প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. কামাল ও ঐক্য জোট

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু,স্টকহোম : ড. কামাল হোসেন একজন উচ্চশিক্ষত ও আন্তর্জাতিক সমমানের আইন বিশেষজ্ঞ। তাই হয়তো বঙ্গবন্ধু এ ধরনের একজন ব্যক্তিকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি তার এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। এই কারণে তার নামের পাশে এসে যোগ হয়েছে সংবিধান প্রণেতা টাইটেল। শুধু তাই নয় তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও সুষ্ঠভাবে পালন করেন। তাহলে বলা যায় ড. কামাল হোসেন নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনকে আওয়ামী লীগ মোহাম্মদপুর-মিরপুর এলাকা থেকে মনোয়ন প্রদান করে। এইসময় তার কাছে আসার সুযোগ হয়েছিল। আমি তখন মোহাম্মদপুর থানা ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ কামাল ভাইয়ের একনিষ্ঠ প্রিয় দুইজন বন্ধু বাদল ভাই সভাপতি ও বরকত ভাই ছিলেন সহ-সভাপতি। একই কমিটিতে ইকবাল ভাই (পরবর্তীতে মোহাম্মদপুরের কমিশনার) স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ড. কামাল হোসেনের নির্বাচনী প্রচার সভাগুলোতে আমাদের ব্যাপকভাবে কাজ করতে হয়েছে।

এই নির্বাচনী প্রচার অভিযান চালাতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি ড. কামাল হোসেনের পক্ষে বাংলা ভাষায় পরিষ্কারভাবে কথা বলা খুব একটা সহজ ছিল না। যেভাবে বাংলাদেশের নেতারা রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে থাকেন কামাল হোসেনের পক্ষে এভাবে ভাষণ দেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। কারণ তিনি বাংলাদেশের বাঙালি ছিলেন না। আজ এতো বৎসর পর এখনো যখন তার কণ্ঠ শুনি তখন মনে পরে সেই ১৯৭৩ সালের কথা। এক্ষেত্রে তিনি এখনো সেই একই স্থানে আছেন বলা যেতে পারে। তবে তিনি একজন সৎ ও শিক্ষিত রাজনীতিবিদ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যার পরবর্তীতে যে কয়জন নেতা আওয়ামী লীগের হাল ধরে রেখেছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ড. কামাল হোসেন। একসময় তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদেও প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের বর্তমান সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মতানৈক্য সৃষ্টি হলে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হলেও তিনি আজ পর্যন্ত কখনো জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী কোনো বক্তব্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেননি। তিনি সবসময় নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও আদর্শের পথিক হিসেবে আবদ্ধ রেখেছেন।

আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ডক্টর কামাল হোসেন আর কোনোদিন কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেননি। তার প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকা ও দলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যে রাজনৈতিক কারিশমা প্রয়োজন ড. কামাল হোসেনের মধ্যে তা নেই। তিনি যেভাবেই যাদের নিয়েই ঐক্য গঠন করেন না কেন নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতার অভাব তার মধ্যে বর্তমান। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই। থাকলে সংসদ আজ দুর্নীতিবাজ, তোষামোদকারী আর মাস্তানদের হাতে বন্দি হয়ে থাকতো না।

বঙ্গবন্ধুর প্রাণপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ একটানা দশ বৎসর এখন ক্ষমতায়। দেশে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল নেই বললেই চলে। সরকার বিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন ইস্যু থাকা সত্তে¡ও রাজপথে কোনো সংগ্রাম নেই। সংসদ চলছে একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। এই মুহূর্তে একটি শক্তিশালী সরকার বিরোধী ঐক্যজোটের প্রয়োজন। জনগণ চায় আগামী নির্বাচনে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চায় সব দলের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে একটি সুস্থ নির্বাচন। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

১৫ আগস্টের পরবর্তীতে পাকিস্তান ফেরত বাঙালি সেনা নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থীরা ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে জনগণকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ধ্বংস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চক্রান্ত করে। শুধু তাই নয় এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীরা ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পুনর্বাসন করে পুরস্কৃত পর্যন্ত করে। এভাবেই দীর্ঘদিন চলেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। ৯৬ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এর কিছুটা পরিবর্তন করলেও ২০০১ নির্বাচনে পরাজিত হলে ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতির পুনরায় আগমন ঘটে। গত ১০ বৎসর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে বাংলাদেশ চলছে এখন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পথে। অন্যদিকে সেনা বাহিনীতেও এখন আর পাকিস্তান ফেরত সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান নেই।

এই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিরোধী ঐক্যজোট গঠন করতে হলে নিম্নলিখিত আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়ে আসতে হবে। এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক জোট প্রতিষ্ঠিত হয়নি যারা পুরোপুরিভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বিশ্বাস করে একটা রাজনৈতিক ঐক্যজোট গঠন করতে পারেঅ রাজনৈতিক মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য এধরণের বিভক্ততা একটা বড় প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে।

১) মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী হতে হবে।

২) জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সম্মানজনক স্থানে রাখতে হবে।

৩) মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা থেকে সরে আসতে হবে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই তিন লক্ষ্য নিয়ে যদি কোনো সরকার বিরোধী ঐক্যজোট গঠন করা হয় তাহলে সম্ভব হবে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থান। সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের ঐক্যজোট এই পথের পথিক নয়। কারণ তিনি যাদের নিয়ে ঐক্যজোট গঠন করেছেন তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, বঙ্গবন্ধুকে সম্মানজনক স্থান ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার পক্ষে। সুতরাং এ ধরনের ঐক্যজোট দিয়ে তেমন কোনো কিছু না হওয়ার সম্ভবনাই বেশি। তাই হয়তো শুরুতেই তারা হয়ে পড়েছে বিভক্ত। এছাড়া ড. কামাল হোসেনের মতো একজন ব্যক্তি কী করে এ ধরনের লোকদের সাথে নিয়ে ঐক্যের ডাক দিলেন সে নিয়ে অনেকেরই আজ প্রশ্ন?

সময় ঘনিয়ে আসছে। নির্বাচনের আর বেশিদিন বাকি নেই। নিজেরা বিভক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সাথে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জাতি আবারো পাবে একটি দুর্বল সংসদ। যেখানে থাকবে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া আধিপত্য। ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, কাদের সিদ্দিকী, ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী সহ অন্যরা আশাকরি বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা ভাবনা করবেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত