প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইনসেপ্টা পপুলারসহ ৭ কোম্পানির একটি ওষুধ প্রত্যাহারের নির্দেশ

বণিক বার্তা : ওষুধ তৈরির কাঁচামালের বিপজ্জনক উৎস হয়ে উঠছে চীন। সম্প্রতি চীনের তিনটি কোম্পানির বহুবিক্রীত কাঁচামালে ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাব্য এজেন্ট শনাক্ত হওয়ায় অন্তত ২৩টি দেশে অসংখ্য ওষুধ বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন কাঁচামাল উৎপাদনকারী এ তিনটি চীনা কোম্পানি থেকে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) কিনছে দেশের অনেক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, চীনের ঝেজিয়াং হুয়াহাই, ঝুয়াই রুন্ডু ও ঝেজিয়াং তিয়ানয়ু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের তৈরি এপিআই ভালসারটানে এন-নাইট্রোসোডাইমেথালেমিন (এনডিএমএ) শনাক্ত হয়েছে। এনডিএমএ এমন এক উপকরণ, যা থেকে ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। নিম্নমানের কাঁচামাল উৎপাদন করায় যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইউএস-এফডিএ) গত চার বছরে ২০টি কোম্পানিকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশের বেশির ভাগ ওষুধ কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করছে।

১৪ অক্টোবর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দুটি অ্যালার্ট নোটিসে দেশের ছয়টি কোম্পানির প্রস্তুতকৃত বেশকিছু প্রচলিত ওষুধ সাতদিনের মধ্যে বাজার থেকে উঠিয়ে নিতে বলা হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত এসব নোটিসে মেসার্স ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের অ্যামলোসারটান ৫/৮০ ট্যাবলেটের ১৪টি ব্যাচের ওষুধ, মেসার্স একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের ভালটিন ৮০ ও ১৬০ মিলিগ্রাম ও কো-ভালটিন ৫/৮০ ট্যাবলেটের সব ব্যাচ, মেসার্স পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের অ্যামলোভাস ভিএস ৫/৮০, ৫/১৬০ ও ১০/১৬০ ট্যাবলেটের ৮৪টি ব্যাচের ওষুধ, ভালভাস এইচসিটি ১০/১৬০/২৫ ট্যাবলেটের একটি ব্যাচ ও ভালভাস এইচসিটি ১০/১৬০/১২.৫ ট্যাবলেটের একটি ব্যাচ, মেসার্স ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের এভি-৫, এভি-১০, এভি-৫/৮০ ও কারডিভাল ট্যাবলেটের মোট ৩৮টি ব্যাচ, রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ভালডিপিন এফসি ৮০ মিলিগ্রাম, ভালজাইড এফসি ১৬০+১২.৫ মিগ্রা ভালজাইড এফসি ৮০+১২.৫ মিগ্রা ও ভালডিপিন এফসি ১৬০ মিগ্রা ট্যাবলেটের মোট ২৪টি ব্যাচ এবং হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ডিসিস, ডিসিস প্লাস ও কো-ডিসিস ট্যাবলেটের ১৯৬টি ব্যাচ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়। এর আগে ২৪ জুলাই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক চিঠিতে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ক্যামোভাল ৫/৩২০, ১০/৩২০, ৫/৮০ ও ১০/৮০ ট্যাবলেট, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের অ্যামলোভাস ট্যাবলেট ও কনকর্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের ভালোসান ৮০ ট্যাবলেট বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে এসব ওষুধ রোগীকে প্রেসক্রাইব না করা ও ব্যবহারে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়।

সূত্র জানায়, প্রত্যাহারের আদেশপ্রাপ্ত ওষুধগুলো হাইপারটেনশন ও উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে দেয়া হয়। এছাড়া সদ্য হার্ট ফেইলিউর অথবা হার্ট অ্যাটাকের শিকার রোগীদের ক্ষেত্রেও ওষুধগুলো প্রয়োগ করা হয়।

জানা গেছে, হাইপারটেনশন নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর এপিআই ভালসারটান। তবে উপাদানটি প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকায় সম্প্রতি চীনের ঝেজিয়াং হুয়াহাই ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রস্তুতকৃত ভালসারটান এপিআইতে এনডিএমএ উপাদানটি ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। এজন্য সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে চীনা কোম্পানিটির এপিআইতে প্রস্তুতকৃত ওষুধগুলো বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দেয়। এর আগে আরো দুটি চীনা কোম্পানি ঝেজিয়াং তিয়ানয়ু ও ঝুয়াই রুন্ডু ফার্মাসিউটিক্যালসের কাঁচামালে ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাব্য উপকরণের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ওষুধ বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়ার আদেশ দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ এপিআই সরবরাহের জন্য চিহ্নিত কোম্পানিগুলো থেকে ভালসারটান আমদানি করেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, মেসার্স ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, মেসার্স রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

জানতে চাইলে দি একমি ল্যাবরেটরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান সিনহা বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে যে চিঠি দিয়েছে, সে ব্যাপারে আজ অফিস সময়ে ফোন করা হলে জানানো যাবে। পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের মোবাইলে ফোন দেয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (অপারেশন) ডা. এমএ মালেক চৌধুরীর মোবাইলে অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে আগামী সাতদিনের মধ্যে উপরোল্লিখিত ওষুধগুলো আপনাদের আওতাধীন এলাকার ফার্মেসিতে পাওয়া গেলে তা সিলগালা করে ফার্মেসিতে রেখে পরিমাণ উল্লেখপূর্বক সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল বা প্রতিনিধিকে সিলগালাকৃত ওষুধগুলো সংশ্লিষ্ট ফার্মেসি থেকে সংগ্রহ করার জন্য নির্দেশ প্রদান এবং প্রধান কার্যালয়ে ওষুধের তথ্যাদিসহ রিপোর্ট পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হলো।

জানা গেছে, ভালসারটান ট্যাবলেটের কাঁচামালে ক্যান্সারের সম্ভাব্য উপকরণ শনাক্ত হওয়ায় রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাশাপাশি চিকিৎসকরাও বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবু আজহার বলেন, হাইপারটেনশন রোগীদের জন্য ভালসারটান একটি জরুরি ও অত্যন্ত কার্যকরী একটি ওষুধ। বাজারে যেসব ওষুধ রয়েছে, তা দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকদের বিভ্রান্তি ও রোগীদের আতঙ্ক থেকে মুক্ত করতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চীনের ঝেজিয়াং হুয়াহাই কোম্পানি থেকে ১ হাজার ১০০ কেজি কাঁচামাল আমদানি করেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ওইসব কাঁচামাল থেকে ওষুধ তৈরির পর ৪৩ কেজি ৭৮৭ গ্রাম কাঁচামাল কোম্পানির গুদামে মজুদ রয়েছে।

ঔষধ প্রশাসন সূত্রে আরো জানা গেছে, পপুলার ফার্মা গত বছরের ৯ জুলাই চীনের ঝেজিয়াং হুয়াহাই কোম্পানি থেকে ২৫০ কেজি ভালসারটান আমদানি করেছে। এছাড়া ঝেজিয়াং তিয়ানয়ু ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে ১ হাজার ২০০ কেজি ভালসারটান আমদানি করেছে।

জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) রুহুল আমিন বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চীনের ঝেজিয়াং হুয়াহাই, ঝেজিয়াং তিয়ানইউ ও ঝুহাই রুন্ডু কোম্পানির তৈরি কাঁচামালে কার্সিনোজেনিক ইমপিউরিটি শনাক্ত হয়েছে। ওইসব উৎস থেকে যেসব কোম্পানির কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে তাদের ওষুধ ও মজুদকৃত কাঁচামাল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবজালুর রহমানকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ভালসারটান ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন। ওই ওষুধের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যেন অন্য কোনো ওষুধে ব্যবহার না করা হয় সেদিকে সতর্ক থাকার জন্য ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানান।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত