প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংলাপ নইলে রাজপথ

দৈনিক আমাদের সময় : তফসিলের আগে নিরপেক্ষ সরকার ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সাত দফা দাবিতে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তা না হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে বলে ফ্রন্টের নেতারা হুশিয়ারি দিয়েছেন। সমাবেশে স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে এক প্লাটফর্মে আসার আহ্বান জানানো হয়। সাত দাবিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে একঘরে করারও ঘোষণা দেন নেতারা। দেশে স্বাধীনতার মূল চেতনা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সবার অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবি আদায় করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য বলেন বিএনপি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা বলেন, বিজয় আমাদের অনিবার্য। বাংলাদেশের জনগণের জয় হবেই। গতকাল পুণ্যভূমি সিলেটের রেজিস্ট্রারি মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত এক সমাবেশে শীর্ষ নেতারা এসব কথা বলেন।

বেলা ২টায় জনসভার কার্যক্রম শুরু হলেও দুপুরের আগেই রেজিস্ট্রারি মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে হলে, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হতে হলে, জনগণের ক্ষমতার মালিকানা ফিরিয়ে আনতে হলেÑ আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সবাইকে মাঠে নামতে হবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাইÑ ঐক্যফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ হন; বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। বাংলাদেশের জনগণের জয় হবেই। আসুন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা আবার দেশের মালিক হব, এই রাষ্ট্র আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনব। সমাবেশ থেকে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবিলম্বে মুক্তির দাবিও জানান ড. কামাল হোসেন।

সংবিধানপ্রণেতা বলেন, আমাদের দেশের মালিকানা ফিরে পেতে হলে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। সে জন্য আমাদের এক নম্বর দাবিÑ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। গ্রামে গ্রামে, জেলায় জেলায় জাতীয় ঐক্যকে সুসংহত করারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সাত দফায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করুন। একে হালকাভাবে নেবেন না। এ যাত্রায় জনগণ সাড়া দিয়েছে। অবশ্যই জনগণের মালিকানা এবার ফিরে পাবে।

প্রধান বক্তা হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হযরত শাহজালাল ও হযরত শাহপরাণের পুণ্যভূমি সিলেট থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যাত্রা শুরু হলো। এটি এক ইতিহাস রচিত হয়েছে এ পুণ্যভূমিতে। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং সাজাপ্রাপ্ত সব বন্দিকে মুক্ত করতে হবে। এ সরকারকে বলতে চাইÑ তফসিল ঘোষণার আগে পদত্যাগ করুন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন, সংসদ বাতিল করুন। আন্দোলনে ত্যাগ স্বীকার করার জন্য সবাই প্রস্তুত আছেন কিনা আগত মানুষের সমর্থন জানাতে বললে সবাই হাত তুলে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠে বুধবার বেলা ২টার দিকে কোরআন তিলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। সমাবেশে যাওয়ার আগে হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার জিয়ারত করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। জনসভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের উদ্দেশে একটি ‘ব্যতিক্রমী’ প্রস্তাব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘ তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় চার নেতার মাজার জিয়ারত করতে পারি। সেখানে আরাফাত রহমান কোকোর কবরও জিয়ারত করতে পারি। এর পর চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের সমাধি জিয়ারত, ধানম-িতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা অর্পণ করব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, দেশ ডাকাতের হাতে পড়েছে। আপনারা কি দাবি আদায় করতে চান? তা হলে সরকারের উসকানিতে পা দেবেন না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, তফসিল ঘোষণার আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সিলেটের পুণ্যভূমি থেকে জাতীয় ঐক্যের নতুন যাত্রা শুরু হলো। দেশে একটি স্বৈরাচারী সরকার। তাদের অপসারণ করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, কাঁঠাল দিয়ে যেমন আমসত্ত্ব হয় না, ঠিক তেমনই শেখ হাসিনাকে দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। দেশের মানুষ নির্বিঘেœ ভোট দিতে চায়; কিন্তু নৌকায় নয়। আন্দোলনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করব। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব।

ড. মঈন খান বলেন, আজ দেশে গণতন্ত্র নিখোঁজ। জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার নেই। মানবাধিকারও নেই। সরকার উন্নয়নের কথা বলে, তা হলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোট দিতে সমস্যা কোথায়।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আজ আমাদের শপথ নেওয়ার সময়। তাই বলতে চাইÑ এবার কেউ ওয়াকওভার নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে, সেটি কখনো পূরণ হবে না। ওয়াকওভার নিয়ে কাউকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না।

ড. কামাল হোসেনকে জাতীয় মুরব্বি উল্লেখ করে সরকারের উদ্দেশে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলেন, রেফারিও হবেন, আবার খেলবেনও, তা হবে না। হয় খেলবেন, নয়তো রেফারি থাকবেন।

সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী আহমেদ ও মহানগরের নেতা আজমল বখত সাদেকের পরিচালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, ফজলুর রহমান, তাহমিনা রুশদি লুনা, খায়রুল কবির খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, জিন্নুর রশীদ চৌধুরী দিপু, ২০-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের অ্যাডভোকেট এমএ রকীব, খেলাফত মজলিশের অধ্যাপক আহমেদ আবদুল কাদের প্রমুখ।

সমাবেশে বিকল্পধারা একাংশের মহাসচিব শাহ আহমেদ বাদল, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান, এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব সাহাদাত হোসেন সেলিম, বিএনপির ফরহাদ হালিম ডোনার, বিলকিস জাহান শিরিন, সানাউল্লাহ মিয়া, শিরিন সুলতানা, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, নাজিম উদ্দিন আলম, শামীমুর রহমান শামীম, এমএম শাহিন, সুজাত আলী, ইশতিয়াক হোসেন, জাসাসের হেলাল খান উপস্থিত ছিলেন। এ সমাবেশ শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টায়। গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর এটি তাদের প্রথম সমাবেশ।

বাধা আতঙ্ক ও গ্রেপ্তার
সমাবেশ শুরুর আগে ১১টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী সভাস্থল থেকে ৫০০ গজ দূরে কোর্ট পয়েন্টে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ উন্নয়নের প্রচারপত্র বিলি করে। তবে মঙ্গলবার রাতে নগরীর একটি হোটেলের সামনে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদকে লাঞ্ছিত করা হয়। অভিযোগের তীর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার রাত থেকেই নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হানা দিয়ে বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। তার আগের ২৪ ঘণ্টায় বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের ৬৮ নেতাকর্মীকে আটক করে সিলেট মহানগর পুলিশ। মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক বলেন, জনসভায় যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের সিলেটের তিনটি পয়েন্ট শাহপরান মাজার গেট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ও মৌলভীবাজারের শেরপুরে গাড়িতে তল্লাশি চালায়। এসব স্থানে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা থেকে আসা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রফিক শিকদার বলেন, তিন জায়গায় তারা তল্লাশির মুখে পড়েন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব বলেন, ঢাকা থেকে আসার পথে তার বহর থেকে একটি গাড়ি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থানায় নিয়ে যায়।

চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোক্তাদির গ্রেপ্তার
সমাবেশ শেষে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সন্ধ্যা ৬টার দিকে রেজিস্ট্রারি মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভা শেষে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শহরের রোজ ভ্যালী হোটেলে যাওয়ার পর সেখান থেকে বেরোনোর পরপরই খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে পুলিশ আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের খবর শোনার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তির দাবি জানান। জেলা বিএনপির সভাপতি ইফতেখার শামীম বলেন, সমাবেশ থেকে ফেরার পথে তাদের ২ শতাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছেÑ তাদের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। গ্রেপ্তারের বিষয়ে সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ