প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মালবী গুপ্ত সাংবাদিক, কলকাতা
ভারতের শ্রম বাজার: নারীদের অংশগ্রহণ যেখানে ক্রমশ কমেই চলেছে

বিবিসি : জানি, জনসংখ্যার হিসেবে ভারত লাফিয়ে লাফিয়ে ক্রমশই বিশ্বের এক নম্বর স্থানটির দিকে এগিয়ে চলেছে। এও জানি যে, অচিরেই পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার কথা ভারতের।

কিন্তু দেশের সেই অর্থনৈতিক বিকাশে মেয়েরা যদি সেভাবে অংশ নিতে না পারে, তাহলে কি ওই সম্ভাবনা আদৌ বাস্তব হয়ে উঠবে?

এই প্রশ্ন জাগছে কারণ, ভারতে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে লেবার ফোর্স বা শ্রমশক্তিতে এবং চাকরিতে মেয়েরা কেবলই যে পিছিয়ে পড়ছে।

দেখছি, ২০১৭ সালের প্রথম চার মাসে ভারতে চাকরিতে যখন পুরুষের সংখ্যা বেড়েছে নয় লক্ষ, তখন সেখানে নারীর সংখ্যা ২৪ লক্ষ কমে গেছে। এবং দেশের শ্রমশক্তিতেও এক দশক আগে মেয়েদের প্রায় ৩৫ শতাংশ অংশগ্রহণ বর্তমানে নেমে এসেছে ২৭ শতাংশে।

এই ব্যাপারে দেখছি সব দেশই ভারতের ওপরে রয়েছে, এক পাকিস্তান ছাড়া।

অথচ বিশ্বব্যাংক’র সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট বলছে, পুরুষের সমসংখ্যক নারী যদি ভারতের অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেত, তাহলে ২০২৫ সাল নাগাদ দেশের জিডিপি বাড়ত প্রায় ৬০% শতাংশ।

আসলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সকলের কাম্য হলেও সেই সমৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছনো সবার পক্ষে ততটা সহজ নয়। বিশেষ করে লিঙ্গ বৈষম্য ও নানা সামাজিক বৈষম্যে দীর্ণ ভারতের মতো দেশে, যেখানে পদে পদে তা জীবনকে পেছনে টেনে ধরে।

তাই দেশের শ্রমশক্তি এবং চাকরিতে মেয়েদের নিযুক্তি যদি এভাবে কমে যেতে থাকে, তাহলে আমার মনে হয় আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ধাক্কা খাবেই।

কারণ, বর্তমানে দেশের জিডিপি’তে মাত্রই ১৭ শতাংশ অবদান মেয়েদের, যেখানে সারা পৃথিবীর গড় ৩৭ শতাংশ। গোটা বিশ্বের মধ্যে এব্যাপারেও ভারতের অবস্থান কিন্তু একেবারে তলায়।

সত্য যে, পৃথিবীর নানা দেশেই এখনও মেয়েদের লেখাপড়া শেখার ক্ষেত্রে যে বাধার সম্মুখীন হতে হয়, ছেলেদের তেমনটা হয় না।

কিন্তু কাজের সূত্রে গ্রামে গঞ্জে ঘোরার সময় গত কয়েক দশক ধরে এটাও তো লক্ষ্য করেছি যে, সেই সব বাধা কাটিয়ে সেখানকার মেয়েদের মধ্যে লেখাপড়া শেখার ইচ্ছা ও চেষ্টা আগের থেকে অনেক প্রবল হয়ে উঠেছে।তীব্র হয়ে উঠেছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্খা।

তাই স্কুলে পড়াকালীন বিয়ে দিয়ে দেওয়া অভিভাবকদের চেষ্টাকে বানচাল করে, বিদ্রোহিণী কিশোরীরা প্রায়ই সংবাদপত্রে জায়গা করে নিচ্ছে। কমেছে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের স্কুলছুটের গ্যাপও।

শ্রমশক্তিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার এটা মনে হয় একটা কারণ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।

কিন্তু চাকরির ক্ষেত্রে? তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশের মত ভারতেও তো মেয়েরা এখন লেখাপড়া বেশি শিখছে। এমনকি উচ্চ শিক্ষাতেও দেখছি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেলেদের টপকে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা।

কিন্তু তা সত্ত্বেও মেয়েরা কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে যাচ্ছে কেন?

চিনের দিকে তাকালে দেখছি সেখানের শ্রমশক্তিতে ৪৪ শতাংশই রয়েছে মেয়েরা। জিডিপি’তে চীনা মেয়েদের অবদান ৪১ শতাংশ, এবং বিশ্বব্যাংক’র তথ্য বলছে চীনে ২০১০-এ শ্রমশক্তিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল ৭৩ শতাংশ, যা উন্নত দেশগুলির থেকেও বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই অংশগ্রহণের মাত্রা কিছুটা কম হলেও এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ চীনে বেশিরভাগ নারীই কিন্তু রোজগার করে।

চীনে সরকারি হিসেবেই দেখা যাচ্ছে, ছেলেদের থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও মেয়েদের সংখ্যা বেশি ।

আসলে বিপ্লব পরবর্তী চীনের চেয়ারম্যান মাও জে ডং’র ‘লিঙ্গ সাম্য’ প্রতিষ্ঠায় বিখ্যাত সেই উক্তি ‘women hold half the sky’ শুধু স্লোগান হয়ে থাকেনি। শিক্ষা ক্ষেত্রে, কাজের ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেই অর্ধেক আকাশের বিপুল শক্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তাই বুঝতে অসুবিধে হয় না অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে চীনের এত দ্রুত উত্থান কীভাবে সম্ভব হয়েছিল।

অথচ বিশ্বব্যাঙ্কের মতে, ভারতে গ্রাজুয়েট মেয়েদের দুই তৃতীয়াংশই বেকার। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের থেকে এই শিক্ষিত বেকারের হার দেশে অনেক বেশি। চাকরির বিজ্ঞাপনগুলিও লক্ষ্য করলে দেখি মেয়েদের কাজ বলতে বেশি গৃহকাজ আর কিছু সেবিকা ইত্যাদি। যেন ওই কাজগুলি ছাড়া মেয়েরা অন্য কাজের যোগ্যই নয়।

শুধু কি তাই? একই শিক্ষাগত যোগ্যতা সত্ত্বেও পুরুষরা তো মেয়েদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি টাকা পায় ভারতে। এবং রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এটাও দেখেছি চাষের কাজে, নির্মাণ কাজে মেয়েরা পুরুষের থেকে অনেক কম মজুরি পায়।

এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁরা বলেছেন, “মজুরি কম না নিলে যে কাজ দেবে না। আর কাজ না পেলে খাব কি?” তাই মনে হয়, অভাব আর এই অসহায়তার কাছে লিঙ্গ সাম্য’র দাবিও যেন মাথা নিচু করতে বাধ্য হচ্ছে ।

ভারতের এই ‘জেন্ডার পে গ্যাপ’ নিয়ে ২০১৬ সালেই ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন একটি সতর্ক সঙ্কেত দিয়েছিল। কারণ সারা পৃথিবীতে এই গ্যাপটি ছিল সর্বাধিক।

এটা ঠিক যে ভারতের পথে ঘাটে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব এবং পারিবারিক প্রতিকূল পরিস্থিতি মেয়েদের কিছুটা বাধ্য করছে ‘জব লেস’ হয়ে পড়ায়। কিন্তু ভারতে লিঙ্গ বৈষম্যও যে একটা বিরাট কারণ। যার অতলান্তিক অন্ধকার আমাদের প্রাত্যহিক জীবনচর্যায় নিয়ত প্রতিফলিত হচ্ছে।

আসলে এই সহস্রাব্দ প্রাচীন লিঙ্গ বৈষম্য ভারতীয় সমাজে দৃঢ়মূল এমন এক ব্যাধি, যা কোনোভাবেই যেন নিরাময়যোগ্য নয়। তা নাহলে গত অগাস্টেও মুর্শিদাবাদে পর পর কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার ‘অপরাধে’ কন্যাসহ স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ ওঠে?

তাই মনে হয়, আমাদের দেশে ওই ‘অর্ধেক আকাশের অধিকার ও তাদের সুরক্ষা যদি সুনিশ্চিত করা না যায়, সমাজের মনোভাব না বদলায়, যদি দেশের অর্থনীতিতে তাদের সেভাবে যুক্ত করা না যায়, তাহলে আমরা আর্থিক উন্নয়নের মায়াঞ্জন যতই চোখে লাগাই না কেন, তার বাস্তবতা সে কোন সুদূরের হাতছানি হয়েই রয়ে যাবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ