প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বিএনপি

ইনকিলাব : ১২ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে চিকিৎসাধীন। শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রত্যেকটি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা। কারাগারেও বন্দি রয়েছেন অসংখ্য নেতাকর্মী।

এই অবস্থায় সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংবিধান অনুয়ায়ি বর্তমান সরকারের অধীনেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও একই পরিস্থিতিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা। তাই এবার নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে যুক্তফ্রন্ট, গণফোরামকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে বিএনপি। আজ সিলেটে হতে যাচ্ছে এই জোটের প্রথম মহাসমাবেশ। রাজপথের আন্দোলনের জন্য এই জোট গঠন করা হলেও ২০ দলীয় জোটের মতো ঐক্যফ্রন্টও নির্বাচনী জোটে পরিণত করতে চায় দলটি। চাওয়া-পাওয়া ভুলে বৃহত্তর স্বার্থে শরিকদের বড় ধরণের ছাড় দিয়ে হলেও বর্তমান সরকারের বিদায়ের পক্ষে দলটির নেতাকর্মীরা। দলটি সূত্রে জানা যায়, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যে কোন মূল্যে বর্তমান সরকারের বিদায়ের জন্য বার্তা পাঠিয়েছেন কারাবন্দি অবস্থা থেকে। একইরকম নির্দেশনা দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চাওয়া-পাওয়া, ভাগাভাগি, দাবি-দাওয়াতে মনোযোগ না দিয়ে গণতন্ত্র ও দেশের স্বার্থে নেতাকর্মীদের কাজ করতে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতির এই চরম দুর্দিনে জাতি মুক্তির পথ খুঁজছে, সকলে পরিবর্তন দেখতে চান, এই সরকারের পতন দেখতে চান। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চান। যিনি তার সারাটা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। এজন্যই তাকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাবন্দি করা হয়েছে। তিনি জেলে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন, দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে, দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। সকল দল, মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি সবাইকে এই স্বৈরাচার ও দখলদার সরকারকে সরাতে হবে। এজন্য ঐক্য হচ্ছে একমাত্র পথ। এর কোন বিকল্প নাই। কারাগার থেকেও খালেদা জিয়া খবর পাঠিয়েছেন, আমার কি হবে সেটি নিয়ে পরোয়া করিনা। যে কোন মূল্যে এই দুঃশাসন থেকে মুক্ত হতে, স্বৈরাচার সরকারকে সরাতে হবে।

জোট গঠন এবং জোটের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা রকম সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আসন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর পদ কে পাবেন কিংবা মন্ত্রী ইত্যাদি। তবে এসব কিছুকেই গণমাধ্যমের অনুমানভিত্তিক বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। তারা মনে করেন এখন কোন চাওয়া পাওয়া নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি তাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কেন আলোচনা করে শীর্ষ নেতারা যে কোন বড় ধরণের ত্যাগও স্বীকার করতে রাজি আছেন। যার দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে বিএনপি। ফ্রন্টের সভায় ৭ নম্বর চেয়ারে বসেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যে দাবি এবং লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে সেই দাবি আদায় হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকল দল ও জোটকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন ও কনকল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারেও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তারা। এক্ষেত্রে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে ছাড় এবং ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত নেতাকর্মীরা।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে এগিয়ে নিতে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিতে রাজি। বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত। ঐক্যফ্রন্টের সভায় আমাদের মহাসচিব বসেন ৭ নম্বর চেয়ারে। সভাপতির পাশের চেয়ারগুলোয় বসেন আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, মোস্তফা মহসীন মন্টুও বসেন। আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বসেন আরও দূরে। আমরা মেনে নিয়েছি। কারণ বড় দল হিসেবে আমাদের অবশ্যই ছাড় দিতে হবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয়তাবাদী দল সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক সহশীলতা দেখিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে, মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে, মানুষের কথা বলার অধিকার, ন্যায়-বিচার, আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার স্বার্থে সর্বোচ্চ ছাড় দেবে বিএনপি। তবে এখন দল ও দেশের মানুষের কাছে মূল প্রাধান্য বিষয় হচ্ছে একটি নির্দলীয় নির্বাচনকালী সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন।

বিএনপি’র সিনিয়র নেতারা জানান, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন যে কোন মূল্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সকল দল ও ব্যক্তিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার এবং তাদের নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার এই আন্দোলনে সফল হলে যারা শরিক থাকবেন তাদেরকে নিয়েই দেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক এবং জনকল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশনা তারা দিয়েছেন।
এর আগে ২০০১ এবং ২০০৮ সালে জোটগতভাবেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। পরবর্তীতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে জোটগতভাবেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। চলতি বছরের শেষে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে পারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি দল আওয়ামী লীগ প্রচারণায় নামলেও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাহী ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন, ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার বাতিলসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দলটি। এসব দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামকে নিয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় ঐকফ্রন্টও। ২০ দলীয় জোটের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে রাজনৈতিক কৌশলে বিজয়ী হিসেবে দেখছেন বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল নেতারা। রাজপথে এই জোটের নেতৃত্বে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি পূরণ হবে বলে মনে করেন তারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এখন যে জোট গঠন করা হয়েছে তা ৭ দফার ভিত্তিতে আন্দোলনের জন্য। এটি নির্বাচনী জোট নয়। আগে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ। এটি হলে পরবর্তীতে আমরা নির্বাচনী জোট ঘোষণা করবো। তখন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে। জাতীয় ঐক্য গঠন হয়েছে, ছোটখাটো কোন বিষয় নিয়ে কোন কিছু আটকে থাকবে না। বড় দল হিসেবে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বার্থে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, অতীতে কোন সময় নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে জোটের মধ্যে কোন সমস্যা হয়নি। ছোটখাট কিছু বিষয় থাকে কিন্তু সেগুলো বড় করে দেখার সুযোগ নাই। বড় দল হিসেবে বিএনপি সব সময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। আগামীতেও করবে। ৭ দফা দাবি পূরণ হলে বিএনপি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে। দলের সবারই ছাড় দেয়ার মন মানসিকতা রয়েছে। তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, এখনো নির্বাচন নিয়ে কোন কথা হচ্ছে না। আমাদের দলের অবস্থান হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া কোন নির্বাচন হবে না। তাকে মুক্ত করেই, নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে বিএনপি। নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হলেই তখন আসন বন্টন, ভাগাভাগি অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হবে।

জোটগত নির্বাচনে বিএনপির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য আতাউর রহমান ঢালী বলেন, অতীতে বিএনপি দুইবার জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সেসময় আসন কিংবা দাবি দাওয়া নিয়ে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। ফলে আগামীতেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এই বিষয়টা বড় কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না। কারণ বড় দল হিসেবে অন্যদেরকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হয় এবং বিএনপির সেটি আছে।

শুধু কেন্দ্রীয় নেতারা নয়, তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরাও দলের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনা মেনে যেকোন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত আছে জানিয়ে ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন বলেন, আমরা চাই দেশে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসুক। মানুষ তাদের নিজের ভোট নিজে দেয়ার অধিকার ফিরে পাক। জাতির স্বার্থে, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বিএনপি সবধরণের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছে। পরিস্থিতি বিবেচনায়, বৃহত্তর স্বার্থে দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে নির্দেশনা দেবেন দলের প্রতিটি নেতাকর্মী তা মেনে নেব। আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত যে কোন ছাড় দেয়ার জন্য।

যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা, নির্যাতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। স্বাধীন দেশে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কোন নিরাপত্তা নেই, কথা বলার অধিকার নেই, আইনের শাসন নেই। ফলে তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাবনা হচ্ছে দেশকে, দেশের জনগণকে প্রথমে স্বৈরাচারমুক্ত করা। দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে স্বস্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। এজন্য ২০ দলীয় জোট কিংবা ঐক্যফ্রন্টসহ আরও যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপির সাথে যুক্ত হবে তাদেরকে যে কোন বিষয়ে ছাড় দিতে হলেও কোন আপত্তি থাকবে না।

আড়াইহাজার বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান সুমন বলেন, দেশে এখন অগণতান্ত্রিক, স্বৈরশাসন চলছে। দেশের মানুষ দিশেহারা, বাকস্বাধীনতা নাই, সব সেক্টর ভেঙে পড়েছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এ থেকে উত্তোরণের জন্য জাতীয় ঐক্য হয়েছে। তৃণমূল বিএনপি এই ঐক্যকে স্বাগত জানায় এবং আশা করে এই নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি জাতীয় নেতৃবৃন্দ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই দিকনির্দেশনা দেবেন। এতে বিএনপি, দলের নেতাকর্মীদের যে কোন রকম ছাড় বা ত্যাগ স্বীকার করতে হলেও তা করতে প্রস্তুত। কারণ এখন সবার আগে প্রয়োজন এই স্বৈরশাসকের বিদায়, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ