প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জামাল খাশোগি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা

কাকন রেজা : ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘৫২তে এমন গানই ছিল ভাষা আন্দোলনের মূল সুর। আর ভাষা আন্দোলনই ছিল আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ধাপ। আমাদের মুখের ভাষা ফিরে পাবার পর চলে প্রতিবাদের ভাষা রুদ্ধ করার প্রচেষ্টা। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার যেন কোনো প্রতিবাদ না হতে পারে, সেজন্যই চলতে থাকে দমন প্রক্রিয়া। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার পরও এ ভূখ-ের মানুষের কাছে ক্ষমতা থেকে যায় অধরা। স্বভাবতই মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, উঠে স্বাধীনতার আওয়াজ। খুব সংক্ষেপে এই হলো আমাদের স্বাধীনতার পেছনের কথা। আর এই পেছনের কথার মূল কথা হলো প্রতিবাদের ভাষা রুদ্ধ করার ক্রুর চেষ্টা। এমন চেষ্টার পরিণতি কখনো শুভ হয়নি, হয় না।

সর্বশেষ সৌদি আরবের কথাই বলি। বলি, স্বাধীন মত প্রকাশের পক্ষে কথা বলা সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার কথা। শুধুমাত্র মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য, সত্য লেখার জন্য তাকে জন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে। খাশোগির দোষ ছিলো তিনি আরব বিশ্বের মানুষের মত প্রকাশের পক্ষে কথা বলছিলেন, কলাম লিখছিলেন। খাশোগি’র সর্বশেষ কলামেও যা তার মৃত্যুর পর প্রকাশ করেছিলো ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, তাতেও তিনি বলেছিলেন মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা। বলেছিলেন, ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা’ বিষয়ে। তার সর্বশেষ কলাম ছিল, ‘আরব বিশ্বের অতি প্রয়োজনীয় হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা’। যেখানে তিনি তুলে এনেছিলেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে বিশ্ব র্যা কিংয়ের বিষয়টি। আরব বিশ্বে একটি মাত্র দেশ মত প্রকাশে স্বাধীন বলে স্বীকৃত এবং দেশটি হলো তিউনেশিয়া। আরব বিশ্বের পান্ডা দেশগুলো সেই ‘ফ্রিডম হাউজ’ প্রকাশিত র‌্যাংকিং তালিকায় ‘পরাধীন’ হিসেবে উল্লিখিত। মত প্রকাশে বাধার পরিণাম যে ভালো হয় না, খাশোগিকে হত্যার পর তা বুঝতে পারছে সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ গণমাধ্যমে দেখলাম খাশোগি হত্যার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে জার্মানি।

উন্নত বিশ্বের তালিকায় যেসব দেশ প্রথম দিকে, সেসব দেশের জীবনযাত্রার মান ঈর্ষণীয়, সেসব দেশে মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা বিদ্যমান। অনেকের ধারণা ধনী দেশ মানেই সর্বোন্নত দেশ। এই ধারণাটি একদমই ঠিক নয়। যেমন নয় শক্তিমান দেশের ক্ষেত্রেও। ২০১৮ তে সর্বোন্নত দেশের তালিকায় প্রথম দেশটি হলো নরওয়ে। দেশটি সবচেয়ে ধনী দেশ নয়, শক্তিমান রাষ্ট্রও নয়। তা সত্ত্বেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, উন্নত জীবনমান, সুসংগঠিত সমাজ ব্যবস্থা এবং শিক্ষার অভাবনীয় উন্নতির জন্য নরওয়ে সর্বোন্নত দেশের মর্যাদা পেয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এই দেশটিও অর্থনীতিতে কিংবা শক্তিতে প্রথম নয়। তারপরেও উন্নতির র‌্যাংকিংয়ে ধন ও শক্তির উপরে তাদের অবস্থান। আর এই মর্যাদায় অভিসিক্ত হবার পেছনে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ বিষয়টি অন্যতম। ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি তখনই স্বার্থক হয় যখন ‘গণ’ মানে সর্বসাধারণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্যই হলো বহুমতে। আর গণতান্ত্রিক দেশগুলোই থাকে সর্বোন্নত দেশের সারিতে। ‘ডিক্টেটরশিপ’ বা ‘অটোক্র্যাসি’ মানুষকে শান্তিতে রাখতে পারে না, সে যতই ধনী বা শক্তিমান দেশ হোক না কেনো।

আর গরীব বা স্বল্পোন্নত দেশগুলির জন্য ‘ডিক্টেটর’ বা ‘অটোক্র্যাসি’ হলো ‘মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’য়ের সামিল।  ‘অটোক্র্যাসি’ আক্রান্ত দেশগুলির সর্বসাধারণের অবস্থা হয় ভীত এবং লাজুক প্রেমিকার ‘বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’র মতন। মুখ ফুটলে অভিভাবকের বকুনি কিংবা পিটুনি, আর না ফুটলে বুকের ভেতর থাকা জমে থাকা কান্নার অসহ্য যন্ত্রণা।

জামাল খাশোগি’রা মানুষের বুকের ভেতরের এমন কান্নার কথাই তুলে আনতে চেয়েছিলেন। ‘অটোক্র্যাসি’ এই কান্না শুনতে চায় না, তারা শুনতে চায় স্তুতি-স্তব বন্দনা। আর বন্দনার জন্য প্রয়োজন স্তাবকের, জামাল খাশোগিদের নয়। লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ