প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খাসোগি হত্যাকাণ্ডে অবরোধ থেকে মুক্তি মিলতে পারে কাতারের!

আরিফুর রহমান তুহিন: বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনা সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যায় লাভবান হতে চায় কাতার সরকার। দীর্ঘদিন সৌদি জোটের অবরোধে থাকা দেশটি এই সুযোগে প্রতিবেশিদের বিরোধ মিটিয়ে সরবে ফিরতে চাইছে। এজন্য কুটনৈতিক চাবি হিসেবে ব্যবহার করছে তাদের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা নেটওয়ার্ককে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবে এমনটি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কিংস কলেজ অব লন্ডনের অধ্যাপক ড. আন্দ্রেস ক্রিগ বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি এমন অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যে- সৌদির এখন অনেক কিছু ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন। আর আমি এটাতে মোটেও অবাক হবো না যদি দেখি, খাসোগি হত্যা নিয়ে কাতার পরোক্ষভাবে লাভবান হয়েছে।

কাতারের অন্যতম মিত্র দেশ তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে ২ অক্টোবর নিখোঁজ হন সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি। ওয়াশিংটন পোস্টের এই সাংবাদিক নিখোঁজ হওয়ার পরেই সবথেকে বেশি সরব হয়ে ওঠে কাতারের মালিকানায় থাকা আল জাজিরা। ঘটনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাদের প্রধান শিরোনাম খাশোগিকে নিয়ে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন একদিকে কাতার সরকার চুপ থাকছেন অন্যদিকে আল জাজিরাকে ব্যবহার করছেন- এটা একটি ঠা-া পররাষ্ট্রনীতির অংশ।

তারা বলছেন, ২০১৭ সালে আরব জোটের প্রধান ৪ শক্তি সৌদি আরব, বাহরাইন, আরব আমিরাত ও মিসর কাতারকে অবরোধ করে দেয়। কাতারের বিমান সৌদি বিমানবন্দরে অবতরণে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। অন্য ৩ দেশও তাদের নাগরিকদের কাতার ভ্রমনে নিষেধ করে। কারণ প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ দেশটি এই চার দেশের উপর নির্ভরশীল। ফলে কাতার অর্থনৈতিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই খাশোগি যখন নিখোঁজ হন এবং এর দায় গিয়ে সৌদি সরকারের উপর পরে তখন সবথেকে বেশি সরব হওয়ার কথা ছিল কাতার সরকারের। কিন্তু তারা কোনো মন্তব্যই করেনি। কিন্তু আল জাজিরাকে দিয়ে ঠিকই চাপ তৈরি করছে। এমন আচরণের মাধ্যমে কাতার সরকার মেসেজ দিতে চাইছে, তাদের সাথে সমঝোতা কর। শক্তিতে তারাও কম না। হয়তো এক সময় সৌদি সরকার বাধ্য হয়েই কাতারের সাথে আলোচনায় আসতে বাধ্য হবে।

বুকিং দোহা সেন্টারের ফেলো নোহা আবুলদাহাব বলেন, এটা খুব সহযেই বলা যায় যে- খাসোগি হত্যায় সৌদির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে। কিন্তু এটা একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়িছে কাতার ও সৌদির মাঝে বিরোধ নিস্পত্তিতে। দেশদ্বয় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে অগ্রাধীকার বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করতে পারে। গত ২ অক্টোবর থেকে খাশোগি নিখোজ হলেও কাতার সরকার যে নিরবতা পালন করেছে সেটাকে বিচক্ষণতা হিসেবে মনে করেন তিনি।
কাতার সমস্যার সাথে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে জড়িত বলে মনে করে আসছেন একটি অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত সন্ত্রাসী দমনে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে যুদ্ধ করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর তাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি ও মিসর। দেশ দুটি এতদিন দাবি করে আসছে, কাতার সরকার মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। তাই কাতার যদি এদেরকে বের করে না দেয় এবং আল জাজিরা নেটওয়ার্ক বন্ধ না করে তাহলে তারা অবরোধ তুলবে না। সৌদির মিত্র হিসেবে বাহরাইন ও আরব আমিরাতও কাতারকে অবরোধ করে।

কাতার অবরোধের ঠিক কয়েক দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দেশ হিসেবে সৌদি সফর করেন। তাই আন্তর্জাতিক গবেষকরা মনে করছেন, এই অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ মদদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু খাশোগি হত্যার পর সবকিছু পাল্টে গেছে। আন্তর্জাতিক মহল এই হত্যার সাথে সৌদির ইয়েমেন হামলা ও কাতার অবরোধের বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তার বন্ধু দেশ সৌদিকে কড়া ভাষায় শাসাতে বাধ্য হন। আন্তর্জাতিকভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়া সৌদির এখন কাতারের সাথে আপস করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আর আমেরিকাও নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে বন্ধুকে এই পরামর্শই দিবেন বলে মনে করেন তারা।

রাইস বিশ^বিদ্যালয়ের ফেলো কৃষ্টিয়ান উরলিশেন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র সরকারও চায় কাতার সমস্যার সমাধান হোক। খাশোগি হত্যার পরে সৌদির উপর যে চাপ তৈরি হয়েছে তার সমাধানে এটাই কার্যকরি পদক্ষেপ হতে পারে।
খাশোগি নিখোঁজের পর কাতারের ভূমিকা নিয়ে সৌদি ও মার্কিন প্রেমিদের একটি অংশ কাতারের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলো। কাতারের গণমাধ্যমের ভূমিকাকে সৌদি রাজ পরিবারকে কলঙ্কিত করার একটি ষড়যন্ত্র বলে মনে করছিলো তারা। কিন্তু সৌদি সরকার যখন স্বীকার করে যে, এই হত্যাকা- তাদের দেশের নাগরিকরা ঘটিয়েছে তখন তাদের মুখে কুলুপ এটে যায়। এমতাবস্থায় অনেকেই মনে করছিলো দোহার পক্ষ থেকে রিয়াদকে হয়তো সন্ত্রাসের মদদদাতা বা অন্য কোনো খারাপ ভাষায় মন্তব্য ছুড়বে। কেননা এই সৌদিই কাতারকে সন্ত্রাসের সহযোগী বলে আসছে।

সকলের ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে চলছে কাতার। এমনকি তার মিত্র তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানও সৌদির সাথে খুবই ঠা-া সুরে কথা বলছে। কাউকে দোষারোপ না করে সঠিক তদন্ত দাবি করেছেন তিনি। আবার দেশটির গণমাধ্যম একের পর এক সংবাদ প্রচার করে চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতার সমস্যা সমাধানে দেশ দুটি ঠা-া পথে চলছে। তারা চাইছে, সম্পর্ক সাভাবিক রেখে সকল সমস্যা সমাধানের এটাই মোখ্যম সময়। যার হাতিয়ার দেশ দুটির গণমাধ্যম। বিশেষ করে আল জাজিরা।

আল জাজিরায় প্রকাশিত খাশোগি হত্যা নিয়ে কয়েকটি বিশেষ প্রতিবেদন অবলম্বনে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ