততম সড়ক বাদ দিয়ে নিরাপদে হাঁটাচলা করতে পারত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে রাতারাতি জায়গাটি দখল হয়ে গেছে। ছোট-বড় মিলিয়ে ১০টি দোকান করা হয়েছে ফুটপাতের পুরোটা জুড়ে।

রেলস্টেশন থেকে অল্প দূরে শহরের সাতমাথা এলাকা। এখানকার চিত্র আরো ভয়াবহ। সাতটি রাস্তার প্রতিটির ফুটপাত, সড়কের ডিভাইডার, মার্কেটের করিডরসহ পার্কিং এলাকায় দখল করে দোকান বসেছে। কোনোটা ভ্রাম্যমাণ আবার কোনোটা স্থায়ী। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা উঠছে এসব দোকান থেকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুটপাত অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে তোলা চাঁদার টাকা নিচ্ছে পুলিশ ও পৌরসভার তদারককারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভাসহ পুলিশের বিশেষ সভায় প্রতিবারই সিদ্ধান্ত হয় শহরে যানজট কমানোসহ সৌন্দর্যবর্ধনের স্বার্থে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার। কিন্তু সিদ্ধান্তের পর পুলিশি অভিযান চলে লোক দেখানো। কারণ যারা উচ্ছেদের দায়িত্বে রয়েছে, তারাই অবৈধ চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি ফিট জায়গা আগে ১০০ টাকা দিন হিসেবে ভাড়া দেওয়া হতো সাতমাথা এলাকায়। এখন ভাড়া বেড়ে দেড় শ হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ ফিট জায়গার দৈনিক ভাড়া ৭৫০ টাকা। এই টাকার অর্ধেক পায় পুলিশ, বাকিটা পৌরসভা। শহরের সাতমাথা এলাকার ফল বিক্রেতা আবুল মিয়া জানান, পুলিশ তাড়িয়ে দিলে তাঁরা আধঘণ্টা সরে থাকেন। এরপর আবার দোকান বসান। অভিযানের খবর পুলিশই তাঁদের জানিয়ে দেয়। তিনি বলেন, মোটা করে ও লম্বামতো দুই পুলিশ সদস্য প্রতিদিন ৭০ টাকা করে চাঁদা নিয়ে যায়। পৌরসভার পুলিশ (পৌর পুলিশ) সদস্যরা এসে নিয়ে যায় বাকি ৭০ টাকা।

শহরের খোকন পার্ক এলাকার ফুটপাতে শার্ট ও গেঞ্জি বিক্রেতা পিন্টু হোসেন জানান, মাসখানেক আগে ট্রাফিক পুলিশ তাঁর মালামাল তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পরে এক হাজার টাকা দিয়ে তিনি এগুলো ছাড়িয়ে আনেন। আর যাতে মাল না ধরে সে জন্য প্রতিদিন সদর ফাঁড়ি ও ট্রাফিক পুলিশকে ৫০ টাকা করে দিতে হয়। তাঁর মতো ওই এলাকায় আরো ৩০-৪০ জন ব্যবসায়ী আছেন, যাঁরা নিয়মিত চাঁদা দেন।

শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার চারপাশে কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক, থানা মোড়, টেম্পল রোড, নবাববাড়ী সড়ক, শেরপুর রোড, স্টেশন রোড, গোহাইল রোডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অস্থায়ী দোকান। তবে অস্থায়ী হলেও কোনো কোনো এলাকায় দোকানের মালামাল রাতে সরানো হয় না।

ক্রেতাদের স্বার্থে হকাররা তাদের নিজস্ব এলাকাও ভাগ করে নিয়েছে। যেমন স্টেশন রোডে পাওয়া যাবে ফল, কাজী নজরুল ইসলাম সড়কে শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি, রুমাল, জুতা-স্যান্ডেল; খোকন পার্কে গাছ, ফুল, বেল্টসহ অন্যান্য ছোট সামগ্রী; ডাকঘরের সামনে স্টেশনারি, চা, ফুচকা; পার্কিং এলাকায় তালা, টেম্পল রোডসহ সাতমাথা চত্বরে চটপটি, ফুচকা, কাবাব।

ফুটপাতে বসা হকাররা জানায়, প্রতিদিন তাদের ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। চাঁদার পরিমাণ নির্ধারিত হয় ব্যবসার ধরনের ওপর। যার যত বিক্রি, তার তত চাঁদা। পুলিশ ও পৌরসভার কর্মচারীরা এসব চাঁদার টাকা উত্তোলন করে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর। না দিলেই সমস্যা। মালামাল ধরে নিয়ে যায়। মারধরও করে।

এর আগে বগুড়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাবেক জেলা প্রশাসক নূরে আলম সিদ্দিকী পৌরসভা ও পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ঢোল পিটিয়ে শহর দখলমুক্ত এবং পরিচ্ছন্ন অভিযান করার ঘোষণা দেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। তাঁর এই উদ্যোগের পর কেউই সেটি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়নি। যে কারণে আবার আগের চেহারা ফিরে এসেছে।

এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাম উল্লেখ না করার শর্তে বলেন, ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। আর ছিন্নমূল হকারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে দেখা যায়, তারা আবার তাদের পসরা সাজিয়ে বসে। এটি একটি চক্রের কাজ। তবে এ কারণে ভবিষ্যতে শুধু সতর্কতা অভিযান নয়, অবৈধ দখলকারীদের জেল-জরিমানাও করা হবে।

চাঁদা আদায়ের বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন বগুড়া সদর ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক শেখ ফরিদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফাঁড়িতে মোটামতো কয়েকজন পুলিশ আছে এটা ঠিক। তবে কে সে এটা জানি না। আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান চালাই। হকাররা মিথ্যা অভিযোগ করেছে।’

বগুড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ ও পৌরসভার কিছু অসাধু কর্মচারী জড়িত থাকার কারণে হকাররা সাহস পেয়ে যায়। এর পরও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

পুলিশ সুপার আশরাফ আলী ভূইয়া বলেন, ‘কোনো ধরনের চাঁদা আদায় করে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ