প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দপ্তরে দপ্তরে ডিও লেটারের স্তূপ

কালের কন্ঠ : চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তাও কমে গেছে। নির্বাচনের মাত্র আড়াই মাস আগে অর্থনীতির এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচক দেখার বা বোঝার সময় নেই সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের। নির্বাচন সামনে থাকায় জনগণকে খুশি করার জন্য তাঁদের এ মুহূর্তে দরকার প্রকল্প, দরকার টাকা। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে তদবির বেড়ে গেছে মন্ত্রী-এমপিদের। এলাকার রাস্তা নির্মাণের জন্য এক মন্ত্রী ডিও লেটার (আধাসরকারি পত্র) পাঠাচ্ছেন আরেক মন্ত্রীর কাছে। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট নির্মাণের টাকা চেয়ে অনুরোধপত্র পাঠাচ্ছেন মন্ত্রীর কাছে। মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যানরাও দৌড়ঝাঁপ করছেন প্রকল্প ও টাকার জন্য।

তদবিরে পিছিয়ে নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কাউকেই অবশ্য খালি হাতে বিদায় করছে না সরকার। সবাইকে খুশি রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে সরকারের পক্ষ থেকে। যদিও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ আসে যেসব খাত (এনবিআর ও বিদেশি অর্থায়ন) থেকে, সেসব খাতে অর্থ আদায়ের গতি মন্থর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারপন্থী একাধিক প্রভাবশালী শিক্ষক কয়েক মাস ধরে সরকারের শীর্ষপর্যায়ে তদবির করে আসছেন তাঁদের একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য। অবশেষে সফল হয়েছে সে তদবির। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর অবকাঠামো উন্নয়নের এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প। শিক্ষকদের তদবিরে এক হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে গতকাল।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জনপ্রতিনিধিদের তদবিরে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট ছয়টি একনেক বৈঠক হয়েছে। এই ছয়টি সভায় ১০৫টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। শুধু গতকালের একনেক সভায় রেকর্ড ২১টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৮২ কোটি টাকা। এ বছর এডিপির আকার এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু গত দেড় মাসে যত টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা পুরো এক বছরের এডিপির ৬১ শতাংশ।

নির্বাচনের আগে এভাবে জনপ্রতিনিধিদের তদবির এবং প্রকল্প অনুমোদন কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এমন প্রকল্প অনুমোদন-বাস্তবতার সঙ্গে বহুকাল বসবাস করছি। এটার সমাধান আসতে হবে। সেই দিনটির অপেক্ষায় আছি।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান নির্বাচনের আগে অস্বাভাবিক হারে প্রকল্প অনুমোদনের গতিকে তুলনা করেছেন রকেট গতির সঙ্গে। তাঁর মতে, এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। প্রকল্প ঘোষণার একটা মূল্য আছে। এর প্রভাব তো মাঠপর্যায়ে পড়বেই। সেই সুবিধা নিতে চায় ক্ষমতাসীন দল। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের গতি কম, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। এডিপি বাস্তবায়নেও গতি নেই। এর ফলে নতুন করে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো দীর্ঘসূত্রতায় পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।

সচিবালয়ে বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে দেখা গেছে, নিজ নিজ আসনে যেসব কাজ বাকি আছে, সেসব কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ এসেছে সংসদ সংস্যদের অনুরোধপত্রে। আবার নতুন প্রকল্প দ্রুত অনুমোদনের দাবি করেছেন অনেকে। গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি লিংক রোডের পরিত্যক্ত খাল ভরাট এবং ফুলছড়ি বাজার থেকে কবরস্থান পর্যন্ত ৩০০ মিটার সড়ক মেরামত করার অনুরোধ করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক তাঁর আসনের তিনটি সড়ক সংস্কার করতে অনুরোধপত্র পাঠিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। অনুরোধপত্রে রাজশাহী-দামকুড়া-কাকনহাট-আমনুরা, বিজয়নগর-উজানপাড়া ও বসন্তপুর-দামকুড়া-ছাব্বিশনগর-গুনীগ্রাম-বাকসারা সড়ক সংস্কারের অনুরোধ জানান ওমর ফারুক।

অনুরোধপত্র পাঠানোর তালিকায় আছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ আরো অনেকে। শুধু সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুই শাখায় গত এক মাসে ৯০টি অনুরোধপত্র আসে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে। একইভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রেলপথ, যুব ও ক্রীড়া, পানিসম্পদসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অনুরোধপত্র আসছে।

অন্যদিকে জলবায়ু তহবিল থেকেও টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন এমপি ও মেয়ররা। তাঁদের চাপে পড়ে আগামী ২৯ অক্টোবর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় ১১০টি প্রকল্প উত্থাপন করার কথা রয়েছে। সেখান থেকে অন্তত ৮০টি প্রকল্প পাস হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।

নির্বাচনের আগে এত বেশি প্রকল্প অনুমোদন কেন দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘দেশপ্রেমের তাড়নায় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকারের সময় একনেক হবে না। তাই এখন বেশি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।’

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমাদের দেশে এই রীতি বহু আগের। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দশ বছর ধরে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে গেছে। মানুষের প্রত্যাশার চাপে বেশি প্রকল্পের চাপ তৈরি হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরাও আমাদের কাছে এসে অনুরোধ করেন, অনুরোধপত্র দেন। এটা দোষের কিছু না।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য মতে, এ বছর প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা মিলেছে ৮২ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে তিন কোটি ডলার কম। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য মতে, এ বছর প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। গত তিন অর্থবছরের তুলনায় এটি কম।

ভোটারদের মন ভরাতে বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিদের চাপে পড়ে এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান। তিনি বলেন, সরকারের শেষ সময়ে শুধু প্রকল্প অনুমোদনের হিড়িক পড়েনি, প্রশাসনেও বদলি, পদোন্নতি বেড়েছে। তা দেখে মনে হচ্ছে, ভোটের জন্যই সরকার শেষ সময়ে এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

বেশি প্রকল্প পাস হওয়ার বিষয়টি সরকারও স্বীকার করছে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায়। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাই সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।

উদ্বোধনের হিড়িক : ভোটের আগে প্রকল্প উদ্বোধনের মেলা বসেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রকল্প উদ্বোধন করছেন। এলাকার যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নে বরাদ্দ চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিতভাবে উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করছেন বিভিন্ন এলাকার। তা নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভোটারদের কাছে গিয়ে প্রচার করছেন।

কেউ কেউ প্রকল্প অনুমোদন না হলেও ফলক উন্মোচন করছেন। আবার কোথাও কোথাও প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও সে প্রকল্প উদ্বোধনও করা হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ