প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাজেকঃ যেখানে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় (শেষ পর্ব)

কামাল হোসেন শাহীন: পাহাড়ের নির্জনতার মাঝে পরিচিত কন্ঠের চিৎকারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠি। আমি আর রনক তখন রুম থেকে বের হচ্ছি। ওরা বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে গিয়েছিল। এমন আবহাওয়ায় ওরা যেতে রাজি হওয়ায় আশ্চর্য হয়ে ঐ বিষয়ে আমরা কথা বলছিলাম। সাপ, সাপপপ…. শব্দ শুনে অন্য পর্যটকরা চলে আসে ঘটনাস্থলে। এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে মোবাইলের টর্চের আলোয় সাপ খোঁজার চেষ্টা। গিয়ে দেখি হুলস্থূল অবস্থা। কোথায় সাপ? কংলাকে এই বিদ্যুত বিহীন আলো আধাঁরে সাপ হয়ত এ পাহাড় পেরিয়ে অন্য পাহাড়ে। কিংবা আকাশের বিদ্যুতের হঠাৎ আলোয় মতিভ্রমও হতে পারে। কে দেখেছে সাপ, তাকে খুঁজে পেতে বেশ খানিকটা সময় পার হয়। তারা তখন নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে পরিস্থিতির প্রতি নজর রাখছে। বিজু ভাই এসে রণে ভংগ দিয়ে বললেন, সাপ কোন ক্ষতি করবে না।

বৃষ্টির ছিটেফোঁটা আর আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর এক ভীতিকর পরিস্থিতিতে লাঠি হাতে আমরা বেড়িয়ে পরি। মোবাইলের ক্ষীণ আলোকে সাথি করে পাহাড় থেকে নামতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। পুরো এলাকায় পাহাড়ের নিস্তব্ধতা বিরাজমান। ভয়ও ভর করছিল। পাহাড়ের এই নির্জনতায় বিপদের সম্ভাবনায় পাশে কাউকেই পাওয়া যাবেনা ভেবে ভিতরটা শুকিয়ে যায়। কিন্তু সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের রুইলুই পাড়ার ক্ষীণ আলোর হাতছানি সকল অন্ধকার দূরে ঠেলে সাহস যোগায়। অন্ধকারে দাঁড়িয়েই নিজেরা পরিকল্পনা ঠিক করে নিই, চারজন একত্রে চলব, কোন কারণেই কেউ দলছুট হব না। ফিরে আসার সময়ও দল বেঁধে ফিরব তা রাত যতই গভীর হোক। আর কেউ পথ রোধ করলে মোবাইল ফোন, টাকা পয়সা দিয়ে দেব কোন প্রকার বাক্য ব্যয় না করে। এরপরও যদি রক্ষা না মিলে তাহলে হাতের লাঠি দিয়েই শুরু করব তাতে যা হয় হবে।চারজনের হাতেই লাঠিয়ালদের লাঠি বেশ শক্ত ও সতর্কতার সাথে ধরা। কৌশল হিসাবে কথা বলতে বলতে পথ চলি। আকাশে হালকা চাঁদের আলো, বিদ্যুৎ চমকানো আর মোবাইল ফোনের আলোয় হিসেব করে পা ফেলি। একসময় কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে ইটের রাস্তা উঠে আসি। এরপর বেশ খানিকটা জনমানবশূন্য পথ পথ পেরিয়ে পাকা রাস্তার দেখা পাই। দূর থেকে মাঝেমধ্যে দু একজন পর্যটকের আনাগোনা দৃষ্টিসীমার মাঝে ধরা পড়তে লাগল। আরো এগিয়ে যেতেই ইলেক্ট্রিসিটির অনুপস্থিতিতে সোলার ব্যবস্থার অসাধারণ ও কার্যকরী আয়োজন চোখে পরে।আস্তে আস্তে ভীতিকর পরিবেশ থেকে লোকালয়ে প্রবেশ করতে থাকি। যত এগুতে থাকি মানুষজনের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে, ঠিক যেন শহরের আবহ। প্রতিটি মানুষই প্রকৃতিকে ধারণ করতে এখানে এসেছে। এখনকার স্হানীয় ব্যবসায়ী ছাড়া সবাই পর্যটক। পথের দুই পাশের দোকানগুলোতে ও ফুটপাতে নানা ধরনের পাহাড়ী খাবারের পসরা বসেছে। রুইলুই পাড়ার রিসোর্টগুলোর বারান্দায় বসে পর্যটকরা নিজেদের মত সময় কাটাচ্ছে। রাস্তায় পুরনো দিনের গানের সাথে চট্রগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক গান বাজছে উচ্চস্বরে। গানের কথাগুলোয় পাহাড়ী জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

আমরা একটা রিসোর্টের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। পাহাড় থেকে কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন সেতু পেরিয়ে রিসোর্টে ঢুকতে হয়। সেখানে অনেকগুলো অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে হইহুল্লোড় করছে। রনক অসাধারণ প্রতিভাবান। অপরিচিত মানুষের সাথে মিশে নিমেষেই বন্ধু বানানোর এক অনন্য যোগ্যতা আল্লাহ্ তাকে দিয়েছেন। ওর সাথে ঐ দলের ভিতর আমরাও মিশে যাই। অনেক সময় ধরে মজা করে শুরু হয় রনকের বেসুরা কন্ঠের সঙ্গীত যা পরে দলীয় সংগীতে পরিনত হয়। রাস্তায় নেমে ১৫/২০ জনের ছেলেমেয়েকে নিয়ে রনক গান গেয়ে চলে। রাস্তার অন্য পর্যটকগন হাত তালি দিয়ে,কেউ গলা মিলিয়ে কিংবা হাত উঁচিয়ে তাতে উৎসাহ যোগায়।

কখন যে রাত গভীর হয়েছে এই আনন্দ ধারার মাঝে একবারও টের পাইনি। তবে আশার কথা এই যে আকাশের অবস্থা স্থিতিশীল। বের হয়েছিলাম প্রস্তুতি নিয়ে। ছেলেবেলার সেই মাথায় বৃষ্টি নিয়ে কাক ভেজা হয়ে ঘরে ফিরব বলে। বৃষ্টি এলনা, সম্ভাবনাও গেল না। কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষে যাত্রা করব বলে সিদ্ধান্ত হলো। রনক আর পারভেজ গিয়ে ঢুকে হাতের তৈরি আসবাবপত্রের এক দোকানে। চোখে পড়ল পাশের দোকানে পাহাড়ীদের নিজস্ব তৈরি নানাবিধ মেয়েলি পোশাক। জুয়েল আর আমি ঢুকে পরি সেই দোকানে। এই টা সেই টা দেখতে দেখতে তার জন্য( যে কিনা আমাকে পাহাড়ে পাঠিয়ে দিয়ে ছেলে দু’টোর সকল ঝামেলা একাই সামলাচ্ছে) চাদর সদৃশ্য কিছু একটা কিনতে গিয়ে দেরী করে ফেলি। বের হয়ে দেখি, পাশের দোকানে রনক আর পারভেজ নেই। প্রথমে ভাবলাম হয়তো ধারেকাছে কোথাও আছে কিন্তু বেশ কয়েকটি দোকানে খুঁজে না পেয়ে একটু ভীত হয়ে উঠি। আমাদের সকলের কাছে থাকা গ্রামীণ ফোনের নেটওয়ার্ক মরে ভুত হয়েছে দীঘিনালা থেকে বের হওয়ার পরই। আমার কাছে থাকা রবি নেটওয়ার্কও খুব একটা সুবিধার নয়,’ এই থাকে তো এই থাকে না। তরপরও কথা চালিয়ে নেয়া যেত কিন্তু তাদের সাথে কোনভাবেই সংযুক্ত হতে পারছিলাম না যে ফোন করে জেনে নেব ওরা এখন কোথায়? যখন দেখলাম ফোনে আর ওদের পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নাই তখন আমি আর জুয়েল সামনে এগুতে থাকি। অজানা ভয় আর আতংক সবাই ঘিরে ফেলে আমাদের ।এরকম পরিস্হিতির জন্য মোটেও তৈরি ছিলাম না। নিজেদের এই বলে সাহস দেই, ওরা আমাদের ছেড়ে যাবে না। অনেকদূর গিয়ে না পেয়ে আবার পিছনে ফিরি। এভাবে চলল বার দুয়েক। তাতেও কোন লাভ হল না।ভগ্নমনোরথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরবর্তী করণীয় নিয়ে যখন দুজনে ভাবছি, তখন দেখি ওরাও এদিকে এগিয়ে আসছে। ওরা নাকি আমাদেরকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে রুইলুই পাড়ার এমাথা থেকে এমাথা। এ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বাক বিতন্ডা শেষে মান অভিমানে পথ চলা শুরু করি। পাহাড়ি পথের নিস্তব্ধতা আর সাপ জোঁক থেকে বাঁচতে চারজন একসাথে লাঠির অন্য প্রান্ত দিয়ে একসাথে নিচে আঘাত করে পথ চলতে থাকি। বেশ বড় একটা শব্দ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল রাস্তায় যাতে করে পাহাড়ের নিস্তব্ধতাও যেমন ভাঙ্গা সম্ভব হচ্ছিল তেমনি পাহাড়ি পথে যদি সাপ বা অন্য হিংস্র জাতীয় কিছু একটা থাকলে পালিয়ে যাবে সেই আশায়।

আদিবাসীদের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখলাম, ওরা সন্ধ্যার সাথে সাথে ঘরে ফিরে। হয়ত জীবনে চাওয়া কম কিংবা অনাবশ্যক মনে করে রাতে পথ চলে না। আমাদের কথা বলাবলি বন্ধ কিন্তু একসাথে পথ চলছি। একেবারে গায়ে লেগে লেগে। মাঝেমধ্যে ভয় দূর করতে বেসুরো গলায় কেউ গান ধরে। কিন্তু কোন তাল না পেয়েই থেমে যায়। পাহাড়ের এই এবড়োখেবড়ো পথে চলতে গিয়ে জুয়েল পায়ে আঘাত পায়। নাগরিক সুবিধা থেকে আমরা এতটা দূরে যে, এখানে কেউ আহত হলে তাকে ডাক্তার তো দূরে থাক, ঘরে পৌছানোই অসম্ভব। তবে সুখের বিষয় এই যে, তেমন কোন বিপদে না পরে পৌঁছে যাই, সেইই টংঘরের কাছে। ভেবেছিলাম, অন্তত সেখানে লোকজনের দেখা পাব। আমাদের প্রত্যাশা মিছে প্রমাণ হল, দেখলাম টঙঘরে কেউ নেই। অনেকটা পা টেনেটেনে পাহাড়ে উঠার জন্য পা বাড়াই। একবার ভাবি, একটু বসে যাই কিন্তু গাড়ির মত একেবারেই বসে যাওয়ার ভয়ে আর থামিনা।অবশেষে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দেহটাকে টেনে পাহাড়ে তুলে হাফ ছেড়ে বাঁচি।

পাহাড়ে উঠে দেখি চারিদিকে অন্যরকম নিরবতা বিরাজমান যার সাথে আমরা মোটেই পরিচিত ছিলাম না। রুমে ফিরে পাহাড়ের শীতলতায় শরীরের সকল ক্লান্তিকর অবস্থা দূর হয়ে ভাললাগার আবেশে ভরে যায় অন্তর। রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দার পাটাতনে হেলান দিয়ে বসে পূর্বে তাকিয়ে থাকি। দিনের বেলা দেখা সবুজ দিগন্ত সাদা শাড়িতে আবৃত। যতদূর চোখ যায়, শুধুই মেঘের ভেলা যেন উড়ে উড়ে আমাদের দিকে আসছে। হাত বাড়ালেই মেঘ ছুঁয়ে দেখার সুযোগে বসে থাকি।

ডাক আসে রাতে খাবারের জন্য। বার বি কিউর আয়োজন ছিল বেশ আকর্ষনীয় ও মজাদার। খেয়ে গিয়ে বসি টঙঘরে। কাঞ্চন ভাইয়ের হাতের আদা চা হাতে নিয়ে গিয়ে বসিসেখানে। পাশাপাশি দুটি টঙঘর। কাঠের পাটাতনের ঘরে উপরে খড়কুটো দিয়ে তৈরি। আশপাশে একেবারেই খোলা। সোলারের আলোয় চলা লাইটগুলো প্রায় নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। সর্বত্র একধরণের ঠান্ডা পরিবেশ। যতদূর নিচে চোখ যায় পাহাড়গুলোকে ঢেকে রেখেছে তুলোর মত সাদা মেঘ। পাশের টঙঘরে স্পষ্টতই টের পাচ্ছি বিশেষ রঙ্গীন পানি পানের উৎসব চলছে। কন্ঠের ভিন্নতা আর গানের কথাগুলো বলে দিচ্ছে সেখানে কি হচ্ছে? আমরা জম্পেশ আড্ডা দিতে থাকি। দূরের মেঘগুলো আরো কাছে আসে। আরো স্পষ্ট হয়।

রুমে ফিরে গায়ে কম্বল পেচিয়ে খানিকটা সময় বারান্দায় বসে থাকি। মন কিছুতেই শুতে সায় দেয় না কিন্তু শরীর বলে আর পারছিনা। শোব কি শোবনা অবস্থায় টঙঘরের গান কানে আসে। গান নয় যেন গগনবিহারী চিৎকার। কথা আর সুরে আকাশ পাতাল ব্যবধান। কিছুক্ষণ পর পাশের রুম থেকেও ভেসে আসে দুজনের অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্যালাপ। বুঝতে আর বাকি নেই যে তারা আর এজগতে নেই। একজনের কথায় মনে হচ্ছে, এখনই ভারতের মিজোরাম দখল করে আমাদের মানচিত্রের আয়তন বাড়িয়ে ফেলে।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে থাকি। মেঘের ভেলা দেখতে দেখতে সময় পার করি। চারদিকে মেঘ আর মেঘ। এ দৃশ্য শুধুই উপভোগের। কোন বাক্যই সে সৌন্দর্যকে প্রকাশের যোগ্যতা রাখেনা। অনেক পরে সেই সাদা মেঘ ভেদ করে লাল সূর্য উঁকি দেয়। মেঘ তখনও ভেলায় ভেসে উড়ে চলে। সাদা মেঘের মাঝে রক্তিম লাল সূর্য উদয়ে ভিন্ন এক ভিউ সৃষ্টি হয়। চোখের পলকে পলকে সে দৃশ্যকে আমরা উপভোগ করি। বাইরে তখন শিশিরকণা পাহাড়ে ভিন্ন পরিবেশের জানান দিচ্ছে।

সূর্যের আলো বাড়ার সাথে সাথে কংলাকে পর্যটকদের ভীড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে। দূরের মেঘমালাও মিলিয়ে যাওয়া শুরু করে। আমরাও সকালের খাবার শেষ করে ব্যাগ গোছানো শুরু করি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ