প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোটের আগে দলের ভাঙাগড়া নতুন কিছু নয়, তবে কেন ভয় শঙ্কা?

মাহবুব আলম : সংসদ নির্বাচনের আগে দল-জোটের ভাঙাগড়া নতুন কিছু নয়। আমাদের দেশে ব্রিটিশ ভারত, পর পাকিস্তান আমল থেকেই এটা হয়ে আসছে। ’৫৪ সালে হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট এই ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই গঠিত হয়। এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওই যুক্তফ্রন্টের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মুসলিম লীগের একচ্ছত্র রাজত্বে যখন এদেশের মানুষ পাকিস্তানকে মসজিদ আর মুসলিম লীগকে মসজিদের রক্ষক জ্ঞান করতো, সেই সময় হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়ে এদেশের রাজনীতিতে একটা সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক মাত্রা যোগ করে। যা ইতিহাসে এক অনন্য নজীর হয়ে আছে। এরপর আইউববিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনে বিরোধী দল জোট গঠন করে। সেই সময়ও বিভিন্ন দলের ভাঙাগড়ার ঘটনা ঘটে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগেও ভাঙন হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় দল ও জোটের ভাঙাগড়ার ইতিহাস মাত্র সেদিনের ঘটনা। এরশাদের স্বৈরশাসনের সময় ’৮৮-র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে আ স ম রবের নেতৃত্বে ৭২ দলের জোট হয়। অন্যদিকে ’৮৬-র নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোটের ভাঙন হয়। একাধিক ভাঙাগড়ার ঘটনা ঘটে জাসদ, বাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্য অনেক দলে। এমনকি আওয়ামী লীগেও ভাঙন হয়। মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ (মি) গঠিত হয়।

’৮৬ সালে মধ্যরাতে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার নাটকীয় সিদ্ধান্তে এদেশে বিভিন্ন দল ও জোটে ভাঙাগড়া হয়। ৯৪/৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনে জামায়াতের সাইট বদলও রাজনীতির কর্মীদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তারপর ওয়ান ইলেভেনে এই দল ভাঙাগড়ার চেষ্টার কথা কে না জানে? শুধু আমাদের দেশ কেনো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটা অহরহ হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতে আসন্নলোকসভা ও বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধান সভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল ও জোটের ভাঙাগড়ার খেলা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বিজেপিবিরোধী ফেডারেল ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে তিনি অনেকদূর অগ্রসরও হয়েছেন। তার এই সাফল্যের চাবিকাঠি হলো, কংগ্রেসের একাধিক ও পরীক্ষিত মিত্র ফেডারেল ফ্রন্টে সম্মতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন বিজেপি’র শরীকদের অনেকে মমতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস জোটের সঙ্গে মায়াবতী জোট করে ও রাজ্যের বিধান সভা নির্বাচনে জোট ভেঙে দিয়েছেন। অবশ্য তিনি বলেছেন, লোকসভায় জোট হবে। উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী দল এই জোটের চক্করে পড়ে দু’ভাগ হয়ে গেছে। ত্রিপুরায় তৃণমূল ও কংগ্রেস বিলীন হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে শ্রীলংকার বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ক্ষমতাসীন দল থেকে বেরিয়ে অন্যদের সঙ্গে জোট করে প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন সিরিসেনা। ওই নির্বাচনে শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি জেভিপি সরকারকে সমর্থন দিয়ে দিব্বি আছে। উন্নত বিশ্বের ইটালিতে এই দল ও জোট বদল হয় হরহামেশা। ফলে ওই দেশে সরকার বদল ডালভাত।

এক কথায়, ভোটের আগে দল ও জোটের ভাঙাগড়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে দল ও জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। বলা হচ্ছে ষড়যন্ত্র। বলা হচ্ছে, টার্গেট শেখ হাসিনা। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চক্রান্ত। দল ও জোট তো নির্বাচনের জন্যে। নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ লীগ জোট হারে, তাহলে তো শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারাবেই। আর যদি জেতে তাহলে তো ক্ষমতা ধরে রাখার ঘটনা ঘটবে। এটাই তো গণতান্ত্রিক দেশের রীতিনীতি। তাহলে ক্ষমতাসীন দল ও জোটকে পরাজিত করার মধ্যে ষড়যন্ত্র কেনো খোঁজা হচ্ছে?

এখানে একটা কথা পরিস্কার করে বলা দরকার। সব রাজনৈতিক দল ও জোট রাজনীতি করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে। এটা তো অপরাধ নয়। এটা তার অধিকার। এই অধিকার সেই অর্জন করবে যার বা যে দল ও জোটের যোগ্যতা আছে। আর এই যোগ্যতার মাপকাঠি হলো বেশি ভোট পাওয়া। মনে রাখতে হবে, ড. কামালরা জনসেবার জন্যে রামকৃষ্ণ মিশন করেননি। তারা ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক দল ও জোট করেছেন। করেছেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে। সেই যাওয়া ঠেকাতে পাল্টা জোট, পাল্টা রাজনীতি। সেই রাজনীতি সেই জোট ১৪ দল তো আছেই। তাহলে ভয়টা কোথায়? আর ড. কামালের প্রতি ক্ষোভটাই বা কেনো? এই ক্ষোভ কি এজন্য যে, তিনি কেনো ক্ষমতা চান? করছেন ওকালতি, ওইটাই করেন না কেনো? এ ক্ষোভ আসলে মনের গভীরে ভয় ধরার ক্ষোভ। ক্ষোভের ফলেই ১৪ দল বলছে, এটা জোট না ঘোঁট। আবার একই সঙ্গে ১৪ দল বলছে, যাদের ভোট নেই, তারাই জোট করছে। জনবিচ্ছিন্ন জোট করে বিএনপির ভোট কমেছে। যদি তাই হয়, তাহলে ক্ষমতাসীনদের জন্যে তো খুশির বার্তা, আনন্দ সংবাদ। তাহলে এ নিয়ে অহেতুক কাদা ছোঁড়াছুড়ি কেনো? কেনো উত্তেজক-উস্কানিমূলক কথাবার্তা? এতে করে কি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতি হচ্ছে না অধঃপতন হচ্ছে? এটা বিশেষভাবে চিন্তাভাবনা ও বিবেচনা করা উচিত।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের প্রায় সব দলেরই আন্দোলন সংগ্রামের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। আছে অনেক সংগ্রামী ও বিচক্ষণ নেতা। আমার বিশ্বাস, নেতারা এ বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করবেন এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিকভাবেই লড়বেন। এতে একদিকে যেমন চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে, অন্যদিকে সংঘাতের আশংকা দূর হয়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার হবে। এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

সর্বাধিক পঠিত