প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতীয় নির্বাচনের সিলভার লাইন

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার: দিনে দিনে সরকার হাসি মুখে যে সব কঠিন আইন পাস করছে তার পরিণাম কী হতে পারে? একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, নাকি রাজতন্ত্র তা অগ্রিম চিন্তা করা কি অবান্তর হবে? মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা মিথ্যা কথা বলা কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক কথা বললে যেমন অপরাধ হবে, সরকার যখন পুলিশ দিয়ে বিএনপি ও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেয় তার জন্য কোনো শাস্তির বিধান রাখলে সরকারের স্বচ্ছতার প্রমাণ মিলতো। কিন্তু সরকার মিথ্যা এজাহার দিবে অথচ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না বা সমালোচনা করা যাবে না তাহলে ‘গঠনতন্ত্র’কে নামে মাত্র সংবিধানে রেখে লাভ কী? আইন করে তা তুলে দিলেই তো লেটা চুকে যায় (!)?

দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) নির্বাচন কমিশনের মতোই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সরকার যখন কারো প্রতি বিরাগভাজন হয় তখনই দুদক তার ওপর চড়াও হয়। যেমন তারেক রহমানকে খালাস দেওয়া বিচারক মোতাহার হোসেনকে দুদক তখন পর্যন্ত খোঁজ করেনি যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারের বিরাগভাজন হয়নি। যেমনটি হয়েছে জোরপূর্বক পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি এস.কে. সিনহা, আমির খসরু মাহমুদের বেলায়। এখন দেখা যাক ডা. জাফরুল্লাহর ভাগ্যে কি জোটে? সরকারের পক্ষে থাকলেই সাত খুন মাফ, আর বিরোধিতা করলেই ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠানগুলো বিরোধীদের পিছু নেয়। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন দুদক সব ‘স্বাধীন’ মিলিয়ে পরাধীনতার যে নমুনা জনগণ দেখছে তা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছে বহির্ভূত কোনো কাজ এ দেশে হবে না, তা যাই ঘটুক না কেন। জাতীয় নির্বাচন তো অনেক দূরের কথা (!)

‘কোটি টাকার বউ’ নামে একটি সিনেমা রিলিজ হয়েছিলো। এখন দেখছি জাতীয় নির্বাচনের জন্য ৭০০ কোটি টাকা বাজেট দিয়েছে, যা এ দেশের কৃষক জনতার মাথার ঘাম পায়ে ফেলানো কষ্টার্জিত অর্থ থেকে ব্যয় হবে। অথচ যাদের ট্যাক্সের অর্থে নির্বাচনি বাজেট পূরণ হবে তাদের ভোট তারা কাক্সিক্ষত প্রার্থীকে দেওয়ার মতো অবস্থান এখনো দৃশ্যমান না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই বলেছেন যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা এ নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না।

বিএনপির সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে যে কারণে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি সেই একই কারণ নিষ্পত্তি না করে বিএনপি যদি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তবে এতো নেতাকর্মী জেল, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে তাদের নিকট জবাব কী? দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে লেভেল প্লেয়িংফিল্ডের কোনো নমুনা দৃশ্যপটে আসে না। তাছাড়া লেভেল প্লেয়িংফিল্ড নিশ্চিত না করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার নামান্তর হবে সরকারের ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশের বৈধতা প্রদান করা।

সংবিধানের ৫৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলে বা স্বীয় পদে বহাল না থাকিলে মন্ত্রীদের প্রত্যেককে পদত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে, তবে এই পরিচ্ছেদের বিধানবলী সাপেক্ষে তাহাদের উত্তারাধিকারীগণ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাহারা স্বপদে বহাল থাকিবেন’ এছাড়াও চলমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময়েও জাতীয় সংসদ সদস্যরা স্বীয় পদে বহাল থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন। আর প্রধানমন্ত্রী ও তার দল/সরকার সংবিধান থেকে চুল পরিমাণ নড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন, যেমটি পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব  খান, ইয়াহিয়া, এরশাদের মুখ থেকে দেশবাসী শুনেছে। তারপরও তাদের নড়তে হয়েছিলো বটে, তবে এ জন্য জাতিকে অনেক তেল-মরিচের ঝাল পোহাতে হয়েছে। এটাই এখন বলা বাহুল্য যে, চলমান সংবিধান মোতাবেক লেভেল প্লেয়িংফিল্ড থাকার কোনো সুযোগ নেই। জাতি ঐক্যফ্রন্টের দিকে তাকিয়ে আছে, ঐক্যফ্রন্ট যদি তাদের দাবিতে অনড় থাকে, কোনোপ্রকার আপোস না করে বা কোনো কোনো নেতা বা দল তলে তলে আঁতাত না করে তবে সরকারের পক্ষে নৌকা দিয়ে এতো বড় কন্টকময় সাগর পাড়ি দেওয়া দুরূুহ হবে। ঐক্যফ্রন্টের দৃঢ়তা ও ঈমানি শক্তির ওপরই নির্ভর করছে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের সিলভার লাইন।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ