প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পঞ্চগড়ে চা চাষিদের ভাগ্যবদল

বাংলাদেশ প্রতিদিন : তেঁতুলিয়ার ছোট্ট একটি গ্রামের নাম ডিমাগজ। গ্রামের আনোয়ারুল হকের (৪০) বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অবসরের কিছুদিন পরই মারা যান। তাঁর দেনা পরিশোধ এবং পরিবার চালাতে গিয়ে চরম সংকটে পড়ে যায় পরিবারটি। তবে গ্রামের অন্যদের দেখাদেখি বাড়ির আশপাশের তিন বিঘা জমিতে চা লাগান বিএ পাস আনোয়ারুল। তারপর মাত্র পাঁচ বছরে বদলে গেছে তাদের জীবন। বাবার দেনা পরিশোধ করে এখন আরও কয়েক বিঘা জমিতে চা লাগিছেন আনোয়ারুল হক। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র চা চাষের সুযোগ আমার পরিবারকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছে।’

বাড়ির সামনে ১৬ শতক সুপারি বাগানে সাথী ফসল হিসেবে চা চাষ শুরু করেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের মহারাজাদীঘি এলাকার শফিকুল ইসলাম। এখন তার বাগানের পরিমাণ ৮৯ একর। ৪০ দিন পরপর মোট চা পাতা সংগ্রহ করেন ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ কেজি। তাতে আয় হয় ৩৬ হাজার থেকে ৪২ হাজার টাকা। সদরের শালবাহান ইউনিয়নের মাঝিপাড়া এলাকায় পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়ক ঘেঁষে বাড়ির সামনের ভিটায় পাঁচ শতকজুড়ে চা বাগান করেছেন ইয়াসিন আলী। দুই বছর বয়সী এ বাগান থেকে এর মধ্যেই তিনবার পাতা সংগ্রহ করেছেন তিনি। এভাবেই আজ দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চা চাষ করে ভাগ্য বদলে গেছে ক্ষুদ্র চা চাষিদের। বাড়ির আনাচে কানাচে পতিত জমিতে চা চাষ করছেন তারা। মাত্র কয়েক বছর আগে যে জমিগুলোতে কোনো ফসলই হতো না, সেই জমিতে এখন ‘একটি পাতা দুটি কুঁড়ি’র বাগান। দিন দিন বাড়ছে চা চাষের পরিধি। চায়ের মান ভালো হওয়ায় এরই মধ্যে পঞ্চগড়ের চা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সিলেটের চা বাগানগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় দিন দিন চাহিদা বাড়ছে পঞ্চগড়ের চায়ের। ক্ষুদ্র চা চাষিরা জানান, চা চাষ করে অল্প খরচে বেশি লাভ পাচ্ছেন তারা। তাছাড়া চারা রোপণের দুই বছরের মধ্যেই খরচ উঠে আসছে। তাদের দাবি, সরকারি আরও পৃষ্ঠপোষকতা। পঞ্চগড় জেলায় অনেক বসতবাড়ির চিত্রই এখন এমন। নব্বইয়ের দশকে এ জেলাতে প্রথম ক্ষুদ্র পরিসরে সমতলে চা চাষ শুরু হলেও তা এখন ভিটেমাটি থেকে বাড়ির আনাচে কানাচে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এক সময়ের পতিত গোচারণ ভূমি ও অনুন্নত জেলা পঞ্চগড় এখন সবুজ চা বাগানে ভরে উঠেছে। এ চা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলোয় হচ্ছে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান। বিশেষ করে বেকার হাজার হাজার নারী শ্রমিক বাগানে বিভিন্ন কাজ করে আয় উপার্জন করছেন। নব্বইয়ের দশকে প্রথমে টবে, পরে পতিত জমিতে চা বাগান করা শুরু করেন পঞ্চগড়ের মানুষ। তবে ২০০১ সালে বেশ কয়েকটি কোম্পানি সেখানে চা চাষ শুরু করলে বাণিজ্যিক চা বাগানের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্র জানায়, মার্চ থেকে নভেম্বর চায়ের উৎপাদন মৌসুম। পর্যায়ক্রমে চায়ের উৎপাদন বাড়ছে। ২০১৪ সালে সবুজ চা পাতা উৎপাদন হয়েছে ৬৩ লাখ ২৭ হাজার ৪২৭ কেজি। ২০১৭ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৯ কেজিতে। চলতি বছর উৎপাদন গত বছরকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পঞ্চগড় নর্থবেঙ্গল সেন্ট্রাল টি কারখানার ব্যবস্থাপক আবদুুর রাজ্জাক জানান, সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে প্রতি কেজি কাঁচা পাতা ৩২ টাকা দরে কেনেন তারা। প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তা চলে যায় চট্টগ্রামে। বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জানান, সমতলে চা চাষের জন্য পঞ্চগড় অত্যন্ত সম্ভানাময় এলাকা। চা চাষের উন্নয়নে তারা নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। চাষিদের নিয়ে কর্মশালা করা হচ্ছে। জেলার বিটিআরআই উপকেন্দ্রে পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ও ফিল্ড ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এই জেলায় লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ চা উৎপাদিত হয়েছে। নতুন পুরনো ১২টি চা কারখানা থেকে ৫৪ লাখ ৪৬ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছরও জেলায় বিপুল পরিমাণ চা উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলায় বৃহৎ নয়টি বাগানসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রায় চার হাজারটি বাগান রয়েছে। জেলায় ২২টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার লাইসেন্স প্রদান করা হলেও কারখানা স্থাপিত হয়েছে মাত্র ১১টি। এসব কারখানা চাষিদের কাছ থেকে সবুজ চা পাতা কিনে তা থেকে চা তৈরি (মেড টি) করে। পঞ্চগড়ে উৎপাদিত এসব চা দেশের একমাত্র চায়ের নিলাম বাজার চট্টগ্রামে বিক্রি করা হয়। চা কারখানার মালিকরা এখন চট্টগ্রামের পাশাপাশি পঞ্চগড়েও নিলাম বাজার গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ