প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কী করবে বঙ্গবীরের দল?

ইকবাল সিদ্দিকী : জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোট-মহাজোট গড়া ও ভাঙ্গার খেলা। এ খেলায় পিছিয়ে থাকতে রাজি নয় কেউ। ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং মহাজোট থাকলেও বিএনপি ২০ দলীয় জোটের পর এবার সক্ষম হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়তে।

এতদিন আওয়ামী লীগের দুই জোট থাকলেও, এখন বিএনপিও দুই জোট গড়ার সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে মহাজোটে থেকেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গঠন করেছেন সম্মিলিত জাতীয় জোট নামে আরেকটি পৃথক জোট। সিপিবি ও বাসদ দীর্ঘদিন যৌথ কর্মসূচি শেষে বাম গণতান্ত্রিক জোট নামে আরেক জোটে মিলিত হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা, আ স ম রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, যুক্তফ্রন্ট করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে শামিল হয়েছে।

নাম না জানা বেশ কয়েকটি দল নিয়ে জোট গঠন করে সাবেক বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আওয়ামী লীগের মহাজোটে ঠাঁই পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ কিছুদিন ধরে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে মামলা করে সরকারের নেক নজরে থাকার প্রচেষ্টায় তিনি বেশ আলোচিত-সমালোচিত।

ইসলামী দলগুলোও নানান নামে একাধিক জোটে সম্পৃক্ত হয়ে আরো বৃহত্তর কোনো জোটে শরিক হওয়ার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপির দুই জোটে থাকা নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই, কিন্ত আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলোর একাধিক জোট করা নিয়ে তাদের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকাও অবতারণা করে নানান প্রশ্নের।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমাদের দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ চেষ্টা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটাতে। এ ব্যাপারে সাফল্য পেতে আমরা নিরন্তরভাবে চেষ্টা করেছি ড. কামাল হোসেনের অনুরক্ত থাকতে। ১৯৯৯ সনের ২৪শে ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। সে সময়কার সরকারি দল আওয়ামী লীগের তীব্র প্রতিরোধ, রোষাণল, অত্যাচার, নিপীড়ন সত্ত্বেও আমরা আওয়ামী লীগ বিরোধী জোটে শরিক হই নি।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব থাকলেও, এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নতুন দল হিসেবে, নতুন মার্কা নিয়ে একটি আসনে জয়লাভ করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছি আমরা। জাতীয় সংসদে মানুষের দাবী-দাওয়া তুলে ধরে আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

চার দলীয় জোট সরকারের সময় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টা ও জাতীয় ঐক্যমঞ্চে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে দ্বি-দলীয় বৃত্তের বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছি। ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের নাম তখনও ১৪ দলে অন্তর্ভূক্ত ছিলো, তবুও জাতীয় ঐক্যমঞ্চ নিয়ে তিনি ভিন্ন শক্তির বদলে আওয়ামী লীগের দিকেই ঝুঁকে পড়েন আবার। এ কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই ২০০৬ সনের বাতিল হওয়া নির্বাচন বা ২০০৮ সনের জাতীয় নির্বাচনেও এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি আমরা।

২০০১ সনের জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় বিএনপি এতটাই শঙ্কিত হয়ে পড়ে যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে তার দল ও সংসার দুটোই বিভক্ত করে ছাড়ে। তাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ থেকে আমাদের দলও রক্ষা পায় নি। রাজনৈতিকভাবে তারা এতটাই দেউলিয়া হয়ে পড়ে যে আমাদের ছোট্ট এই দলটিকে তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট ফজলুর রহমানকে নিয়ে পল্টনের জনসভায় ৪দলীয় জোটকে ৫দলীয় জোটে পরিণত করার ঘোষণা দেন স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়া।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত দলগুলো ছাড়া অন্য সকল দল বর্জন করে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯ দলের মধ্যে ৩২টি দলই অংশগ্রহণ করেনি এ নির্বাচনে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট এ নির্বাচন প্রতিহত করার আহ্বান জানায়। খালেদা জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়েই হোক বা নিজেদের দলীয় সিদ্ধান্তেই হোক সে নির্বাচন বর্জন করেন ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো নেতারাও। একই সঙ্গে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বাধীন সিপিবি, খালেকুজ্জামানের বাসদসহ বিভিন্ন বামপন্থী দল। চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য ডানপন্থি দলগুলোও যোগ দেয় নির্বাচন বর্জনের সরকারবিরোধী কাফেলায়।

নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো একই ঘরানার না হলেও, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়। দেশের ইতিহাসে তো বটেই গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসেও এটা ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। কিন্তু সরকারবিরোধী এ নজিরবিহীন ঐক্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী প্রতিটি দলের প্রতি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা নিদেনপক্ষে লিখিতভাবে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানানো এবং ভবিষ্যতে সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের সম্মিলিত আন্দোলন-সংগ্রাম করার আহ্বান জানিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ খালেদা জিয়া হাতছাড়া করেন। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও অন্যান্য বিরোধীদলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, বিএনপি তার নেতৃত্বাধীন জোট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে দলগুলো ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করার উদ্যোগ তো দূরের কথা আলোচনা করার ন্যূনতম সৌজন্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাও উপলদ্ধি করেনি তারা। কোনো এক বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়ার মুখোমুখি হয়ে সরাসরি একথাগুলো বলার সুযোগ আমার হয়েছিল।

একটি ঘটনার বর্ণনা দিলে নির্বাচনী জোট ও জোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস সর্ম্পকে সম্যক ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

গত ৩০শে জুন অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইলের বাসাইল পৌরসভা নির্বাচন বিএনপি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে নতুন করে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। প্রতীক বরাদ্দ হয়ে যাওয়ার পর সরকার বিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার যুক্তি দেখিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাদের প্রার্থীর পরিবর্তে গামছা মার্কায় দলীয় প্রার্থী রাহাত হাসান টিপুকে সমর্থন করেন। জেলা বিএনপির সভাপতি-সেক্রেটারি সশরীরে নির্বাচনী এলাকায় গামছা মার্কার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করলেও, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্য করে তাদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেন। শোনা যায় বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা তাদের এ অনড় অবস্থানের পক্ষে কলকাঠি নাড়েন। অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে বাসাইল পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়। অথচ ভোটের ফল দেখার পর স্পষ্ট হয়ে যায় ধানের শীষ ও গামছার ভোট একত্রিত হলে নৌকার করুণ পরাজয় ঘটতো। এই পৌরসভা নির্বাচনের পর, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারা মনে করে, ঐক্যের স্বার্থে যে দল তাদের সভাপতির নির্বাচনী এলাকায় পৌরসভার মেয়র পদেও ছাড় দেওয়ার মতো মানসিকতা পোষণ করে না, সে ধরনের দলের সঙ্গে আর যাই হোক কোনো ঐক্য হতে পারে না। যে কারণে সরকারের নানা অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে বিক্ষুব্ধ হলেও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী দলের বর্ধিত সভায় বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রবল বিরোধীতা করেন।

যুক্তফ্রন্ট গঠনে আমাদের দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও ড. কামাল হোসেনকে বাইরে রেখে ঐক্যের ব্যাপারে আমরা অনাগ্রহী ছিলাম। এক পর্যায়ে বিকল্পধারার যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কাদের সিদ্দিকী যুক্তফ্রন্টের কেউ নন’।

নিয়তির নির্মম পরিহাস ক’দিন যেতে না যেতেই মাহী চৌধুরীরাই বাদ পড়েছেন কাঙ্খিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে। আমরা বারবার চাচ্ছিলাম, বি চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের যৌথ নেতৃত্বে রাজনৈতিক নতুন শক্তির আত্মপ্রকাশ। কিন্তু এবারও পরম শ্রদ্ধেয় ড. কামাল হোসেন শুরুতেই বিএনপি’র দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।

একদিকে বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রবল আপত্তি অন্যদিকে দল গঠন করার পর থেকে নানা সময়ে আওয়ামী লীগের নিপীড়ন, নির্যাতনের কথাও ভুলে যাওয়া খুব সহজ নয়। সব মিলিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট-ভোট নিয়ে সংশয়ের দোলাচলে আবারও এককভাবে নির্বাচন নাকি কোনো জোটে সামিল হওয়া এটা নিয়ে সংশয়ের দোলাচলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতাকর্মীরা।

লেখক: যুগ্ম-সম্পাদক, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ