প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নদী আমাদের পর্যটনশিল্পের ভিত্তি হতে পারে

ফেরদৌস শিউলী : আমি কোনদিন কায়াক চালাতে পারবো, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। এর আগে একবার চেষ্টা করে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আর সেবার যে পারবো না, সেটাও কোনদিন ভাবিনি। কারণ ভিডিও চিত্রে কায়াক চালানো দেখে ভাবতাম এই জিনিষটা পেলে আমিও এমন মসৃণ ভাবে চলে যেতে পারবো বহুদূর। প্রথমবার চালাতে গিয়ে বুঝেছি, আমার ভাবনায় কতো বড়ো ভুল ছিলো। জীবনটা ভিডিও চিত্রে দেখানো সী বিচের মতো রোমান্টিক না মোটেও। কিন্তু বন্ধু ডা. ইমরুলের সাথে যখন তার নিজের হাতে বানানো কায়াক নিয়ে ইছামতিতে নামলাম বেলাশেষে, মনে হলো এতো সিনেমার দৃশ্যের চেয়েও রোমান্টিক। কায়াক নিয়ে নদীতে নেমেই এমনটা মনে হয়েছিলো তা কিন্তু বলছি না।

এক সকালে ডা. ইমরুলের উৎসাহ এবং জেদের পরিপ্রেক্ষিতে নামলাম ইছামতিতে। ডাবল বেডেড প্যাডেল (কায়াকের বৈঠা ) হাতে ধরিয়ে দিলেন। না পারার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং লজ্জায় আমি ভীষণভাবে ভীতি বোধ করছিলাম। কিন্তু বন্ধুর উৎসাহের কাছে আমার ভয় পরাজিত হলো। তার একটা বড়ো গুণ আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে; তা হলো তিনি খুব সুন্দর করে উৎসাহ দিতে পারেন। আমার তো মনে হয়, ওনার সাথে কখনো কারো এভারেস্টের চূড়ায় যাওয়া ঠিক হবে না। হয়তো ওঠার পর তিনি সুন্দর করে উৎসাহ দিয়ে লাফ দেয়ার কথা বললে যে কেউ তার কথায় সম্মোহিত হয়ে লাফ দিয়েই দেবে । আমি যে দেবো তা শতভাগ নিশ্চিত। মূল কথায় ফিরে আসি।

মূল কথা হলো, আমার জীবনের প্রথম কায়াক চালানোর রোমান্টিক অনুভুতির গল্প বা বয়ান। ডাবল ব্লেডেড প্যাডেল কেমন করে ধরতে হয়। কেমন করে ডাইনে যেতে হয়। কেমন করে বামে যেতে হয়। কেমন করে সামনে যেতে হয়। শেখাতে শেখাতে কখন যে আমাকে নদী দিয়ে বিলের ভেতর নিয়ে গেলো, আমি তো কিছু টেরই পেলাম না। চারিদিকে নানান ধরনের জলজ ফুল। ডা. ইমরুল আমাকে ফুলগুলোর নাম বলছিলেন। কতো নাম! কেশরদাম, ঝাঁঝিদাম, চাঁদমালা, পানচুলি, কাউয়াঠুঁকরি।
ফুল চিনতে চিনতে মাঝ বিলে। ওমা! এতো একটা স্বপ্নপুরী! আমি নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেললাম। নীল কচুরীপানা আর শাপলা যখন আমাকে ঘিরে ফেললো; নাটক সিনেমার নায়িকাদের মতো করে কচুরিপানা ফুল ছিঁড়ে চুলে গুঁজলাম। বন্ধু ইমরুল একটা নীল শাপলা দিয়ে বললো, এটা এই বিলের সবচেয়ে সুন্দর শাপলা। আমার তো ছবি-নাটক-সিনেমার নায়িকাদের মতন করে শাপলা তুলতে ইচ্ছা করছিলো অনেকক্ষণ ধরেই। কত দিনের স্বপ্ন! কিন্তু কায়াক নিয়ে শাপলা পর্যন্ত যাওয়াও কৌশলের ব্যাপার। সেটাও বন্ধু আমার জন্য ‘ব্যাপার না’ করে দিলো। এত সুন্দর কায়াক ভ্রমণ উপহার দেবার জন্য আমি স্বপ্নপুরী বিলের তোলা প্রথম শাপলাটা ওনাকেই দেবো ভাবলাম । কিন্তু তোলার পর উনি বললেন, আরে এটা তো সাদা শাপলা তুলে ফেলেছেন! সাদা শাপলা তুলতে আমরা ডিসকারেজ করি। কারণ এটা তুলে এলাকার দরিদ্র মানুষ বাজারে বিক্রি করে পয়সা পায়। নীল শাপলা ওদের কোনো কাজে লাগে না কারন এটা খাওয়া যায় না। তাই আমরা নীল শাপলা তুলি। প্রথমেই বাধা পড়লো! ধুর! তারপরেও তথ্য এবং মানসিকতাটা খুব ভালো লেগেছে। এবার শুরু হলো আমার শাপলা তোলা। শাপলাগুলো তুলে তুলে কায়াকে রাখছিলাম। ঠিক সেভাবে, যেভাবে গ্রামের মেয়েরা নৌকায় রাখে। আমার এই সব স্বপ্নীল স্বর্গীয় অনুভূতির কথা যেন নিজেকে বিশ্বাস করানোই কঠিন। সারা বিল কায়াক নিয়ে ঘুরলাম। জেলেরা মাছ ধরার জন্য জাল পেতে রেখেছে । বাচ্চারা নৌকা নিয়ে যেন খেলাধুলা করছে। কতকিছু যে দেখলাম!

ডা. ইমরুলের কাছে জানতে চাইলাম, ‘আপনি ডাক্তার মানুষ, কায়াকের শখ কেন মাথায় চাপলো? তিনি জানালেন, এটাকে শুধু শখ বললে ভুল হবে। তিনি কায়াক নিয়ে নিজের কথাগুলো এভাবে বললেন, ‘বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। প্রায় ৮০০ নদী বয়ে চলেছে এদেশের শরীর বেয়ে। অথচ আমরা ভুলতেই বসেছি এই নদীগুলোর কথা। নদীকেন্দ্রিক এন্টারটেইনমেন্ট এবং এ্যাডভেঞ্চারকে জনপ্রিয় করতে পারলে এই অবহেলিত নদীগুলি চলে আসবে আমাদের ফোকাসে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের পর্যটন শিল্পের ভিত্তি হওয়া উচিৎ ছিলো আমাদের সুন্দর নদীগুলি। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের নদীকেন্দ্রিক এক্টিভিটি বেজড পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশকে যত সহজে বিশ্বে পরিচিত করা সম্ভব, অন্য কোনভাবে তা সম্ভব নয়।’

আমরা আবার নদীতে ফিরে এসেছি। ততক্ষণে আমি ডাবল ব্লেডেড প্যাডেল কন্ট্রোল শিখে গেছি। কায়াক আমার ইচ্ছামতোই চলে তখন। কায়াক চালিয়ে আমরা নদীর ধারে একটা মন্দির দেখতে গেলাম। আবার দুইশ বছরের পুরোনো একটা মসজিদ দেখলাম। কিছুক্ষণ একা একা কায়াক চালানোর সময় কল্পনা-জালের অক্টোপাস আরো শক্তকরে জড়িয়ে ধরছিলো। সেই মুভির নায়িকাদের মতো মনে হচ্ছিল নিজেকে। যেখানে নায়িকা নৌকা চালিয়ে নায়কের কাছে যায় তারপর তারপর গান হয়। নৌকার পরিবর্তে কায়াক দিয়ে আমার অনেকগুলো স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটলেও চিমটি কেটে বাস্তবে নিজেকে ফিরিয়ে আনাই ছিল কঠিন।
এক ঝাঁক হাঁস নদীতে সাঁতার কাটছিলো। ডা. ইমরুলের মাথায় দুষ্টুমি ভর করলো। তিনি হাঁসেদের সাথে রেস দিলেন। ঘোর না কাটা আমি ঘাটের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ