প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আলোচিত-সমালোচিত মইনুলের রাজনীতি ও সাংবাদিকতা

আরিফুর রহমান তুহিন : দেশজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তি এখন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলায় মানহানি মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি এখন কারাগারে। প্রয়াত সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র মইনুলের রয়েছে আলোচিত ও সমালোচিত জীবন। আমাদের সময় ডটকম পাঠকদের জন্য তার খানিকটা তুলে ধরা হলো। পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ব্যারিস্টার মইনুল। তার শৈশব কেটেছে সেখানেই। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে  স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সনদ লাভ করেন বঙ্গবন্ধু সরকারের সাবেক এই এমপি। তিনি লন্ডনের মিডল টিম্পল ইন থেকে ব্যারিস্টার ইন ল সনদ অর্জন করে নিজেকে আইন পেশায় নিয়োজিত করেন।

গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে মইনুল
মইনুলের পিতা মানিক মিয়া ১৯৬৯ সালের ১ জুন মারা গেলে প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন এই আইনজীবী। পিতার মৃত্যুর পর ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মানিক মিয়ার দুই সন্তান মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদ-সরকারের সময়ে টেকনোক্র্যাট কোটায় যোগাযোগমন্ত্রী, ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যোগাযোগমন্ত্রী এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর থেকে মইনুল হোসেন পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। আর তার ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুু সম্পাদনা করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক ইত্তেফাককে পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে তারা আবারো পত্রিকার মালিকানা ফিরে পান। পত্রিকার মূল মালিকানায় ১১ শতাংশ তার দুই বোনের থাকলেও সেগুলোও মূলত দুই ভাই দেখাশোনা করতেন। বর্তমানে তিনি ডেইলি নিউ নেশন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক ম-লীর সভাপতি। ১৯৭৫ সালের ১৭ জুন ইত্তেফাককে জাতীয়করণ করা হলে মালিকানা হারান মইনুল ব্রাদারস। তবে ওই বছরের ২৪ আগস্ট আবার মালিকানা ফিরে পান তারা।

পরবর্তীসময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাথে সাথে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। এরশাদ সরকারের সময়ে মইনুল হোসেন কর্তৃত্ব হারান তার ভাইয়ের কাছে । ২০০৭ সালের ১/১১ পরবর্তী সময়ে আবার সেই কর্তৃত্ব ফিরে পান মইনুল। এ সমেয় তিনি ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নেন। কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১০ সালের ২ মে একটি হোটেলে ইত্তেফাক ভবনের মালিকান ও ১০ কোটি নগদ টাকার বিনিময়ে ইত্তেফাকের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ছোট ভাই মঞ্জুকে হস্তান্তর করেন তিনি।

রাজনীতিতে মইনুল
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার পিতা মানিক মিয়ার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সাভাবিকভাবেই তার সন্তানরাও বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য লাভ করেন এবং সেই আদর্শে বড় হন। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়া মারা গেলেও মইনুল তার পত্রিকাকে আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র হিসেবেই সম্পাদনা করেন। এতে পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী ক্রোধে ফেটে পড়েন।
১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিক মিয়া ও ইত্তেফাকের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মইনুলকে পিরোজপুরের একটি আসন থেকে মনোনয়ন দেন বঙ্গবন্ধু। নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের একজন আইনপ্রণেতা হিসেব আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংস্কারের সময়ে বঙ্গবন্ধু বাকশাল কায়েম করেন এবং ইত্তেফাককে জাতীয়করণ করা হলে প্রতিবাদে মইনুল সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর তৎকালীন মোশতাক সরকার ইত্তেফাকের মালিকানা তাকে ফিরিয়ে দেয়। মোশতাক ও জিয়ার শাসনামলে ইত্তেফাক আর আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র হিসেবে ফিরে আসেনি। যদিও মইনুলই তখন এই পত্রিকার প্রধান কর্তা ছিলেন।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ইত্তেফাকের শিরোনাম নিয়েও বর্তমান সময় পর্যন্ত আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যদিও মইনুলদের দাবি, ওই সময়ে পত্রিকার মালিকানা ছিলো সরকার এবং সম্পাদনা ও প্রকাশনায় তাদের কেউ ছিলেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় মালিকানা ফিরে পাওয়া নিয়ে একটি মহল তখন থেকেই সমালোচনা করে আসছিলো।
মইনুল হোসেনের রাজনীতি আলোচনায় স্থান পায় ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। তিনি ফখরুদ্দিন সরকারের আইন, বিচার, সংসদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে তিনি যতটা আলোচিত উপদেষ্টা হিসেবে তার থেকে বেশি আলোচিত তার কর্মকা-ে।
১/১১-এর পর মাইনাস টু ফর্মুলা (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়া) বাস্তবায়নে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল- এমন অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সংসদে একবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তাকে টেলিফোন করে (শেখ হাসিনা) চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরতে বারণ করেছিলেন মইনুল।
বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির যে মামলায় সাজা খাটছেন সেই মামলাটিও তার সময়ে করা। এ ছাড়াও আরো অসংখ্য মামলা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন জাতীয় নেতাদের নামে দায়ের করা হয়েছিলো এবং জেল খাটতে হয়েছিলো।

বিএনপির একটি অংশের নেতাদের অভিযোগ, খালেদা জিয়া যাতে ১/১১ সরকারের সময়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় তার জন্যই বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব তারেক রহমানের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। তারেককে মইনুল খুবই অপছন্দ করেন জানিয়ে ওইসব নেতারা বলেন, সম্প্রতি মইনুলের ফাঁস হওয়া ফোনালাপে তিনি উল্লেখ করেছেন, “তারেকের নেতৃত্ব ধ্বংস করার জন্যই ড. কামাল হোসেনকে (জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে) নিয়ে আসা হয়েছে।” ২০১০ সালে ইত্তেফাকের মালিকানা হারানোর পর মইনুল হোসেন অনেকটাই চোখের আড়ালে চলে যান। দীর্ঘ বিরতি শেষে তিনি আবার আলোচনায় আসেন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সময়ে। এই জোটে তার কোনো পদ-পদবি না থাকলেও প্রত্যক্ষভাবে তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

এ নিয়ে মইনুল হোসেনকে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম কর্মীরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেছেন, তিনি কোনো রাজনীতি করেন না। দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্যই তিনি এই ঐক্যকে সহায়তা করছেন। মইনুল নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয় দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাসুদা ভাট্টিকে একটি টকশোতে ‘চরিত্রহীন’ বলায়। গত ১৬ অক্টোবর একাত্তর টেলিভিশনের টক শো ‘একাত্তরের জার্নাল’ এ ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে মাসুদা ভাট্টি প্রশ্ন করেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আপনি যে হিসেবে উপস্থিত থাকেন- আপনি বলেছেন আপনি নাগরিক হিসেবে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বলছেন, আপনি জামায়াতের প্রতিনিধি হয়ে সেখানে উপস্থিত থাকেন।’
মাসুদা ভাট্টির এই প্রশ্নে রেগে গিয়ে মইনুল হোসেন বলেছিলেন, ‘আপনার দুঃসাহসের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনি ‘চরিত্রহীন’ বলে আমি মনে করতে চাই। আমার সঙ্গে জামায়াতের কানেকশনের কোনো প্রশ্নই নেই। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তা আমার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।’

এর পরপরই বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। মাসুদা ভাট্টি মইনুল হোসেনের নামে মানহানি মামলা করলে মইনুল উচ্চ আদালত থেকে ৬ মাসের আগাম জামিন নেন। এরপর গত সোমবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের সময় ‘তার’ নজরে আনলে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা মামলা করেন, বাকিটা আমি দেখছি।’ এর ৬ ঘণ্টার মাথায় রংপুরের একটি মানহানি মামলায় আটক হলেন তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ার ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সূত্র জানায়, সোমবার রাতে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন রাজধানীর উত্তরায় জেএসডি নেতা আ স ম রবের বাসায় একটি বৈঠকে মিলিত হলে ডিবি পুলিশের একটি টিম বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় মইনুলকে গ্রেফতার করা হয়। এরপরের দিন তাকে আদালতে তোলা হলে শুনানি শেষে জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। সম্পাদনা : আনিস রহমান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ