প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মইনুলের দুঃখের ভান, গরু মেরে জুতো দান

অসীম সাহা : একাত্তর টিভির এক টকশো’তে আমাদের নতুন সময়-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলার পর থেকে সারাদেশে এটি ভাইরাল হয়ে সর্বক্ষেত্রে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সচেতন মানুষমাত্রই এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। নারীরা তো বটেই, এমনকি সাংবাদিক সমাজের সভ্য মানুষেরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মইনুল হোসেনকে প্রকাশ্যে নিশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তা না করলে তার বিরুদ্ধে আইনি-ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নারী সাংবাদিক কেন্দ্র। শাহবাগ প্রজন্মচত্বরে মানববন্ধনের আয়োজন করেছে গৌরব ’৭১। এ-ছাড়াও দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন জাতি ও পেশার মানুষ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। ভাব বুঝে চতুর মইনুল অচেনা নম্বর থেকে মাসুদা ভাট্টির কাছে কল করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

প্রশ্ন আসতেই পারে, অপমান করলেন প্রকাশ্যে, হাজার হাজার দর্শক দেখলেন, একজন সম্মানিত নারীকে কীভাবে অনয়াসে ‘চরিত্রহীন’ বলে উগ্র উষ্মার প্রকাশ করলেন আপনি! তা হলে গোপনে দুঃখ প্রকাশ কেন? এটা কি আসলে দুঃখ প্রকাশ, নাকি দুঃখ প্রকাশের ভান? তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কুলাঙ্গার পুত্র হিসেবে আপনি বহু আগেই কলংকিত হয়েছেন। অসংখ্য কেলেংকারীর নায়ক আপনি। দুভাইয়ের রেশারেশিতে নিজের অফিসের কর্মাচারি হত্যার অভিযোগ থেকে শুরু করে আরো অনেক কেলেংকারিতে আপনি যুক্ত ছিলেন ও আছেন! এটা কি শুধুই গুজব? গুজব যে নয়, প্রকাশ্যে একজন নারীকে ‘চরিত্রহীন’ বলে আপনি আপনার সেই কলংকের বোঝাকে আরো ভারী করলেন মাত্র। একজন ব্যারিস্টার ও সাংবাদিকের তকমা আঁটা সুশীল নাগরিক, রাজনীতির নতুন ষড়যন্ত্রের কুশীলব প্রধানদের অন্যতম একজন হিশবে প্রকাশ্যেই যেখানে একজন সম্মানিত নারীকে ‘চরিত্রহীন’ বলে অসম্মান করতে পারেন, সেখানে আপনি গোপনে কী করতে পারেন, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।

এখন তো মনে প্রশ্ন জাগে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুৃ যখন বাকশাল সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তাঁরই দয়ায় আপনি কোটায় নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে ‘গণতন্ত্র’ রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করে সংসদ সদস্য পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কেন? তা হলে কি বঙ্গবন্ধুর হত্যার ষড়যন্ত্রের কুশীলবদের সঙ্গে হাত মেলানোই আপনার পদত্যাগের কারণ ছিলো? আপনার পরবর্তী সকল কার্যক্রম কিন্তু মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক করে। আজ হোক, কাল হোক, এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ঠিকই বেরিয়ে আসবে।

১/১১- তে আপনি বঙ্গবন্ধুকন্যার সঙ্গেও যে অসদাচরণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারপরও শেখ হাসিনা আপনার সঙ্গে কোনো অসদাচরণ তো দূরের কথা, আপনাকে জেলখানার বদলে স্বাধীন বাতাসে নিশ্বাস নেয়ার সুযোগ দিয়েছেন। সেখানে তার কাছে কৃতজ্ঞ না থেকে শুধু ক্ষমতার লোভে আপনি বিএনপি এবং তার নেপথ্য সহযোগী জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য! এটা যে চূড়ান্তভাবে বেঈমানির একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত, তা আপনি জানেন না, তা হতে পারে না। আসলে আপনাদের মতো জ্ঞানপাপী ষড়যন্ত্রকারীরা চিরকাল বাঁকা পথে হাঁটতে পছন্দ করেন। তাই ভোটে হবে না জেনে এখন ঘোঁটে আছেন। দুর্নীতিবাজ, খুনি ও স্বাধীনতা-বিরোধীদের সঙ্গে হাত উঁচু করে ক্ষমতার জিভ বের করে এখনি ফোঁস ফোঁস করছেন। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ বলে যে প্রবাদটি চালু আছে, তা বোধহয় আপনার উগ্র মস্তিষ্কের নির্বোধ আহাম্মকির কারণে সত্য হয়ে ধরা পড়েছে।

আপনি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলে গালি দিয়ে এখন সকলের কাছে ধরা খেয়ে বসে আছেন। নিজের জালে নিজে আটকে যাওয়ার মতো বেকুব আপনি ছাড়া আর কেউ আছে কিনা, আমার জানা নেই। আসলে ষড়যন্ত্রকারীরা যে অপ্রিয় সত্য সহ্য করতে পারে না, আপনার সঙ্গে যে জামায়াত-সংযোগ আছে, এটা নিয়ে প্রশ্ন করাতে আপনি ক্ষেপে গেলেন কেন? আসলে ‘সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়দের’ যে ‘তাওয়া’ সব সময় গরম হয়েই থাকে, সাম্প্রতিককালে ’৭১ টিভিতেই সাংবাদিক নজরুল কবীরের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আসম আবদুর রব যেভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুলকে ব্যক্তিগত আক্রমণের ছুরিতে ফালা ফালা করলেন, তাতে বুঝতে অসুবিধা হলো না, ভদ্রতা ও সভ্যতা ব্যাপারটা তাদের অভিধান থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে!

আসম রব ও মইনুল হোসেনের উগ্র চেহারা দেখে মনে হচ্ছিলো, পারলে তারা এ দুজনকে গিলে খেয়ে ফেলবেন! এরকম উগ্র ও অসভ্য লোকেরা যদি ক্ষমতার স্বাদ পায়, তা হলে হিংস্র বাঘের মানুষের মাংস খাওয়ার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই তারা তা দেখিয়ে দিচ্ছেন! একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। আসম আবদুর রব থেকে শুরু করে সব পচা মাল আওয়ামী লীগের বাইরে। হালে পানি না পেয়ে এখন তারা ‘ডাঙা’ দিয়ে নাও চালানোর চেষ্ট করছেন। বেকুব না হলে এ চেষ্টা কেউ করে? ব্যর্থ চেষ্টা করে এখন তারা রাজনীতিকদের ছেড়ে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলে পড়ছেন। তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত মাসুদা ভাট্টিকে ইতর ভাষায় আক্রমণ! এবার ঠেলা সামলাতে মইনুল কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।

কিন্তু ওতে যে কাজ হবে না, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নেত্রীরা তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক একটি মোক্ষম অস্ত্র ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, “নিজে চরিত্রহীন না হলে তিনি জানলেন কী করে যে, মাসুদা ভাট্টি চরিত্রহীন?” এ প্রশ্নের জবাব তাকেই দিতে হবে। তবে নারী সাংবাদিক কেন্দ্র ও অন্যান্য অনেকের সঙ্গে আমি একমত নই যে, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেই তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। একজন খুন করে তারপর ক্ষমা চাইলেই তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে কেন?

গেরস্তের গরু মেরে তারপর তাকে জুতো দান করা কি সমাধান? তিনি যা করেছেন, তাতে তার হাত থেকে সংবাদপত্রের অধিকার কেড়ে নিতে হবে ও তার আইনপেশার সনদ কেড়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে দেশে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে হবে। আর এ-দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে তাকে বয়কট করে ‘গরু মেরে জুতো দানে’র ভান বা চালাকি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। তাতে যদি মইনুলদের শিক্ষা হয়!

 

 

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ