প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচন নিয়ে এরশাদ কেন সংশয়ে?

বিভুরঞ্জন সরকার : সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করায় রাজনৈতিক মহলে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই কি এটা বাত কি বাত, নাকি এর কোনো বিশেষ মাজেজা আছে, তার তত্ত্ব-তালাশ শুরু হয়েছে। এরশাদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়েও তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর তিনি মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন। জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান খুবই গোলমেলে। জাপা সরকারেও আছে, বিরোধী দলেও আছে। দলের মালিকানাও দুই জনের। অর্ধেক মালিক এরশাদ, অর্ধেক মালিক তার স্ত্রী রওশন। সংসদে বিরোধী দলের নেতা রওশন। সংসদের বাইরের নেতা এরশাদ। সরকারে জাপার তিন জন মন্ত্রীও আছেন। গাছেরটাও খাচ্ছেন, তলারটাও কুড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে খারাপ নেই এরশাদ।

গত প্রায় পাঁচ বছরে এরশাদ বহুবার মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার কথা বললেও বাস্তবে তা হয়নি। তিনি নিজেও বিশেষ দূতের পদ ছাড়েননি। ২০ অক্টোবর, শনিবার এরশাদ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বিশাল’ জনসভা করেছেন। শোডাউন করেছেন। সারা দেশ থেকে লোকজন আনা হয়েছিল। কাকে শক্তি দেখালেন এরশাদ? সরকারকে, নাকি বিএনপিকে? কেউ কেউ বলছেন, সরকারকে শক্তি দেখানোর কিছু নেই এরশাদের। কারণ তিনি কার্যত সরকারের অংশ। তিনি শক্তি দেখিয়েছেন আসলে বিএনপিকে। বিএনপিও বোধহয় একটু আশাহত হয়েছে। এতো লোক জোটানোর সামর্থ্য জাপার আছে, এটা বিএনপির ভাবনার মধ্যে ছিল না। সরকারকে অজনপ্রিয় প্রমাণে ব্যস্ত বিএনপি ভাবতেও পারেনি সরকারের বি-টিম হয়েও কীভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারছে জাপা? তার মানে সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই বলে যে বক্তৃতা বিএনপি নেতারা করছেন সেটা ঠিক নয়।

হয়তো সে কারণেই বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, ‘বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি দিলে জাপার চেয়ে ২০ গুণ বেশি মানুষ হতো’। মওদুদ আহমেদ সম্ভবত অংকে বরাবরই পাকা। হিসাবে ভুল করেন না। কখন কোন দিকে থাকলে মুনাফা বা লাভ বেশি সেটা তিনি খুব ভালো বোঝেন। বঙ্গবন্ধু, জিয়া, এরশাদ, খালেদা সবারই খেদমত করার তৌফিক আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। কেবল বঞ্চিত হলেন শেখ হাসিনার বেলায়। শেখ হাসিনাই তাকে ‘খাদেম’ নিয়োগ করলেন না। মনে মনে রেগে আছেন মওদুদ শেখ হাসিনা তার ‘সার্ভিস’ না নেওয়ায়।

ব্যঙ্গ করে কেউ কেউ তার নাম দিয়েছেন মৌদুধ। দুধ মধু যেখানে, মওদুদ সেখানে। তো, এহেন মওদুদ সাহেব হিসাব কষেছেন যে বিএনপিকে জনসভা করতে দিলে জাপার চেয়ে ২০ গুণ বেশি লোক হবে। এটা কেন ২০ গুণ, বেশি কম নয় এ প্রশ্ন তাকে করার সুযোগ নেই। তবু বিএনপিকে জাপার চেয়ে ২০ গুণ বেশি জনপ্রিয় প্রমাণের চেষ্টার পুরস্কার হিসেবে ম্যাডামের নেকনজর তার দিকে পরবে কিনা বলা মুশকিল। তিনি ম্যাডামের ‘অবিশ্বস্ত’দের তালিকায় আছেন বলে শোনা যায়।

এরশাদ প্রসঙ্গেই ফেরা যাক। এই যে এতো টাকাপয়সা খরচ করে এরশাদ এতো বড় শোডাউন করলেন তার নীট রেজাল্ট কি? কি বার্তা দিলেন দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের? এরশাদ বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না’। নির্বাচন নিয়ে এই অনিশ্চয়তার ঢিলটি কি এরশাদ শুধু শুধু ছুঁড়লেন? কার বা কোন পক্ষের হয়ে তিনি এমন কথা বললেন? সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যখন হামেশাই বলছেন, নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই হবে, তখন সরকারের জুনিয়র পার্টনার বলছেন অন্য কথা।

নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে না হওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি? তিনি কি সরকারের ভেতরের কোনো ‘খাস বাত’ জানেন বলে এমন সংশয় প্রকাশ করলেন, নাকি অনেকেই বলছেন তাই তিনিও বললেন? বাজারে নানা ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। গুজব ছড়ানো, গুজবে কান দেওয়া কিংবা গুজবে ইন্ধন দেওয়া কখনও কোনো দায়িত্ববান মানুষের কাজ হতে পারে না।

এরশাদ একদিকে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘জাতীয় পার্টির সামনে সুদিন, আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত’- বলে মন্তব্য করছেন, অন্যদিকে একই মুখে যখন বলেন, ‘নির্বাচন কখন হবে জানি না’- তখন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়েন। মানুষকে এভাবে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি আর কতদিন চলবে?