Skip to main content

দূতাবাস হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস

নুর মাজিদ : দূতেরা অবধ্য, প্রাচীনকালে এটি ছিল অলিখিত নীতি। তবে এই নীতি বিরুদ্ধ ঘটনার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বরং এমন অজস্র ঘটনা মধ্যযুগীয় ইতিহাসে রয়েছে যেখানে বিদেশী দূতদের রাজনীতির বলি হয়ে ধর থেকে মুন্ডু আলাদা হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। তবে অষ্টাদশ শতকের পর থেকেই পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিমন্ডলে যে ইউরোপিয় আইনের প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়া শুরু হয় তারই ধারাবাহিকতায় বৈশ্বিক কূটনৈতিক চর্চারও আমূল পরিবর্তন হয়। প্রথম শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক দূতেরা আর অরক্ষিত নন। বরং আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী স্বাগতিক দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের উর্ধে অবস্থান করেন, ভোগ করেন বাড়তি নিরাপত্তা এবং কূটনীতিক মিশন পরিচালনার ক্ষমতা। ইউরোপিয় শক্তিগুলোর নতুন উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিযোগিতায় তাদের দূতাবাসগুলোর ভূমিকা ছিলো অপরিহার্য। সাধারণত কোন দেশ যখন অপর একটি দেশকে স্বীকৃতি দেয় ও তার সঙ্গে কূটনৈতিক স¤পর্ক স্থাপন করে তখন দুই দেশের স¤পর্কে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই তাদের কূটনীতিক মিশন বা দূতাবাস স্থাপন করতে হয়। বৈদেশিক দূতাবাসগুলো স্বাগতিক দেশের মাটিতে নিজ নিজ দেশের ভূখ- বলেই বিবেচিত হয়। তাই অনুমতি ব্যতীত স্বাগতিক দেশের কর্মকর্তাদের বিদেশী দূতাবাসগুলোতে প্রবেশও নিষিদ্ধ। তবে আধুনিক যুগের এমন নীতির সুযোগ নিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত অনেক কাজই হয়েছে। যার উজ্জ্বল উদাহরণ গত ২রা আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুল নগরের সৌদি কূটনীতিক মিশনে ভিন্নমতালম্বি সাংবাদিক জামাল খাসোগজির নিহত হওয়ার ঘটনাটি। তুর্কি গোয়েন্দারা শুরু থেকেই বলে আসছেন খাসোগজিকে হত্যা করেছে সৌদি আরব। টানা তিন সপ্তাহব্যাপী অস্বীকার করে আসার পর গত শুক্রবার এই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে সৌদি আরব। তবে কূটনীতিক মিশনে হত্যার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বরং বিভিন্ন সময় কখনো দূতাবাস কর্তৃপক্ষ কখনওবা বাহিরের শক্তি দূতাবাসের ভেতরে বা বাহিরে নরহত্যায় সামিল হয়েছে। এমনই কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা আজ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। ইয়োভনে ফ্লেচার- লিবিয়ান দুতাবাস, লন্ডন- সময়টা ১৯৮৪ সাল, লন্ডন পুলিশের নারী পুলিশ অফিসার ইয়োভনে ফ্লেচার লন্ডনস্থ লিবিয়ার দূতাবাসের সামনে একটি বিক্ষোভ মিছিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধেই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল এই বিক্ষোভ। সেখানে অংশ নিয়েছিলেন বেশকিছু প্রবাসি লিবিয়ান নাগরিক। এই সময় লিবিয়ান দূতাবাসের প্রথমতলা থেকে দুজন অজ্ঞাত বন্দুকধারী স্টারলিং সাব-মেশিনগান দিয়ে বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণে তাক্ষণিক আহত হন ১১ জন লিবিয়ান বিক্ষোভকারি এবং মারা যান পুলিশ অফিসার ফ্লেচার। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ১১ দিন ধরে লিবিয়ান দুতাবাস অবরুদ্ধ করে রাখে ব্রিটিশ প্রশাসন এবং পরবর্তীতে সকল লিবিয়ান কূটনীতিককে যুক্তরাজ্য থেকে বহিস্কার করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিদেশি কূটনীতিকরা স্বাগতিক দেশের বিচারের আওতামুক্ত থাকায় তাদের আইনি সাজা দেয়া সম্ভব নয়। তাই যুক্তরাজ্য এই ঘটনার প্রেক্ষিতে লিবিয়ার সঙ্গে সকল প্রকার কূটনৈতিক স¤পর্কচ্ছেদ করে। পরবর্তীকালে অফিসার ফ্লেচারের মৃত্যুদ্বারা প্রভাবিত হয়েই লিবিয়ায় বোমাবর্ষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ভূখ- ব্যবহারের অনুমতি দেন দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার। জে ক্রিস্টোফার স্টিভেন্স-যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস, বেনগাজি- ২০১২ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর লিবিয়ার বেনগাজিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায় একদল সশস্ত্র উগ্রপন্থী। দূতাবাসের নিরাপত্তাকর্মীদের বন্দুকযুদ্ধে পরাজিত করে তারা ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করে। সেসময় দূতাবাসে অবস্থান করছিলেন মার্কিন রাস্ট্রদুত জে ক্রিস্টোফার স্টিভেন্স। তাকে উগ্রপন্থীরা নির্যাতন করে হত্যা করে এবং তার লাশ বেনগাজি শহরের রাস্তায় প্রদর্শন করে। ধারণা করা হয়, লিবিয়ান নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতিশোধ হিসেবেই তার সমর্থকগোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৪ সালে এই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকায় লিবিয়ান চরমপন্থি গোষ্ঠী আনসার আল শরিয়াকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। আলেকজান্ডার সেরগেইভিচ গ্রিবোয়েদভূূ -রুশ দূতাবাস, পারস্য সম্রাজ্য- ১৮২৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি খাজার শাসিত পারস্য সাম্রাজ্যে নিহত হন রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার সেরগেইভিচ গ্রিবোয়েদভূূ। তৎকালীন খাজার শাহের দুইজন আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত বাদি এবং এক খোঁজাকে নিজ দুতাবাসে আশ্রয় দেওয়ার পরে রুশ দূতাবাসে হামলা চালায় উত্তেজিত জনতা। গ্রিবোয়েদভূূ ও তার দূতাবাস রক্ষীরা এসময় হামলাকারীদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তবে শেষরক্ষা হয়নি তাদের। উত্তেজিত নাগরিকেরা দূতাবাসের সকল নিরাপত্তারক্ষী এবং গ্রিবোয়েদভূূকে টুকরো টুকরো করে কেটে হত্যা করে। এই ঘটনার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করে গুলিস্তান ও তুর্কমেনশায় চুক্তি। পারস্যের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর এই চুক্তিদুটির নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন গ্রিবোয়েদভূূ। এই চুক্তিগুলো খাজার পারস্যকে ককেশাস অঞ্চলে রুশ দখলদারিত্ব মেনে নিতে বাধ্য করে । গ্রিবোয়েদভুকে হত্যার পর রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে রুশ সম্রাট প্রথম নিকোলাসকে পারস্যের বিখ্যাত শাহী হিরা উপহার পাঠান পারস্য সম্রাট। তার নাতি খসরু মির্জা নিজে সেন্ট পিটার্সবার্গে গিয়ে রুশ সম্রাটের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে সে সময় ওসমানীয় তুর্কি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কারণে পারস্যের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি রুশ সম্রাট। নিউ ইয়র্ক টাইমস, উইকিপিডিয়া, বিবিসি

অন্যান্য সংবাদ