প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আয় দুশ’ কোটি টাকা!

ইনকিলাব : গাঁজা অর্থনীতি! সত্যিই তাই!! চিকিৎসা ও বিনোদনে বিশ্বব্যাপী বড় হচ্ছে গাঁজার অর্থনীতি। পৃথিবীর দেশে দেশে গাঁজার ব্যবহার উন্মুক্ত হচ্ছে। আর গাঁজার এই অর্থনীতির বাজার ধরার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশে এর উৎপাদন নিষিদ্ধ হলেও একেবারে বন্ধ হয়নি গাঁজার চাষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যহার ও পরিকল্পিত ভাবে গাঁজা চাষ করলে রফতানিতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বড় স্থান দখল করা সম্ভব। রফতানি বিশ্লেষকরা বলছেন, গার্মেন্টস পণ্যের পাশাপাশি রফতানির নতুন আইটেম হিসেবে গাঁজাকে অন্তভূক্ত করতে পারলে ১৪ হাজার ৬৪০ কোটি ডলারের বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করে শত শত কোটি টাকা আয় করতে পারবে বাংলাদেশ। এতে করে রফতানি আয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে দেশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে গাঁজা রফতানির প্রক্রিয়া এখনই যদি শুরু করা যায় তবে কমপক্ষে দুই বিলিয়ন ডলার রফতানি সম্ভব। আর পরিকল্পিতভাবে চাষ ও রফতানি শুরু করলে বিশ্ববাজারে গাঁজা রফতানি করে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ও বিনোদনমূলক গাঁজার বৈধতার ফলে পণ্যটির বৈধ বাজার সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ। ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বে গাঁজার বৈধ বাজার গিয়ে দাঁড়াবে ১৪ হাজার ৬৪০ কোটি ডলারে।
এদিকে কানাডার পরিসংখ্যান দপ্তর স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা বলছে, বৈধ ওষুধের দোকান থেকে ২০১৮ সালে ৫৪ লাখ কানাডীয় গাঁজা কিনবেন, যা প্রায় দেশটির মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রায় ৪৯ লাখ কানাডীয় এটি গ্রহণ করছেন। গত সোমবার প্রকাশিত অ্যাবাকাস ডাটার সাম্প্রতিক একটি জরিপে বলা হয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ কানাডীয় গাঁজা বৈধকরণের আইনটিতে সমর্থন দিচ্ছে। আন্তজার্তিক গণমাধ্যমে ভাষ্যমতে, ভবিষ্যতে শুধু কানাডাতে গাঁজার বাজারের মূল্যমান হবে ১০ হাজার কোটি ডলার।
দেশে গাঁজার যথেষ্ট ব্যবহারও হচ্ছে, কারণ দামে সস্তা। তাই রফতানির জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজার চাষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার ধরতে পারলে খুব অল্প সময়েই তৈরি পোশাক ও চিংড়ী শিল্পের ন্যয় রফতানি আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সূত্র মতে, পশ্চিমা দেশগুলো গাঁজা চাষ ও ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করায় বাংলাদেশের জন্য সৃষ্টি হয়েছে বড় রকমের বাণিজ্য সুযোগ। কানাডা, অস্টেলিয়া, লেবানন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউরোপের অনেক দেশের লগ্নিকারকরা এখন এ খাতে শত কোটি বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, বিশ্ব বাজারে ওষুধের কাচাঁমাল হিসেবে গাঁজার চাহিদা বাড়ছে। এটা রফতানি আয়ে একটি সুযোগ বটে। তবে শুধুমাত্র রফতানির জন্য নির্দিষ্ট এলাকা এবং চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে চাষ করা গেলে এ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সহজ হবে। এক্ষেত্রে উৎপাদন থেকে রফতানির জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রত্যেকটি স্তরে কঠোর তদারকি থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেন তপন কান্তি ঘোষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় হাজারো বছর থেকে ঐতিহ্যগত ভাবে গাঁজা উৎপাদিত হয়ে আসছে। জনশ্রুতি আছে ১৭২২ সাল নাগাদ প্রথম গাঁজার চাষ শুরু হয় নওগাঁ সদর উপজেলার মুরাদপুর গ্রামে। আবার অনেকেই বলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে গাঁজা চাষ শুরু হয়। যাই হোক, অধিক লাভজনক হওয়ায় ১৮৭৭ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে গাঁজাচাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ সরকার গাঁজা উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য লাইসেন্স প্রথা চালু করে। অর্থাৎ লাইসেন্সে নির্ধারিত জমি ছাড়া অন্য জমিতে গাঁজা চাষ করা যাবে না। গাঁজা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ১৯১৭ সালে ‘নওগাঁ গাঁজা কাল্টিভেটরস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি.’ নামে একটি সমবায় সমিতি গঠিত হয় এবং সে বছরই সমিতিটি সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধনপ্রাপ্ত হয়। এভাবে ভিত্তি রচিত হয় উপমহাদেশের বৃহত্তম সমবায় সমিতির। জন্মলগ্নে সোসাইটির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৮ জন। অবাক করা ব্যাপার পরে এর সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাত হাজারে।

সংরক্ষিত পরিবেশে গাঁজা চাষ করা হতো। বছরের জুন-জুলাই ছিল চারা তৈরির মাস। উঁচু মজবুত বাঁশ বা কাঠের বেড়া দিয়ে বীজতলা তৈরি করা হতো। বেড়ার চারপাশে চৌকি নির্মাণ করে পাহাড়া দিত সশস্ত্র পুলিশ। একইসঙ্গে বীজতলার অভ্যন্তরে বাঁশের টং তৈরি করে পাহাড়া দিত খোদ চাষীরা। বীজতলায় প্রবেশ ও বাহির উভয় ক্ষেত্রে পুলিশ চাষীদের দেহ তল্লাশি করত, যাতে তারা নিজেরাও চারা বাইরে পাচার করতে না পারে। গাঁজা চাষের মৌসুমে পুরো কাজ ম্যাজিস্ট্রেটসহ মাদক বিভাগের কর্মকর্তাদের কড়া নজরে পরিচালিত হতো। পুরো এলাকায় থাকতো পুলিশ-আনসারদের পাহাড়া। অনেক সময় রাতে হ্যাজাক জ্বালিয়ে উৎপাদিত গাঁজা বিক্রি হতো সোসাইটির মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির আগে উপমহাদেশে এত বড় দ্বিতীয় কোনো সমবায় সমিতি ছিল না। ১৯৮৭ সালে গাঁজা চাষ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত সোসাইটির সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় সাত হাজার। সে সময় বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, চেন্নাই, বার্মা, নেপাল এবং সুদূর ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের একাধিক দেশে নওগাঁর গাঁজা রফতানি হতো। ১৯১৮ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫৫ হাজার মণ গাঁজা উৎপাদন হতো। ১৯৭৪ সালে জেনেভা কনভেনশনে মাদকদ্রব্যবিরোধী চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে ১৯৯০ সালের মধ্যে গাঁজা চাষ বন্ধের শর্ত ছিল। শর্ত মোতাবেক তিন বছর আগেই ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে গাঁজা চাষ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম ও বৃহত্তম সমবায় প্রতিষ্ঠান নওগাঁ গাঁজা উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লি. এর সাত হাজার সমবায়ী পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের অভাবে চরম বিপাকে পড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাঁজা উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের সর্বাধিক উপযুক্ত এলাকা কুষ্টিয়া, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ এবং রংপুর বিভাগের চরাঞ্চল। এছাড়া চট্রগামের পাহাড়ি এলাকায়ও গাঁজা চাষ করা হয়। যদি রফতানির জন্য গাঁজা উৎপাদন করাও হয়, তবে তা কঠোর লাইসেন্স এবং নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে বলেও পরামর্শ তাদের।
জানা গেছে, বিনোদনের জন্য গাঁজার নিষেধাজ্ঞা উত্তোলনকারী দ্বিতীয় দেশ কানাডা। এর পূর্বে উরুগুয়ে প্রথম দেশ হিসেবে গাঁজা বৈধ করেছিলো। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার মতে, ২০১৮ সালে ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন কানাডিয়ান বৈধ ডিসপেনসারি থেকে গাঁজা কিনবে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বলছে, চিকিৎসায় ব্যবহৃত গাঁজার রফতানিতে তারা শীর্ষস্থান দখল করতে চায়। কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস দেশের বাজারে গাঁজা বিক্রির পর এখন রফতানি শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়া এই দুটি দেশকে টেক্কা দিতে চায়। এজন্য তারা আইন পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করছে। ওদিকে উরুগুয়ে এবং ইসরাইলেরও একই রকম পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তজার্তিক গণমাধ্যম সূত্রে আরও জানা গেছে, আগামী মাসে ব্রিটেনে গাঁজা চিকিৎসায় ওষুধ হিসেবে ব্যবহার শুরু হচ্ছে। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ গাঁজাকে ‘বি’ ক্লাস ধরনের ওষুধ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, দুই সপ্তাহ পরেই এটি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের ঘোষণা দেয়া হবে। কেমোথেরাপির কারণে মৃগীরোগ, বমি বমি ভাব, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় ভুগছেন এমন রোগীদের গাঁজা ওষুধ হিসেবে দেবেন ডাক্তাররা। সানডে টেলিগ্রাফকে চিকিৎসক জেনিভাইভ এডওয়ার্ডস বলেন, চিকিৎসায় গাঁজার ব্যবহার খুবই উৎসাহব্যঞ্জক ফল এনে দেবে এবং হাজার হাজার রোগী এতে উপকৃত হবে।

ক্যান্সারের কেমোথেরাপী চিকিৎসায় রোগীর মাথা ধরা ও বমিভাব কমাতে, এইডসের রোগীর ক্ষুধা জাগাতে এবং পুরোনো বাত ও মাংসপেশীতে ব্যথা দূর করতে চিকিৎসকরা গাঁজার ব্যবহারে অনুমতি দিয়ে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী গ্রেগ হান্ট বলছেন, তাদের এই পরিকল্পনার ফলে দেশের মধ্যে রোগীরাও উপকৃত হবেন। অন্যদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘোচাতে গাঁজা চাষের বৈধতা দিতে যাচ্ছে লেবানন। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে লেবাননের ওপর। বিপন্নতার মধ্যে পড়েছে দেশটির কৃষি। এক সময় মধ্যপ্রাচ্যের রুটির ঝুড়ি হিসেবে খ্যাত দেশটির কৃষকরা বর্তমানে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে গাঁজা চাষকেই অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘোচানোর উপায় করেছেন। লেবাননের সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, গাঁজাকে বৈধতা দিলে রফতানি আয় বাড়বে।
দেশে গাঁজা রফতানির সম্ভাবনা বা চাষ সম্পর্কে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মাহপরিচালক-১ অভিজিৎ চৌধুরীর সাথে কথা বলতে চাইলে এ বিষয়ে কোন তথ্য জানা নেই বলে উল্লেখ করেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ