প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শামসুর রাহমান : আধুনিক বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ

অসীম সাহা : রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ত্রিশের দশকে যে আধুনিক বাংলা কবিতার যাত্রা শুরু হয়েছিলো, তার ভেতরে ছিলো নতুন প্রপঞ্চ নির্মাণের আকাক্সক্ষা এবং বাংলা কবিতাকে বিশ্বকবিতার সমান্তরাল ক্ষেত্রে দাঁড় করানোর এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ১৮৫৭ সালে ফ্রান্সে কবিতায় যে আধুনিকতার সূচনা পৃথিবীর কবিতাকে একটি নতুন ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড় করিয়েছিল এবং বিস্ময়ের সঙ্গে নতুন ধারার কবিতা একটি ঘোরলাগা অভিনবত্বের চমকে পাঠককে শিহরিত করেছিল, তারই ঐতিহাসিক পরম্পরায় ত্রিশের আধুনিক বাংলা কবিতা দীর্ঘকাল ধরে রোমান্টিক চেতনায় অভ্যস্ত বাংলা কবিতার পাঠককে বিমূঢ় করে দেয়া সত্ত্বেও তার অনিবার্যতাকে অস্বীকার করে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেয়নি।

আজও বাংলা কবিতাকে যে আধুনিকতা নিয়তির মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, তাকেও চিহ্নিত করা যেতে পারে ত্রিশের দশকের আধুনিক বাংলা কবিতার বিস্তৃতি হিসেবে। গোটা চল্লিশের দশক জুড়ে, দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে, এই ধারারই একটি গতানুগতিক উত্তরাধিকার বহন করে আধুনিক বাংলা কবিতা অনেকটা স্তিমিত ভঙ্গিতে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের বিভক্তির মধ্য দিয়ে দ্বিখ-িত বাংলায়ও যে নতুন কবিতা সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ করা গেছে, তাতে ত্রিশকে অস্বীকার না করেও তাকে অতিক্রমের সাধনা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, আধুনিক বাংলা কবিতার গতানুগতিক ধারার বাইরে আরও একটি নতুন প্রপঞ্চ নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন কালের কবিরা কিছুতেই পিছিয়ে থাকতে রাজি নন। এটা যেমন পশ্চিমবঙ্গের কবিদের ক্ষেত্রে সত্যি, তেমনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কবিদের ক্ষেত্রেও সত্যি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন চেতনায় উজ্জীবিত তারুণ্যের প্রতিনিধি হিসেবেই পূর্ববঙ্গের কবি শামসুর রাহমান একটি ভিন্নতর ব্যঞ্জনা নিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতায় তাঁর আবির্ভাবের আগাম বার্তাটি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

মনে রাখা দরকার, শুধু শরীরী পরিবর্তনের মধ্যেই আধুনিকতার শর্তগুলো পূরণের অঙ্গীকার থাকে  না, আধুনিকতা নির্মাণের ক্ষেত্রে শরীর, মন, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং দর্শনের একটি বিশাল ভূমিকা থাকে। পঞ্চাশের দশকের কবি হিসেবে শামসুর রাহমান এই শর্তগুলোকে মৌলিকভাবে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর প্রারম্ভিক কবিতায় ত্রিশের কবিতার যে ছায়া লক্ষ করা গিয়েছিল, ধীরে ধীরে তা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি একটি নিজস্ব অবয়ব নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যাকে বলা যেতে পারে সম্পূর্ণরূপে শামসুর রাহমানীয় অবয়ব।

জিন্নাহ কর্তৃক ১৯৪৮ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রদের বিদ্রোহী সত্তার উদ্বোধন এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে প্রধান করে তুলেছিল, একজন তরুণ হিসেবে পঞ্চাশের দশকে শামসুর রাহমান তার দ্বারা তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে এই অঞ্চলের আধুনিক বাংলা কবিতাকে একটি দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের আধুনিক কবিতা আজ যেখানে তার শিকড় প্রোথিত করে ডালপালা বিস্তারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেছে, তার ভিতপাথর স্থাপন করেছিলেন বলেই যেমন আধুনিক বাংলা

কবিতায় শামসুর রাহমানের গুরুত্ব ঐতিহাসিক, তেমনি বাঙালি জাতিসত্তার মৌলিক প্রাণস্পন্দনকে নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান রাখার কৃতিত্বও প্রধানত তাঁরই।

শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান : দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট কাব্যগ্রন্থগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে এই সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে, সুদীর্ঘদিন ধরে যে পাকিস্তানি প্রেতাত্মার দীর্ঘস্থায়ী পাথর সরানোর কাজে বাংলার জনগণকে জীবনপণ লড়াই করে এগুতে হয়েছে, তার প্রতিটি বাঁকে শামসুর রাহমানের উজ্জ্বল উপস্থিতি বাংলাদেশের কবিতায় তাঁর আসনটিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে।

সময় ও প্রতিবেশ যেমন একজন শামসুর রাহমানকে নির্মাণ করেছে, তেমনি একজন দূরদ্রষ্টা কবি হিসেবে তিনিও নির্মাণ করেছেন জাতির প্রয়োজনীয় মুহূর্তের অবিস্মরণীয় ভাস্কর্য, যা বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় তাঁকে করে তুলেছে নিয়তির মতো অনিবার্য।

যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও বিবেচনা করি, তা হলেও দেখবো, জাতির প্রতিটি সঙ্কটকালে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনিই সেই অতিপ্রজ কবি, যিনি তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে পূর্ণ করে তুলেছেন বাংলাদেশের কবিতার ভুবন, যা তাঁকে মানুষের কাছে করে তুলেছে অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের অসহযোগ কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর কবিতা কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে। ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি’র মতো কবিতা তো এখন বাংলাদেশের প্রাণস্পন্দনের সঙ্গে মিশে যাওয়া অবিনাশী পঙ্ক্তিমালায় পরিণত হয়েছে। বস্তুত আমাদের চেতনার স্তরে স্তরে সাজানো স্বপ্নের মতো পঙ্ক্তিসমূহ ‘নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়’, ‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/তোমাকে পাওয়ার জন্যে/আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়/আর কতবার দেখতে হবে খা-বদাহন?’, ‘স্বাধীনতা তুমি/রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান’ শামসুর রাহমানকে করে তুলেছে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রাণের কবি। আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের পরে তিনিই হয়ে উঠেছেন আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ।

লক্ষ করলে বিস্মিত হতে হবে, মিতবাক, শুদ্ধাচারী এবং নির্বিবাদী একজন কবি হিসেবে যিনি সমধিক পরিচিত, স্বৈরাচার কিংবা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনিই কত উচ্চকণ্ঠ এবং দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারেন, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতককাঁটা’, ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’, ‘আমি অনাহারী’, ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’, ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’ কিংবা ‘উদ্ভট উঠের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের নামকরণ এবং তার ভেতরকার কবিতাগুলোর উদ্ধত উচ্চারণ থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কবিতা লিখে মুক্তিযোদ্ধদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন, সেই কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বন্দী শিবির থেকে’ বাংলাদেশের কবিতার এক অক্ষয় সম্পদ হয়ে আছে।

এটা সত্য, জীবনের প্রয়োজনে কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁকে হয়তো কিছুটা আপস করতে হয়েছে, বেঁচে থাকার তাগিদে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু কিছু কাজ করতে হয়েছে; কিন্তু দুটি ব্যাপারে তিনি কখনও আপস করেননি। তার একটি হলো অসাম্প্রদায়িকতা, আর একটি মুক্তিযুদ্ধ। আজ যখন নৈতিকতার মুখরোচক বুলির আড়ালে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের প্রতিযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ নামধারীদের অনেকেই ‘স্খলিত বীর্যের’ ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেন, তখন শামসুর রাহমান জীবনের ঝুঁকি নিয়েও এমন সব পঙ্ক্তি রচনা করেেেছন, যা তাঁকে মৌলবাদীদের লক্ষবস্তুতে পরিণত করেছে। তিনি আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু নিজের আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসসঘাতকতা করেননি। সুদীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে অনন্ত ঝর্নাধারার মতো তিনি কবিতার অজস্র ফোয়ারা নির্মাণ করেছেন। কেউ কেউ শামসুর রাহমানের এই অতিপ্রজ রচনার সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর ফলে তাঁর কবিতা অনেকক্ষেত্রেই বিবৃতিসর্বস্ব এবং একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। এ-কথা যদি খানিকটা সত্যিও হয়, তবুও এটা নিশ্চয়ই বলা চলে, এই অতিপ্রজ রচনার মাধ্যমেই ৭৭ বছর বয়স পর্যন্ত শামসুর রাহমান এক জীবন্ত কিংবদন্তির মতো আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত