প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাপের ‘বিষে’ বিষ নেই

সমকাল : রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে গত বছরের এপ্রিলে সাপের বিষ পাচারে জড়িত আন্তর্জাতিক চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে একটি গাড়ি জব্দ করে তার ভেতরে থাকা স্বচ্ছ কাচের ছয়টি জার উদ্ধার করা হয়। ওই সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, কাচের জারে ভরা তরল পদার্থ সাপের বিষ। যার বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকা! দেশে একসঙ্গে সাপের বিষের এত বড় চালান ধরা পড়ায় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড়ও হয়। গ্রেফতার হওয়া চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলাও করে পুলিশ।

অবশ্য অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে, উদ্ধার করা সাপের সেই বিষে ‘বিষ’ নেই! স্বচ্ছ কাচের জারে রাখা সেই বস্তুগুলোর কোনোটিতে মধু, কোনোটিতে তুঁত, আবার কোনোটিতে ছিল চকের পাউডার। পুলিশের পক্ষ থেকে করা ফরেনসিক পরীক্ষাতেও জানা গেছে এগুলো সাপের বিষ নয়।

শুধু ওই ঘটনাটিতেই নয়; একই বছরের অক্টোবরে উত্তরা এলাকা থেকে ‘সাপের বিষ’ ভরা পাঁচটি বিশেষ জারসহ চোরাচালান চক্রের আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এর আগে ওই বছরের মার্চে ধানমণ্ডি এলাকা থেকে ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের ১২ পাউন্ড ‘সাপের বিষ’ জব্দ করে ডিবি। এসব ঘটনাও পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়েছিল। গণমাধ্যমেও ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়। অবশ্য ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় সাপের এসব বিষেও বিষ মেলেনি।

এসব ঘটনায় করা মামলাগুলোর তদন্ত সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি অভিযানে শত কোটি টাকার সাপের বিষ উদ্ধারের পর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। জারগুলোর গায়েও কোড নম্বর এবং এগুলো কোবরা সাপের বিষ লেখা ছিল। এতে এসব মামলা অতিগুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু হয়। আসামিদের রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তদন্তের মাঝপথেই তদন্ত কর্মকর্তাদের হতাশ হতে হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে এগুলো আসলে সাপের বিষ নয়। সাপের বিষের নামে মূলত এগুলো বিক্রি করে প্রতারণা করা হচ্ছিল।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, উদ্ধার করা জারগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার জন্য র‌্যাবের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় জানা যায় এগুলোতে সাপের বিষ নেই। জারে থাকা তরল পদার্থের মধ্যে মধু ও তুঁত ছিল আর পাউডার জাতীয় বস্তুতে মিলছে চক পাউডার।

এরইমধ্যে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকা থেকে কথিত সাপের বিষ উদ্ধারের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা মামলার চার্জশিট আদালতে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য চার্জশিটে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অভিযোগ প্রত্যাহার করে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই মামলাটি তদন্ত করেছিলেন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মুক্তার হোসেন। তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। পরিদর্শক মুক্তার হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত ও ল্যাবের পরীক্ষায় উদ্ধার করা বস্তুগুলো সাপের বিষ নয় বলে প্রমাণ মিলেছে। অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।

কথিত সাপের বিষ উদ্ধারের ঘটনায় উত্তরা-পূর্ব থানায় করা অপর একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক আরমান আলী  বলেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও দীর্ঘ তদন্তেও তিনি উদ্ধার করা বস্তুগুলো যে সাপের বিষ তার পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাননি। তা ছাড়া এগুলো পরীক্ষার জন্য র‌্যাবের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠালেও ল্যাব রিপোর্টেও এসেছে এসব বস্তু সাপের বিষ নয়।

ডিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা মূলত প্রতারক চক্রের সদস্য। এরা সাপের বিষ রাখার জারে মধু বা অন্য কোনো বস্তু রেখে তা সাপের বিষ বলে প্রতারণা করে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

জানা যায়, গ্রেফতারের পর কথিত চোরাচালান চক্রের এসব ব্যক্তি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গল্প ফাঁদে, জারগুলোতে কোবরা সাপের বিষ রয়েছে। এগুলো ফ্রান্স থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে চোরাইপথে আনা হয়। দামি ওষুধ তৈরিতে এই বিষ ব্যবহূত হওয়ায় বৈধপথে এগুলো আমদানি করতে অনেক টাকা খরচ পড়ে। তাই তারা চোরাইপথে এসব বিষ এনে ওষুধ শিল্পে সরবরাহ করে থাকেন। চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা জারগুলোর ট্যাগেও ‘রেড ড্রাগন কোম্পানি, ফ্রান্স’ এবং ‘স্নেক পয়জন অব ফ্রান্স’ লেখা ছিল।

অবশ্য ওষুধ শিল্পের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সাপের বিষ এখনও ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হয় না। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশেও এর ব্যবহার নেই। ফলে বাংলাদেশে এর চাহিদা বা ক্রেতা থাকারও কথা নয়। শুধু আমেরিকা ও ইউরোপের অল্প কিছু ওষুধ কোম্পানি ক্যান্সার ও অল্প কিছু উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-ভেনম তৈরিতে ব্যবহার করে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ