প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মরিশাসে ডাল রান্না

সোহেল অমিতাভ : দাস প্রথা বিলুপ্তির পর পৃথিবীর প্রথম কন্ট্রাকচুয়াল লেবার রপ্তানি হয় কোলকাতা বন্দর থেকে পোর্টলুইসে। পর্তুগিজদের ফেলে যাওয়া আখক্ষেত ফরাসিদের হাত বদল হয়ে ব্রিটিশদের জামানায়।

আমি মরিশাসে অবতরণ করি ডিভোর্সের দগদগে ঘা শুকাতে, পৃথিবী ছেড়ে পৃথিবীর মানচিত্রের বাইরে কোথাও দম নেবার মনবাসনায়।

এসেই চুপি চুপি জানতে পেলাম স্যাটানিক ভার্সেস এর সালমান রুশদী লুকিয়ে আছেন এখানেই। দেখা হলো ভারতীয় অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের সঙ্গেও। আমার নামের শেষে একটা ‘অমিতাভ’ থাকায় আমাকে বেশ ভক্তি শ্রদ্ধা করলেন যা তার প্রাইভেট সেক্রেটারির মনপুত হলো না। আমার সঙ্গে বিদায় নিয়েই সঞ্জয় বোম্বে গিয়ে টাডা আইনে গ্রেফতার হয়ে সোজা শ্রী ঘরে। সেই দুঃখে আমি এখনো মাঝে মাঝে বেদনাহত হই। সিঙ্গাপুরে এম্বেসেডর হোটেলের সবচেয়ে লম্বা চায়নিজ মেয়েটির (মনরঞ্জনি) গুডলাক চুম্বনের উষ্ণতা নিয়ে একটি দীর্ঘ আকাশ যাত্রা শেষে খুব ভোরে স্যুর সাগর রাম গোলাম বিমানবন্দরের দৈন্যদশায় হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকলো না। ট্যাক্সির জানালা দিয়ে শুধু আখক্ষেত আর আখক্ষেত দেখতে দেখতে তথাকথিত রাজধানী পোর্টল্যুইসে প্রবেশ করলাম। আমি ও সেদিনের সদ্য ছাপা দৈনিক পত্রিকার ডেলিভারি ভ্যান ছাড়া রাস্তায় তেমন কিছু চোখে পড়লো না। ড্রাইভারকে দিয়ে একটি পত্রিকার কপি সংগ্রহ করতে সফল হলাম। চোখ বুলোতেই আবার হতাশ! ইংরেজি অক্ষরের মত দেখতে হলেও ভাষাটা ফরাসি! এই বিদ্যে তো আমার পেটে নেই! শহরের কেন্দ্রে এক মলিনতর ছোটখাটো অখ্যাত হোটেলে কক্ষের সন্ধান পাওয়া গেল! মালকিন মহিলা একটা আদুরে বিড়াল কোলে চাপিয়ে আমাকে সম্ভাষণ জানিয়ে হাতে চাবি ধরিয়ে দিলো।

তিনতলা অবধি নিজের লাগেজটা নিজেই টেনে তুলতে জীবনের ভার বহনের অক্ষমতা এই প্রথম অনুধাবন করলাম। রুমে ঢুকেই চিৎপটাং। ঘুম ভেঙ্গেছিলো কখন, তা কি আজ আর মনে আছে! বেলকোনির দরজা ও নিজের চোখ খুলে যখন বাইরে তাকালাম! সে বর্ণনাও আজ লেখা বড়ই কঠিন। আশ্বস্ত হলাম পৃথিবীর বাইরে কোথাও সত্যিই আসতে পেরেছি! পৃথিবীর সকল কালিমা স্থূলতা ছেড়ে অনিশ্চিত এক সুখের ঠিকানায়!

কিন্তু পৃথিবী ছেড়ে এলেও পৃথিবীর ক্ষুধা তো আমাকে ছাড়েনি। প্রাতঃরাশ সহ রুম ভাড়া নিয়েছিলাম মনে হতেই বিড়াল বিবির সন্ধানে দোতলায় নেমে এলাম। বিড়ালের সংখ্যা এখানে একটিনা বেশ কয়েকটি। মালকিন অন্য আর একটি কোলে নিয়ে আদর করছেন। বাকিগুলো লেজ নেড়ে তার চারপাশে মিউ মিউ করছে। যাক বিড়ালের ভাষাটা এখানেও একই। ফ্রি ব্রেকফাস্টের সময় শেষ। এছাড়া কোনো খাবারের ব্যবস্থা নেই এ হোটেলে। ইশারা ইঙ্গিতে পর্দানশীন হোটেল মালিক বুঝিয়ে দিলো বাইরে বের হলে একটা ব্যবস্থা হতে পারে। তার আগে অবশ্য হোটেল ভাড়াটা চুকিয়ে দিতে হলো (যদি পালিয়ে যাই)। তারপরই মরিশাসে খাবার সন্ধানে বের হলাম। পৃথিবী থেকে নিয়ে আসা ক্ষুধাটাকে পকেটের পয়সায় নিবৃত করার সেই লোমহর্ষক অভিযান। কন্ট্রাকচ্যুয়াল লেবাররা যখন এখানে এসেছিলো তাদের কন্ট্রাকের মধ্যে সাপ্তাহিক বরাদ্দে যে সীমিত সামগ্রি দেয়া হতো তাতে কোন মশলাপাতি ছিলো না। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের মরিশিয়ানরা মসলা ছাড়া খাবারেই অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। স্বাদ-বর্ণ-গন্ধহীন সাধারণ মরিশিয়ানদের হেঁসেলের খবর খুবই নির্মম! আমি গোপালী পেটুক, খাঁটি বাঙাল তার উপর পুলিশের রেশন ভুক প্রজন্ম। ডাল আর ভাত হলেই রাজভোগের তৃপ্তি পাই। কিন্তু সেই ডাল রান্নাই এরা শেখেনি তখনো। খোসাসহ মশুর ডাল হাড়িভর্তি পানিতে সেদ্ধ করে খুবই উপাদেয় স্যুপ (লিন্ঠেন স্যুপ) হিসেবে এরা পান করে, আবার ভাতের সঙ্গে তরকারির ঝোল হিসেবেও খায়। যাতে মসলাতো দূরের কথা নুনের ছিটাও থাকে না। কোলকাতার ধাবায় অথবা দিল্লির হাইওয়েতে যারা পাঞ্জাবিদের তড়কা খেয়েছেন তারাতো অনেক ভাগ্যবান!

যাই হোক পোর্টল্যুইস ছেড়ে প্যারেবিয়ার বিচে রয়াল রোডের ধারে এক এপার্টমেন্ট হোটেলে আমার নিবাস স্থির হলো। তারপর ‘পোয়েট কিচেন’ থেকে ছড়িয়ে গেলো মরিশিয়ানদের ইতিহাসে ডাল রান্নার রেসিপি। সেই সুখ্যাতি খোদ প্যারিস পর্যন্ত পৌঁছেছিলো আমার তদানিন্তন পাণি প্রার্থিনী মিশেল কলের মাধ্যমে। এখন যারা মরিশাসে যাবেন, তাদের আর ডাল ভাতের সমস্যা হবে না; কিন্তু কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন না থাকায় আমি রয়ালিটি বঞ্চিত হয়েই থাকবো!  ফেসবুক থেকে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ