প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকেই যত অভিযোগ

সমকাল : নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মহাসড়কের পাশ থেকে চার যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের পর রহস্যের জট খোলেনি তিন দিনেও। কেন তাদের হত্যা করা হয়েছে, কারা এতে জড়িত- নিশ্চিত হওয়া যায়নি সে ব্যাপারে। তবে স্বজনদের অভিযোগের তীর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকেই। তারা বলছেন, ডিবি পরিচয়ে ধরে নেওয়ার পর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় সাক্ষাৎও করেছেন একজনের সঙ্গে। পরদিন সকালে তিনিসহ চারজনের লাশ পাওয়া যায়। এদিকে, চার খুনের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা নিয়েও সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগীরা। তাদের মতে, অজ্ঞাতদের আসামি করে দুটি মামলা দায়েরের মাধ্যমে যেন দায়িত্ব শেষ করেছে পুলিশ। তা ছাড়া এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে দেওয়া পুলিশের বক্তব্য ও মামলার এজাহারের তথ্যের মধ্যেও রয়েছে ফারাক। ওই ঘটনার পর আড়াইহাজার উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ঘটনাটির সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এতে পুলিশের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে এখনও কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। নিহত চারজন অপরাধমূলক কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত কি-না এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি-না, তা জানার চেষ্টা চলছে। তবে পাবনায় তাদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগের কথা বলেছে স্থানীয় পুলিশ।’

রোববার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের মুল্লুক চানের পুকুরের সামনে সড়কের দু’পাশ থেকে চার যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন লাশের পাশ থেকে দুটি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। নিহতরা হলেন লুৎফর রহমান মোল্লা, সবুজ সরদার, ফারুক প্রামাণিক ও জহিরুল। তাদের মধ্যে লুৎফর ছাড়া অপর তিনজন পাবনার আতাইকুলার পুষ্পপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আর লুৎফর রহমানের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার উত্তর আকনবাড়িয়া কালীবাড়ি এলাকায়।

রোববার লাশ উদ্ধারের পর আড়াইহাজার থানার ওসি মুহাম্মদ আবদুল হক গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বর থেকে ঘটনাটির বিষয়ে জানানো হয় তাদের। পরে তারা গিয়ে লাশ উদ্ধার করেন। কিন্তু মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশের একটি দল নৈশকালীন দায়িত্ব পালনকালে রোববার ভোর ৫টার দিকে পুরিন্দায় অবস্থানের সময়ে লোকমুখে দুই দল অস্ত্রধারীর গোলাগুলির কথা জানতে পারে। এর ২৫ মিনিট পর টহল পুলিশ পাঁচরুখীর ফকিরবাড়ীর সামনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত চারটি লাশ দেখতে পায়। পরে থানার ওসিকে বিষয়টি অবগত করেন তারা। মামলার বাদী এসআই রফিউদ্দৌল্লাহ জানান, ওসিকে তিনিই প্রথম চার লাশের সংবাদ দেন। কিন্তু ওসি মুহাম্মদ আবদুল হক দাবি করেন, এসআই রফিউদ্দৌল্লাহ তাকে বিষয়টি জানাননি। ডিউটি অফিসার মোস্তফা ৯৯৯ নম্বর থেকে লাশের বিষয়টি জেনে তাকে অবহিত করেন।

পুলিশের বক্তব্য ও মামলার এজাহারের তথ্যে এমন গরমিলের কারণে জনমনে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বান্টি থেকে পাঁচরুখীর দূরত্ব এক কিলোমিটার, আর পুরিন্দা থেকে পাঁচরুখীর দূরত্ব আড়াই কিলোমিটার। মহাসড়কের এই অংশে পুলিশ টহলে থাকলেও তারা গুলির শব্দ শুনতে পায়নি। অথচ ঘুমন্ত এলাকাবাসী গুলির শব্দে জেগে ওঠে।

এ ব্যাপারে ওই দিন টহলে থাকা আড়াইহাজার থানার এসআই রফিউদ্দৌল্লাহ জানান, তারা আধা ঘণ্টা বাজারগুলোতে অবস্থানের পর বান্টি থেকে বাঘবাড়ী পুরিন্দা পর্যন্ত মহাসড়কে টহল দেন। এর মাঝে পুলিশের অনুপস্থিতিতে মহাসড়কে কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

আড়াইহাজার থানার ওসি জানান, নিহত চার যুবকের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার থানায় কোনো মামলা নেই। অন্য কোথাও মামলা আছে কি-না, এ ব্যাপারে তার কাছে তথ্য নেই। ঘটনাটি পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে। ওই রাতে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, তা জানার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এদিকে নিহত বাসচালক ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা সাংবাদিকদের বলেন, শনিবার রাতে তিনি খাবার নিয়ে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে যান। সেখানে স্বামীর সঙ্গে তার দেখা ও কথা হয়। ওই সময় ফারুক স্ত্রীকে জানান, তাকে বেধড়ক পিটিয়েছে পুলিশ। রোববার সকালেও তিনি স্বামীর খোঁজে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করেন। কিন্তু তখন পুলিশ তাকে গুলি করার ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়।

নিহত সবুজ সরদারের বাবা খায়রুল সরদার জানান, রূপগঞ্জের ভুলতার গাউছিয়া থেকে ১৫ অক্টোবর তার ছেলেসহ চারজনকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পান। এর পর তাদের আর কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না তারা। পরে গণমাধ্যমে খবর ও ছবি দেখে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন।

পাবনায় মামলা-জিডি নেই :আড়াইহাজারে যে চারজনের লাশ পাওয়া গেছে, সবার বাড়ি পাবনায়। তাদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। কী কারণে তাদের হত্যা করা হয়েছে, সে ব্যাপারে স্বজনরা কোনো ধারণা করতে পারছেন না। নিহত ফারুক হোসেনের মেয়ে ফাহিমা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবা তো কোনো দোষ করেননি, তাহলে কেন তাকে মেরে ফেলা হলো?’

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘নিহতদের বিরুদ্ধে পাবনার কোনো থানায় মামলা, জিডি বা অপরাধের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তবে তারা পাবনার বাইরে ছিনতাইসহ অন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

নিহত সবুজের মা আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘লিটন, জহুরুল ও সবুজ সম্পর্কে চাচাতো ভাই। তারা পাবনার আজাদ বেকারিতে কাজ করতেন। তবে পাবনা শহরের বড় ব্রিজ এলাকায় অবস্থিত আজাদ বেকারিতে গিয়ে জানা যায়, কয়েক বছর আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে।

লিটনের মা শেফালী বেগম দাবি করেন, ছেলের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে তিনি জানতেন না।

এদিকে ধর্মগ্রামের বাসিন্দা মাসুম হোসেন বলেন, ‘নিহতরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করতেন। তবে তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এমনটা কখনও শুনিনি।’

পাবনার আতাইকুলা থানার ওসি মাসুদ রানা জানান, তাদের পূর্ববর্তী রেকর্ড ভালো নয়। তারা গ্রামে নিয়মিত থাকত না। তারা বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ