প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লাশের মিছিল থামবে কবে

সমকাল : সড়কে চলার অনুমতি নেই শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নছিমন, ভটিভটি ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের। শুধু চলাচল বন্ধ করা নয়; এসব যানবাহনের উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদ। এত কড়াকড়ির মধ্যেও এসব অবৈধ যান সড়কে চলছে। গত শুক্রবার রাজবাড়ীতে ট্রেনের ধাক্কায় নছিমনের পাঁচজন যাত্রী নিহত হন। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার জন্য কত না আয়োজন করা হচ্ছে! তবে রাস্তায় তার সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পর্যন্ত উপেক্ষিত হচ্ছে। এর পরও আশার কথা শোনা যাচ্ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সব কারণই রয়েছে সড়কে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তদারকির পরও রাস্তায় আগের মতোই নৈরাজ্য রয়ে গেছে। মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধ হয়নি। অতিরিক্ত পণ্য বহন এখনও চলছে। ঢাকার সড়কে গাড়ি, যাত্রী, পথচারী; কেউই আইন মানছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়; মালিক-শ্রমিক নেতাদের কথায় চলছে পরিবহন খাত।

সড়কে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেই আজ সোমবার পালিত হবে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। গত বছর মন্ত্রিসভা ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে আজ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে। সকালে সংসদ ভবন এলাকায় র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিআরটিএ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০১৭ সালে সড়কে মৃত্যু হয়েছে সাত হাজার ৩৯৭ জনের। সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা তিন হাজারেরও কম। পুলিশের হিসাবে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৫৩ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। ২০১৪ সালে করা সরকারের কর্মপরিকল্পনায় দুর্ঘটনার জন্য ৯টি কারণ চিহ্নিত করা হয়। ২০২৪ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা অর্ধেক কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু বেসরকারি হিসাব বলছে, তিন বছরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০১৭ সালে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আগের বছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেড়েছে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ক্ষতি হয় ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেছেন, সড়কে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সড়ক নিরাপদ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালক, মালিক, শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী- সবার মধ্যে আইন মেনে চলার মনোভাব সৃষ্টি না হলে শুধু মামলা-জরিমানায় পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে কিছুই হবে না। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউিটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন  বলেন, দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু নির্দেশনা ও অভিযান চালিয়ে ফল হবে না।

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, সরকার ২২টি জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এগুলো এখনও চলছে। কারণ যাত্রীদের কাছে বিকল্প নেই। বিকল্প হিসেবে লেগুনা চালু করা হয়েছিল। দেখা গেল, লেগুনার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই তড়িঘড়ি করে লেগুনা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। লেগুনা চালুর আগেই গবেষণা করে দেখা উচিত ছিল, তা মহাসড়কে চলার উপযোগী কি-না, যাত্রীদের জন্য নিরাপদ কি-না।

গত কয়েক দিনে রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী মহাসড়কগুলোতে সরেজমিন দেখা যায়, নির্দেশনা সবই কাগুজে। গত আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরুর আগে যে পরিস্থিতি ছিল, তা-ই রয়ে গেছে। উন্নতি বলতে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট পরার হার বেড়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, মহাসড়কে এখনও অবৈধ ও নিষিদ্ধ যান চলছে। ঢাকার রাস্তায় ভাঙাচোরা, ফিটনেসবিহীন বাস আগেরই মতোই চলছে। চুক্তিতে বাস চলাচল বন্ধ হয়নি। বাসে বাসে রেষারেষি, বিপজ্জনক ওভারটেকিংও বন্ধ হয়নি। যেখানে সেখানে পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ হয়নি। মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ হয়নি। চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ হয়নি। ঢাকার ব্যস্ত সড়কে যেখানে-সেখানে পারাপার আগের মতোই চলছে।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৪৭ শতাংশই পথচারী। আগের বছরে নিহতদের ৪০ শতাংশ ছিলেন পথচারী। ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ  বলেন, ঢাকায় সড়ক পারাপার উপযোগী ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে ৭২টি। বেশিরভাগই ব্যবহূত হয় না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ওভারব্রিজ ব্যবহার বেড়েছিল। আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর ব্যবহারও বন্ধ হয়েছে।

আন্দোলনের পর সড়কে আইন মানতে কড়াকড়ি করেছিল পুলিশ। প্রথমে ১০ দিনের ট্রাফিক সপ্তাহের পর ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাফিক সচেতনতা মাস পালন করা হয়। সচেতনতা মাসে ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনায় সেপ্টেম্বর মাসে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬০০টি মামলা করা হয়। এর পর সড়কে আইন প্রয়োগে পুরনো শিথিলতা দেখা দিয়েছে। ফিরে এসেছে পুরনো নৈরাজ্যও।

গতকাল রোববার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজারে দেখা যায়, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলছে বিনা বাধাতেই। ইট ও মাটি পরিবহন করা হচ্ছে ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়িতে। ভটভটিতে মালপত্র পরিবহন করা হচ্ছে। গত শুক্রবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে একই চিত্র দেখা যায়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জ অংশে একই অবস্থা দেখা যায়।

এসব যান বন্ধে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। উচ্চ আদালতের আদেশও রয়েছে। নৈরাজ্য বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১৭ দফা সুপারিশ করে। সেগুলোও বাস্তবায়িত হয়নি। গত জুনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পাঁচ দফা নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হয়নি। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যেখানে বাস্তবায়িত হয় না, সেখানে আর কে নির্দেশ দিলে হবে! আর কে বললে সড়ক থেকে প্রাণহানির কারণগুলো অপসারিত হবে?

রাজধানীতে ২৭৯টি রুটে ২৪৬টি কোম্পানির বাস চলে। রুট জটিলতা ও কোম্পানিগুলোর অব্যবস্থাপনাকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে মনে করেন ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এসএম সালেহ উদ্দিন। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ঢাকায় ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ পদ্ধতি চালুর সুপারিশ ছিল। ১৪ বছরেও তা হয়নি।

‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ পদ্ধতি বাস্তবায়নে সম্প্রতি সরকার দায়িত্ব দিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে। এ কমিটির সদস্য এসএম সালেহ উদ্দিন বলেন, এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। বাস রুট রেশনালাইজেশন ব্যবস্থা চালু না করা পর্যন্ত রাজধানীর সড়ক নিরাপদ হবে না। বাসে বাসে রেষারেষি, বিপজ্জনক ওভারটেকিংও বন্ধ হবে না।

গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, কলেজগেট, মিরপুর এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, অধিকাংশ বাস চলাচলের সময় দরজা খোলা রাখছে। অধিকাংশ বাস লক্কড়-ঝক্কড়, কিন্তু সড়কে দাপিয়ে চলছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ঢাকার ৭৩ শতাংশ বাস ফিটনেস পাওয়ার যোগ্য নয়। দূরপাল্লার ৩৩ শতাংশ বাসের ফিটনেস পাওয়ার মতো উপযোগিতা নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশ যাত্রী ওঠানামায় ১৩০টি স্থান নির্ধারণ করে দিলেও যেখানে সেখানে বাস থামছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাসে চালকের লাইসেন্স ও মোবাইল নম্বর দৃশ্যমান স্থানে লাগানো হয়নি। চালু হয়নি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল।

এ অবস্থার জন্য মালিক-শ্রমিক নেতাদের অদৃশ্য শক্তিকে দায়ী করেছেন পরিবহন খাত সংশ্নিষ্টরা। পরিবহন খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতা একজন মন্ত্রী। মালিক সংগঠনের সভাপতি একজন প্রতিমন্ত্রী। ঢাকায় অন্তত সাতজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য পরিবহন ব্যবসায়ী। ২৪৬টি বাস কোম্পানির অধিকাংশের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, শুধু সাধারণ মানুষ নন; দুর্ঘটনায় মালিক-শ্রমিকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু দুর্ঘটনা রোধে মালিক সংগঠনগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কেন কার্যকর হয় না? এর জবাবে তিনি বলেন, বছরের পর বছর যে অনিয়ম চলছে, তা দূর করতেও সময় লাগে।

সরেজমিন দেখা যায়, আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেলের কাজের কারণে ফুট ওভারব্রিজ অপসারণ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের যেখানে ফাঁকফোকর রয়েছে, সেদিক দিয়েই দৌড়ে সড়ক পার হচ্ছেন পথচারীরা। এমন একজনকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে উত্তর না দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। ট্রাফিক পরিদর্শক খাদেমুল ইসলাম বলেন, বলে-কয়ে, অনুরোধ করেও লাভ হচ্ছে না। চালক-যাত্রী কেউ সচেতন নন।