প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চিন্তাজাল

ড. এমদাদুল হক: বুদ্ধিজীবীরা প্রথমে একটা চিন্তাজাল তৈরি করে; এরপর তারা বদ্ধ হয় স্বনির্মিত চিন্তাজালে। সাধারণ মানুষকে কষ্ট করে চিন্তাজাল তৈরি করতে হয় না। মাতাপিতা ও সমাজ জন্মের আগেই একটি ক্ষুদ্র চিন্তাজাল তৈরি করে রাখে। বেশিরভাগ মানুষ সারাজীবন ঐ জালেই আটকে থাকে। কেউ-কেউ জালের মধ্যে থেকেই জালের সৌন্দর্য ও মহিমা ব্যাখ্যা করে, খাঁচার পাখির মতো। কেউ কেউ আপন চিন্তাজালের সীমাহীন প্রশংসায়, জালে-জালে বিবাদ লাগিয়ে দেয়। তাদের এক কথাÑ‘আমার জালই শ্রেষ্ঠ জাল। এটিই সর্বশেষ জাল। এটি মানুষের তৈরি জাল নয়Ñস্বয়ং ঈশ্বরের তৈরি জাল।  আগের জালগুলো ছেঁড়া তাই ঈশ্বর এই নতুন জাল প্রেরণ করেছেন। এটি আলোর তৈরি জাল। যারা এই জালকে সুতার তৈরি বলবে তারা নরকের কীট! এই জালে যারা ধরা না দেবে তাদের নাই কোনো পরিত্রাণ।

কেউ কেউ জালে ঝাপটিয়ে একটু অস্বস্তি বোধ করে, ভাবে যে জাল ছিঁড়ে বেড়িয়ে যাবে, কিন্তু পারে না। সমাজের তৈরি জাল, ধর্মের তৈরি জাল, ক্ষমতার তৈরি জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসা সহজ না। কিছুটা উদার জালজীবীরা বলে, ‘সব জালই ভালো’। সব জালকে ভালো না বললে জালব্যবসা চলবে কেমনে? নিরপেক্ষতার উদ্ভট ব্যাখ্যা দিল ক্ষমতার রাজনীতি। প্রথমে রাষ্ট্র বলেছিল, জালনিরপেক্ষতার অর্থ হলো রাষ্ট্র কোনো জালের পক্ষে থাকবে না। এখন ক্ষমতার রাজনীতি বলছে, জালনিরপেক্ষতার অর্থ হলো, রাষ্ট্র সব জালের পক্ষে। সব জালের রক্ষণাবেক্ষণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি মাছও যেন জালের বাইরে না থাকতে পারে। মুক্ত মাছ রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক! এরা যে কোনো সময় বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে, ফকির মজনু শাহর মতো। সবজালই চিন্তাজাল। চিন্তাই আবিষ্কার করে পুরান জালের নতুন ব্যাখ্যা। মানুষের চিন্তা নির্ভর করে সে কী প্রকার জালে বদ্ধ। কোন জালটি ভালো, কোন জালটি মন্দ তার বিচারও করে চিন্তাজালই। জাল সত্য নয় কিন্তু জালাবদ্ধ মানুষ জালকেই সত্য মনে করে। তাই সত্যের দেখা তারা পায় না। ক্ষুদ্র জালকে মুক্ত আকাশ বলে বিশ্বাস করা হলো জালবিশ্বাস।

চিন্তাজগতের নিদ্রা হলো জালে আটকে থাকা। নিদ্রা কে না ভালোবাসে? জাল ছিঁড়ে যদি কেউ বের হতে পারে তবে চিন্তার নিদ্রাভঙ্গ হয়। ঘটে যায় মহাজাগতিক ঘটনা। চিন্তা যুক্ত হয়ে যায় মহাজাগতিক স্পন্দনের সঙ্গে। চিন্তাজালে যে বদ্ধ থাকে তার চিন্তাজগতে কোনো উত্থান-পতন থাকে না; থাকে না পরিবর্তন ও গতি। ফলে সে ক্রিয়াশীলতা হারিয়ে ফেলে; সে যা বলে, যা করে সবই হয় প্রতিক্রিয়াশীল। ক্রিয়া থেকে বৃদ্ধি পায় সৃজনশীলতার, দেখা মেলে স্রষ্টার। আমাদের চিন্তাজালটি পৃথক। তাই তুমি-আমি পৃথক। তুমি এক জালে বদ্ধ, আমি অন্য জালে। আমি-তুমিতে যতো দ্বন্দ্ব আছে সব ঐ চিন্তাজালের দ্বন্দ্ব। জাতিতে-জাতিতে যতো সংঘর্ষ চলছে সব ঐ চিন্তাজালের সংঘর্ষ।  সব বিরোধিতাই চিন্তাবিরোধিতা। না আমার চিন্তা সত্য, না তোমার চিন্তা। চিন্তা চিন্তাই। মনুষ্যের একমাত্র সমস্যা হলো চিন্তাকে সত্য বিবেচনা করা। সর্ববিদ পীড়নের কারণ চিন্তার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করা। সর্ববিদ বিচ্ছিন্নতার কারণও এটাই। জালাবদ্ধ চিন্তা সংযোগ স্থাপনে অভেদ্য প্রতিবন্ধকতা উৎপন্ন করে। মূঢ় ও বদ্ধ চিন্তাভঙ্গির কারণে আমরা কারো সঙ্গে যুক্ত হতে পারি না। বিচ্ছিন্নতাবোধের অধ্যাস আমাদেরকে সংযোগচ্যূত করে রাখে। ফলে আমরা নিঃসঙ্গ হয়ে পীড়নযন্ত্রণা ভোগ করি। চিন্তা আমার। আমি চিন্তা নই। আমার ও আমির মাঝখানে চিন্তাজালের ছায়াময় জগৎ। সত্য এই জালেও নেই, ঐ জালেও নেই।

সত্যের আসন দুই জালের মাঝখানে। দুই জালের মাঝখানে থাকার জন্য প্রয়োজন পূর্ণ সাবধানতা। “অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের সঙ্গে আছেন”- কুরআনে বলা হয়েছে বহুবার। দুই জালের ফাঁকে চিন্তাজাল নেই। কি আছে? শূন্যতা। কেবল শূন্যতা। শূন্যতার এতই জ্যোতি যে, তা বহন করা কঠিন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সম্মেলন, মহাসম্মেলন, শান্তি সমাবেশ, হৈ চৈ, নাচানাচি সব কিছুই ঐ ফাঁক থেকে পালানোর উপলক্ষ্য। ধর্মের নামে যেখানে যেখানে যা কিছু হচ্ছে সবই ঐ ফাঁক থেকে পালানোর প্রয়াস। হায়রে জাল! চিন্তাজাল। দলিল জাল। জাল দলিল। ভেজালের ঝাল!

লেখক : সভাপতি, জীবনযোগ ফাউন্ডেশন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ