প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরকারি কর্মচারীদের এখন আর ঠেকায় কে!

মঞ্জুরুল আলম পান্না : বহুল আলোচিত-সমালোচিত ৫৭ ধারা বিলুপ্ত না করে তা বরং আরও কঠোর করে নতুন কয়েকটি ধারায় সন্নিবেশিত করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ পাস হলো জাতীয় সংসদে। সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে আনা হলো ঔপনিবেশিক আমলের বহুনিন্দিত অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট-১৯২৩। আইনটির ৩২ ধারায় বলা হয়েছে ‘সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটি গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে’। গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলে আসছেন, এই আইন পাস হওয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে।

এর ফলে সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের ভেতরে দুর্নীতি আরও উৎসাহিত হবে। বৃটিশরা ভারত শাসনে তাদের স্বার্থরক্ষায় এই আইনটি প্রণয়ন করে। সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক এবং মানবাধিকার সংগঠন এই আইনের ৩২ ধারাসহ আরও বেশ কয়েকটি ধারা পরিবর্তনের দাবি তুললেও তা যে বাতিল হচ্ছে না তা এরই মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই অবস্থার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে সম্ভবত আরও বেশি সুরক্ষায় আনতে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ‘সরকারি চাকরি বিল-২০১৮’। ফৌজদারি অপরাধের অভিযুক্ত কোনো সরকারি কর্মচারীদের গ্রেপ্তারের আগে সরকার তথা ওই কর্মচারীর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে, এমন বিধান রেখে গত ২১ অক্টোবর বিলটি উত্থাপিত হয় সংসদে।

একদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুলিশকে বাসা-বাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশকে কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে ফৌজদারি অপরাধের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের আটকের জন্য উর্ধ্বতন কর্তপক্ষের অনুমতির শর্তজুড়ে আইন করা। অর্থাৎ আইন যে সবার জন্য সমান নয়, তাও নতুন নতুন আইনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে। আর সরকারি কর্মচারীদেরকে যে ইস্পাত কঠিন সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে তার জন্য খুব সহজ একটা উদাহরণই যথেষ্ট কোনো সরকারি কর্মকর্তার বা কর্মচারীর সরাসরি ঘুষ গ্রহণের কোনো ছবি যেমন কোনো সাংবাদিক গোপনে ধারণ করতে পারবেন না, একইভাবে পুলিশের হাতেও এ ধরনের যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত ওই সরকারি কর্মচারীকে ওপর মহলের অনুমতি ছাড়া আটক করা যাবে না।

এই আইন কার্যকর করা মানে দুদকের হাত-পা খুব শক্ত করে বেঁধে দেওয়া। ১৯৬৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশনের ৫ ধারা অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে অনুসন্ধান এবং তদন্তের সময় তাকে আটক করা যেতে পারে। সরকারি চাকরি বিল’- ২০১৮ আইনে পরিণত হওয়ার পর দুদকও সেই ক্ষমতা হারাবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে কি হবে না, তা অপরাধের ওপর নির্ভর করবে। এটি ব্যক্তির ওপর নির্ভর করার অর্থ হলো তা মধ্যযুগীয় বা সামন্তবাদী আইনের বাইরের কিছু নয়। কারণ আগে রাজা-বাদশাহরা অপরাধ করলে তাকে কোথাও জবাবদিহি করতে হতো না। আর গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে, আইনের চোখে সবাই সমান। সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে নতুন এই আইন কার স্বার্থে তা অনেক প্রশ্নেরই জন্ম দেয়।

লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ