প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রসমালাই বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়াতে চান ইঞ্জিনিয়ার রবিউল

বিবার্তা২৪ :  তাঁকে প্রায়ই দেখা যায় রাজধানীর মিরপুরের ফুটপাথে – কখনো শ্যামলী, কখনো ধানমন্ডি, পান্থপথ, আবার কখনোবা মতিঝিলে। রাজপথে ঘুরে ঘুরে তিনি ফেরি করেন খাঁটি মধু, ঘি, কালোজিরার তেল, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাই, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, মুক্তাগাছার মন্ডা। তাঁর স্বপ্ন দেশের মানুষকে ভেজালমুক্ত খাবার পৌঁছে দেয়া এবং দেশ থেকে বেকারত্ব দূর করা।

বলছিলাম বিএসসি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম চৌধুরীর কথা।

পড়াশোনা শেষ করে দেশ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে নিজে কিছু করার কথা ভাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু করেন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি।

শুধু অফলাইনে বেশি বিক্রি না হওয়াতে এক সময় অনলাইনে বিক্রির পরিকল্পনা করেন। তৈরি করেন অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সহজসরলডটকম’। রাজপথে ঘুরে ঘুরে বিক্রির পাশাপাশি তিনি অনলাইনে অর্ডার নিয়ে এসব খাবার ক্রেতাদের কাছে সরবাহ করতে শুরু করেন।

ব্যবসা শুরুর সময়টা তার জন্য অনেক কঠিন ছিল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পথচারীদের কাছ থেকে তাকে শুনতে হয়েছে নানান ধরনের অপমানজনক কথা। তারপরেও থেমে থাকেননি তিনি। অদম্য ইচ্ছেশক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে জন্ম রবিউল ইসলাম চৌধুরীর। বর্তমানে থাকেন রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায়। দুই ভাই-দুই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। বাবা খোরশেদ আলম চৌধুরী একজন কৃষক আর মা জাহানারা বেগম গৃহিণী।

শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কুমিল্লাতেই। সেখানেই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর ডিপ্লোমা শেষ করে ঢাকায় আসেন। ভর্তি হন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ঢাকায় আসার পর যে খাবারই কিনে খাচ্ছিলেন তিনি, কোনো কিছুতেই স্বাদ পাচ্ছিলেন না। ভেজাল খাবারে ভরপুর ঢাকা শহরের কোনো খাবারই তাঁকে তৃপ্ত করতে পারছিল না। তখন থেকেই ভাবতে থাকেন দেশের মানুষকে কীভাবে ভেজালমুক্ত খাবার পৌঁছে দেয়া যায়।

এরই মাঝে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স শেষ করেন। নিজের স্বপ্ন পূরণে চাকরির পেছনে না ঘুরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসা করার। কিন্তু মাথায় পরিকল্পনা থাকলেও হাতে ব্যবসা শুরু করার মতো টাকা ছিল না তাঁর। তখন এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে সহজসরলডটকম নামের অনলাইন প্লাটফর্মে মিষ্টি বিক্রি শুরু করেন। শুরুতে নিজের এলাকা কুমিল্লার রসমালাই ও টাঙ্গাইলের চমচম নিয়েই রাজপথে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন।

রাজপথে ঘুরে ঘুরে মিষ্টি বিক্রি করতে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে রবিউলের। তিনি বলেন, আমি মিরপুর, শ্যামলী, শুক্রাবাদ, কলাবাগান, ধানমন্ডি ১৫, সোবহানবাগ, গ্রীনরোড, পান্থপথ ও মতিঝিলসহ শহরের অনেক ব্যস্ততম পয়েন্টে সকাল ৯ টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত অনবরত রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে একটা প্লাস্টিকের টুল আর টেবিল নিয়ে দিনের পর দিন কুমিল্লার রসমালাই ও টাঙ্গাইলের চমচম বিক্রি করেছি। আমার পর্যাপ্ত টাকা ছিল না তাই আমি নিজেই মার্কেটিং করেছি। ২০ টাকা পিছ চমচম বিক্রি করেছি। সেই সঙ্গে লিফলেট/ভিজিটিং কার্ড দিয়েছি, যাতে পরবর্তীতে অর্ডার করেন ক্রেতারা।

প্রথম ছয় মাস কেউই আমার পাশে ছিল না। অনেকটা একা একা কাজ করতে হয়েছে। একজন শিক্ষিত বেকার যুবক এভাবে ফেরি করে মিষ্টি বিক্রি করছে দেখে কেউ হাসতো, কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করতো, কেউ শিক্ষাকে অপমান করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করতো, কেউ আবার বলতো এসবই ভণ্ডামি। এমনকি কেউ বলেছে, লেখাপড়া করার কি দরকার ছিল যদি রাস্তায় মিষ্টিই বিক্রি করবি। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নাকি আমি চাকরিতে নিরুৎসাহিত করছি। এমনই নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে।

তবে এসব সমালোচনাকে রবিউল একদমই পাত্তাই দেননি। তার ভাষায়, ধরেন আপনি ঢাকা শহরে নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে একটা বৃদ্ধাশ্রম করবেন। তখন মানুষ আপনাকে নিয়ে কি কি মন্তব্য করবে। কেউ বলবে, আপনি অনেক মহান কাজ করছেন, কেউ বলবে অনেক দামি সম্পত্তি বিক্রি করে মানবসেবা আজাইরা কাম, কেউ বলবে পুরান পাগলে ভাত পায় না নতুন পাগলের আমদানি, আবার কেউ বলবে সে এই সমাজকে নষ্ট করার জন্যই বৃদ্ধাশ্রম করেছে- সে চায় পরিবার থেকে বের করে ইউরোপ-আমেরিকার মতো সমাজ বানাতে। আরও কত মানুষ কত মন্তব্য করবেন আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনি যতই মানবসেবা বলে কাজটা শুরু করেন না কেন, সমালোচনা আপনাকেই শুনতে হবেই। তাই বলে আপনি পিছিয়ে যাবেন? না, মোটেও নয়।

ছয় মাস চালিয়ে যাওয়ার পরও ব্যবসায় তেমন লাভের মুখ না দেখায় মিষ্টি বিক্রি বাদ দিয়ে শুরু করেন কাপড় বিক্রির ব্যবসা। রাজপথে ঘুরে ঘুরে ১০০ টাকা দামের টি-শার্ট বিক্রি করেন এক মাস। এতে ভালোই লাভ হয়। কিন্তু বেশি লাভ হলেও তাতে তাঁর মন বসেনি। এরপর আবার তিনি ভেজালমুক্ত খাবার সরবাহ করার ব্যবসায় ফিরে যান, শুরু করে মিষ্টি বিক্রি। এবার বিভিন্ন মানুষ এতে সাড়া দেয়। অনলাইনেও ভালোই অর্ডার পেতে শুরু করেন। নির্ভেজাল খাবার সরবরাহের সংগ্রাম আবার নতুন করে শুরু হয়।

রবিউল বলেন, কত দিন চলে গেছে দুপুরের খাবার একটা বনরুটি,২ টা সিঙ্গারা আর ৩/৪ গ্লাস পানি দিয়ে। হোটেলে খেলেও সবচেয়ে কমদামি হোটেলে ৩০/৩৫ টাকা দিয়ে খেয়েছি। কারণ একটাই চিন্তা ছিল আমার – ঘুরে দাঁড়াতেই হবে, পিছিয়ে গেলে চলবে না।

বেকারদের উদ্দেশে রবিউল বলেন, আমরা বেকার থাকি কেন, আসলে আমাদের ইগো বেশি। আমি ছোট চাকরি করলে মানুষ কি বলবে, অল্প বেতনের চাকরি করলে মানুষ কি ভাববে ইত্যাদি। ভাই রে চাকরিটা ছোট হলে ক্ষতিটা কোথায়? আরে লজ্জাটা তো তখনিই হয় এত এত পড়ালেখা করেও অধমের মত বেকার পড়ে থাকেন। ভালো একটা চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত, ছোট একটা চাকরি করুন না, লজ্জা কিসের? মানুষ কটু কথা বলবেই নিন্দা করে চলবেই। তাই বলে দমে থাকা বা নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার কোনো অর্থ হয় না। এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে জীবনে। জীবনে কোনো কাজকে ছোট মনে করা যাবে না। জীবনে অনেক ছোট ছোট জিনিস আমাদের অনেক সময় বড় করে তোলে। জীবনে ছোট বা বড় বলে কো্নো কথা না,বড় কথা হল স্বপ্ন। স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে।

রবিউল স্বপ্ন দেখেন তাঁর উদ্যোগ সহজসরলডটকম একদিন অনেক বড় ব্র্যান্ড হবে। তাঁর কম্পানিতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এই কাজের মাধ্যমে বেকার তরুণদের তিনি উৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন যেন কেউ বেকার না থেকে কিছু একটা করেন।

রবিউল বলেন, বর্তমানে কুমিল্লার মাতৃভান্ডারের রসমালাই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, বগুড়ার দই, মেহেরপুরের রসকদম, মুক্তাগাছার মন্ডা, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, খাঁটি ঘি, মধু ও কালোজিরার তেল সরবাহ করছি। অনলাইনে অর্ডার করা যায় এসব খাবার। এসব খাবার বিক্রি করে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করছি।

বাংলাদেশ একদিন ‘নির্ভেজাল খাদ্য ও বেকারমুক্ত’ দেশে পরিণত হবে এমনটাই আশা রবিউলের। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সব জেলাতে একটি হলেও শাখা করার পরিকল্পনা রয়েছে সহজসরলডটকম-এর।

তিনি বলেন, ওসব শাখা থেকে সারাদেশের মানুষের জন্য নির্ভেজাল খাবার সরবরাহ করবো। এভাবে খাটি দুধ, বিশুদ্ধ পানি, মৌসুমি ফল, ফরমালিনমুক্ত সবজি, ফরমালিনমুক্ত মাছ, মিষ্টি, মধু, কালজিরার তেল, ঘিসহ সকল খাবার নিয়ে কাজ করব।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ