প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জামানত খোয়ানো শরিকদের নিয়ে অস্বস্তি আওয়ামী লীগে

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। তিনি ২০০৮ সালে মহাজোট সরকারের টেকনোক্র্যাট কোটায় শিল্পমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ আসনে সাম্যবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে দিলীপ বড়ুয়া পেয়েছেন ৫১১ ভোট। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে একই আসনে ১১ দলের প্রার্থী ছিলেন দিলীপ বড়ুয়া। পেয়েছেন ৩০৭ ভোট। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দিলীপ বড়ুয়া ওই আসনে প্রার্থী হতে চান। শুধু নিজের জন্যই নয়, দলের জন্য তার চাওয়া ছয়টি আসন। জোটের আরেক শরিক দল গণআজাদী লীগ। এ দলটির নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নেই। তবে এ দলের নেতারা আওয়ামী লীগের কাছে আসন চান পাঁচটি। একই অবস্থা আরেক শরিক দল বাসদের। এ দলটিরও নিবন্ধন নেই। তবুও আওয়ামী লীগের কাছে চাওয়া পাঁচটি আসন। শুধু সাম্যবাদী, গণআজাদী লীগ বা বাসদই নয়, অন্যান্য শরিক দলও এমন আবদার করছে আর তাতে বিব্রত আওয়ামী লীগ। আবার বিগত সংসদ নির্বাচনে যারা নৌকা প্রতীক নিয়ে অথবা জোটের ছেড়ে দেওয়া আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মাঠের অবস্থান ভালো নেই। জোটের বৃহত্তর স্বার্থে কাউকে কাউকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ছাড় দেওয়া হলেও ঘাম ঝরাতে হবে আওয়ামী লীগকে। জামানত খোয়ানো জোটের শরিক দলগুলো নিয়ে খুব অস্বস্তিতে ক্ষমতাসীন দল। সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একাধিক সংস্থার জরিপ সম্পন্ন করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব জরিপে উঠে এসেছে ছোট দলের বড় নেতাদের ভোটের মাঠের বাস্তব চিত্র। অনেক নেতার অবস্থাই নড়বড়ে। ঢাকায় বা জাতীয়ভাবে বড় নেতা হলেও নিজ এলাকায় কেউ কেউ জিরো অবস্থানে রয়েছেন। আবার কারও কারও সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক মোটেও ভালো নয়। ফলে তাদের প্রার্থী করা হলে আগে সমঝোতা করতে হবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। অন্যদিকে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোটে ভোট করবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট। গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছাড় পেয়ে অনেকেই এমপি হয়েছেন। তাদের মাঠের অবস্থাও ভালো নয়। তারপরও আসন্ন নির্বাচনে জোট-মহাজোট রক্ষায় আওয়ামী লীগকে ছাড় দিতে হবে। তবে সবকিছু ফয়সালা হবে তফসিল ঘোষণার পর। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতারা এমনটি জানিয়েছেন। ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার পর জোট-মহাজোটের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। জোট প্রধান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা শরিক দলের নেতাদের নিয়ে বসবেন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জোটের শরিক নেতারা দাবি করতেই পারেন। কিন্তু জোট প্রধান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ্য প্রার্থীই বেছে নেবেন। আমাদের বিজয় লাভ করতে হবে। যেখানে যাকে দিয়ে ভোট করালে জিতে আসব তাকেই প্রার্থী করা হবে। কাজেই আসন চাইলেই হবে না—সব জরিপে যিনি এগিয়ে থাকবেন তাকেই বেছে নেওয়া হবে।’

জানা গেছে, সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা রাশেদ খান মেননসহ আরও কয়েকজন। নৌকা প্রতীক না পেলে তাদের জয়ের সম্ভাবনা সামনে কতটুকু আছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা নৌকায় চড়ে এমপি হতে চান। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘোর আপত্তি। তারা বলছেন, জোটের প্রার্থীরা নৌকার ভোট নিয়ে এমপি নির্বাচিত হলেও পরে এড়িয়ে চলছেন। তারা তাদের দলকে সুসংগঠিত করলেও গত পৌনে দশ বছরে একদিনের জন্যও নৌকার লোকজনের খোঁজখবর রাখেননি। জোটের প্রার্থীদের কারণেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে হিসাব-নিকাশ করে প্রার্থী করার দাবি তৃণমূল নেতাদের।

বিএনপি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টি মহাজোটে থেকেই নির্বাচন করবে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কাছে জাতীয় পার্টি চায় ১০০ আসন এবং কমপক্ষে পাঁচজন মন্ত্রী। আর ১৪-দলীয় জোটের শরিকরা চায় ১৮০ আসন। বর্তমানে জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের শরিকদের মধ্যে সংক্ষিত আসন মিলিয়ে জাসদের ছয়টি, ওয়ার্কার্স পার্টির সাতটি, তরিকত ফেডারেশন দুটি, জাতীয় পার্টি-জেপির দুটি আসনে বর্তমান এমপি রয়েছেন।

সূত্রমতে, জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ১০টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু) ৩০টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (আম্বিয়া) ১৮টি, জাতীয় পার্টি-জেপি ২২টি, গণতন্ত্রী পার্টি ১৫টি, তরিকত ফেডারেশন ৩০টি, ন্যাপ ১০টি, গণতন্ত্রী মজদুর পার্টি দুটি, গণআজাদী লীগ পাঁচটি, বাসদ পাঁচটি ও সাম্যবাদী দল পাঁচটি আসন চাইবে। এদের কেউ কেউ জোট প্রধানকে তালিকাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের জাসদ (আম্বিয়া) সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা ১৮টি আসন চেয়েছি।’ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ভেঙে এ দলটির সৃষ্টি। এখনো নিবন্ধন মেলেনি। বাংলাদেশের জাসদের সঙ্গে দুজন এমপি রয়েছেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু) কার্যকরী সভাপতি রবিউল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো আমাদের দলে শতাধিক যোগ্য, মুক্তিযোদ্ধা, এলাকায় সুপরিচিত ও দক্ষ প্রার্থী রয়েছেন। তবে জোট রাজনীতির কারণে আমরা জোটের কাছে ৩০টি আসনে জোর গুরুত্ব দেব।’ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমান সংসদে আমাদের দলের সাতজন এমপি রয়েছেন। এগুলো তো পাবই। এ ছাড়াও ১০ জনের একটি তালিকা দিয়েছি। তবে আমাদের আরও প্রার্থী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেননের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা বরিশালে। তিনি বিগত দুটি নির্বাচনে নৌকা নিয়ে ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এ আসনে এবার জোট প্রার্থীকে ছাড় দিতে আওয়ামী লীগ নারাজ। তারা দলীয় প্রার্থী চান।

জাতীয় পার্টি-জেপি মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সারা দেশে আমাদের দলের ২২ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ২২ জনের তালিকা আওয়ামী লীগের কাছে জমা দেওয়া হবে।’ ন্যাপের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ন্যাপ দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল। আগামী নির্বাচনে আমরা ১০টি আসন চাইব।’ বিশ্লেষকদের মতে, জোটের প্রধান শরিকদের কাছ থেকে বেশির ভাগ সময় সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত থাকে ছোট দলগুলো। ঘরোয়া অনুষ্ঠানে জোরালো বক্তব্য দেওয়ার মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। সম্মিলিতভাবে মাঠের লড়াইয়ে তাদের কখনই সমানতালে অংশ নিতে দেখা যায় না। আবার কেউ কেউ জাতীয়ভাবে বড় নেতা হলেও ভোটের মাঠে জিরো। জাতীয় সংসদে পা রাখতে হলে আওয়ামী লীগের ওপর ভরসা করতে হয়। জোটের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করেই আওয়ামী লীগকে এসব দলের নেতাদের প্রার্থী করতে হবে আর এতে বঞ্চিত হবেন স্থানীয় যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ