প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলা সিনেমার একাল সেকাল

মিঠুন মিয়া : চলচ্চিত্র যোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে সিনেমার বিকল্প নেই। সিনেমা যেমন মানুষকে নির্মল বিনোদন দেয়, তেমনি জ্ঞান, চিন্তাচেতনা ও জানার জগতকে প্রসারিত করে। গতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ, সামাজিকীকরণ, নীতি নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করা, মানুষকে উজ্জীবিত করা, সত্য সুন্দর প্রকাশে চলচ্চিত্রের অবদান অসামান্য। গতিই জীবন, স্থিতিই মৃত্যুÑএ সুবাদে সময়ের পরিবর্তনে চলচ্চিত্র জগতে এসেছে নানা পরিবর্তন। সংযোজন এবং বিয়োজন হয়েছে অনেক কিছুই। বদলে গেছে সিনেমার কাহিনী, যান্ত্রিক দিক, নান্দনিকতা, বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপট, দর্শকের ধরন, শিল্পী এবং কলাকুশলীসহ অনেক কিছুই।

আধুনিক যুগে পিছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। তবে বাংলা সিনেমার সোনালী অতীতকে কোনভাবেই আড়াল করে রাখার সুযোগ নেই। সিনেমার একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে বলতে পারি, বর্তমানে চলচ্চিত্র অঙ্গনে যতই পরিবর্তন আসুক না কেন, সোনালী দিনের সেই সিনেমাগুলোকে অতিক্রম করতে পারবে না। সেকালে এতো ডিজিটাল চাকচিক্য, আলো, আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার ছিল না। ছিল সমাজ থেকে নেয়া সুন্দর জীবন ও বাস্তবধর্মী গল্পপট, অসাধারণ গান, সুর, মনোমুদ্ধকর অভিনয়, প্রাকৃতিক দৃশ্যপট, অকৃত্রিম নান্দনিকতা। যা বর্তমানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

সে সময় আমরা কিছু সৃজনশীল মানুষকে পেয়েছিলাম, যাদের হাতে তৈরি হয় বিখ্যাত সব সিনেমা। জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), আলমগীর কবিরের সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), আজিজুর রহমানে ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯), খান আতাউর রহমানের নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৭), তোজাম্মেল হক বকুলের বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না (১৯৮৯), দীলিপ সোমের সাত ভাই চম্পা (১৯৬৮), আলমগীর কবিরের রূপালী সৈকত (১৯৭৯), চাষী নজরুল ইসলামের ওরা এগারো জন (১৯৭২), হুমায়ুন আহমদের আশুনের পরশমনি (১৯৯৫), আব্দুল্লাহ আল মামুনের সারেং বউ (১৯৭৮) সহ অসংখ্য চলচ্চিত্র। কালোত্তীর্ণ এই সব চলচ্চিত্র ব্যাপক দর্শক জনপ্রিয়তা এবং ব্যবসায়ীক সফলতা অর্জন করেছিল। চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনী, দৃশ্যপট, গান সব কিছুতেই ছিল অসাধারণ নান্দনিকতা।

তবে এখন এমন সিনেমা তৈরি হচ্ছে না, তা নয়। তবে অনেকটাই কম, নেই বললেই চলে। চলচ্চিত্র সমাজের দর্পণ। সে দর্পণে ফুটে ওঠে সেই সমাজের সার্বিক চিত্র। বর্তমানে অতি বাণিজ্যনির্ভর সিনেমাগুলোর কাহিনী কৃত্রিম। বাস্তবতার সাথে খুব একটা মিল নেই। দর্শকের মনোজগতে প্রভাব ফেলে না। দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রভাব নেই। নেই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাচালির মতো জীবনধর্মী কাহিনী। কিংবা ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারার মতো অসাধারণ গল্প। সেকালের কলকাতার বাংলা ছায়াছবির নায়ক-নায়িকা উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন শুধুমাত্র রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে আপামর বাংলা সিনেমা দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছিলেন। নায়ক রাজ রাজ্জাক, ফারুক, ইলিয়াস কাঞ্চন, জসীম, আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, জাফর ইকবাল, শাবানা, অঞ্জু ঘোষ, ববিতা, কবরী, সুচন্দা, সালমান শাহ, ওমর সানী, সোহেল রানা, নাঈম, শাবনাজ, ওয়াসিম, উজ্জলের মতো অভিনেতা অভিনেত্রীর জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া।

তাদের অভিনয়ের জন্য দর্শক কয়েকবার সিনেমা হলে প্রবেশ করেছে। তাদের অভিনয় ছিল মনোমুগ্ধকর। সিনেমার গানগুলোতে ছিল অসাধারণ কথা, সুর ও সঙ্গীত। গানের ভিডিও ছিল প্রাকৃতিক সব দৃশ্য। গানকে কেন্দ্র করেই সিনেমাগুলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বর্তমান সিনেমাগুলোতে গ্রাম, নদী, মুক্ত আকাশ তথা প্রকৃতির সৌন্দর্যের চেয়ে কৃত্রিমতায় বেশি দেখি। অথচ পুরাতন সিনেমাগুলো ছিল প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর। মানুষের সুকুমার বৃত্তি চর্চার মাধ্যমে সমাজের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশে চলচ্চিত্রের অবদান অপরিসীম। ভালো সিনেমা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখে, একই সাথে বিশ্বদরবারে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে।

মানসম্মত চলচ্চিত্র না থাকায় দর্শক হলবিমুখ। ফলে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে চলচ্চিত্রের এই নি¤œমুখী অবস্থার জন্য নানা কারণও রয়েছে। এখন সময় এসেছে চলচ্চিত্র শিল্পের দিকে নজর দেয়ার। আমাদের পাশের দেশ চলচ্চিত্র শিল্পের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে সকল অসঙ্গতি, অন্তরায় দূর করে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কাম্য। বাংলা সিনেমায় ফিরে আসুক সেই সোনালী অতীতÑএমনটিই প্রত্যাশা। লেখক : শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সম্পাদনা : রেজাউল আহসান

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ