প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচন নিয়ে সংশয়, ঢেউ লেগেছে পরিবর্তনের

বাংলাদেশ জার্নাল : সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টি ও সম্মিলিত জাতীয় জোটের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘জাতীয় পার্টির সামনে সুদিন। আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। জাতীয় পার্টির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী প্রস্তুত রেখেছি। এ নির্বাচনে আমরা জোটগত ও একক— দুইভাবেই প্রস্তুত আছি। নির্বাচন হবে কিনা এ নিয়ে জনমনে এখনো শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করতে হবে।’

গতকাল দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মিলিত জাতীয় জোট আয়োজিত বিশাল মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সকাল ১০টায় মহাসমাবেশ শুরু হয়। সোয়া ১১টার দিকে মঞ্চে আসেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ভোর থেকে দলের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সমাবেশে যোগ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে উদ্যান ছেড়ে বাইরে শাহবাগ থেকে মৎস্য ভবন মোড় পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন।

মহাসমাবেশে লোকারণ্য দেখে আপ্লুত দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বক্তৃতার শুরুতেই বলেন, ‘আমি সবচেয়ে বয়স্ক রাজনীতিবিদ। আমার চেয়ে বড় আর কেউ রাজনীতিতে নেই। আবার আমি রাজনীতি করতে গিয়ে যত নির্যাতন, জুলুম, অত্যাচার সয়েছি, তা অন্য কেউ সয়নি। আজকের এ জনসমুদ্র দেখে আমি অভিভূত। যা আশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি হয়েছে। এ জনস্রোত প্রমাণ করে জাতীয় পার্টি আছে। দেশের মানুষের কাছে পার্টির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এত মানুষের সমাবেশ কেন? মানুষ পরিবর্তন চায়। জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। আপনারা কি প্রস্তুত?’ সমাবেত জনতা দুই হাত তুলে এরশাদকে জানান দেন— তারা ক্ষমতায় যেতে প্রস্তুত।

এ সমাবেশ থেকেই ‘নির্বাচনের যাত্রা হোক’ জানিয়ে এরশাদ বলেন, ‘নির্বাচন যারা করতে চাও, এগিয়ে আসো। এ মাসের মধ্যেই পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করা হবে। তৃণমূলের সমর্থনে মনোনয়ন দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য যা যা করা লাগে জাতীয় পার্টি তা করবে। শেষ কথা, নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমি নতুন করে ১৮ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আমরা নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চাই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাই। শিক্ষা পদ্ধতি সংস্কার চাই। স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ চাই। শান্তির রাজনীতি চাই। সড়ক নিরাপত্তা চাই।’ জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় গেলে প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা প্রণয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য দূরীকরণ করবে বলেও তিনি অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররা আন্দোলনের সময় (নিরাপদ সড়কের দাবিতে) বলেছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামত প্রয়োজন। আমরাও তাই চাই। প্রাদেশিক সরকার চাই।’

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আরও বলেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন হবে কি হবে না আমরা জানি না। একটি দল সাত দফা দিয়েছে। সরকার মানতে রাজি নয়। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তা মানাও সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় পার্টি সব সময় নির্বাচন করেছি। আজও আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তবে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। অবাধ নির্বাচন চাই, নিশ্চয়তা চাই। আমরা যারা সংসদে আছি তাদের সবার সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, এ নির্বাচনে আমরা জোটগত ও একক— দুইভাবেই প্রস্তুত আছি। আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী প্রস্তুত রেখেছি, সেইসঙ্গে আমরা জোটগতভাবে নির্বাচন করতে চাই। সেভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুতি আছে, তবে পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। এজন্য ৩০০ আসনেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।’

রাজনীতিতে এসে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন জানিয়ে এরশাদ বলেন, ‘রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছি। বিচারপতি সাত্তার সাহেব অসুস্থতার কথা বলে টেলিভিশনে ঘোষণা দিলেন “আমি অসুস্থ। সেনাপ্রধানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলাম।” তখন আমি সেনাপ্রধান না থাকলে, যিনি থাকতেন তাকেই ক্ষমতা গ্রহণ করতো হতো।’ তিনি বলেন, ‘দেশবাসীকে বলতে চাই, এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। আপনারা কি আমাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চান?’ উত্তরে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা জয়সূচক শব্দ ‘হ্যাঁ’ বলে স্লোগান দেন। এরপর নেতা-কর্মীদের স্লোগান থামাতে বলেন এরশাদ। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার নেতা-কর্মীদের নামে নিয়ে আসা প্ল্যাকার্ডগুলো নামিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা স্লোগান দিয়েই যান, প্ল্যাকার্ড উঠিয়ে রাখেন নেতা-কর্মীরা। একবার, দুবার নয়, তিনবারের বার বিরক্ত হয়ে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের এরশাদ বলেন, ‘তোমরা প্ল্যাকার্ড নামাও। পোস্টার দেখিয়ে মনোনয়ন পাওয়া যাবে না। মন দিয়ে জাতীয় পার্টি করতে হবে। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।’ এরশাদ বলেন, ‘এ মাসের মধ্যে আমরা পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করব। আমরা জোটগতভাবে ৩০০ আসনেই নির্বাচন করব। হয়তো তা পরিবর্তন হতে পারে। সেজন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সামনে আমাদের সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি জয়ী হবে। সে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।’ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দেশবাসীর দোয়াও চান সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।

জাতীয় পার্টি ও সম্মিলিত জাতীয় জোটের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মান্নান, খেলাফত মজলিসের মাওলানা মাহফুজুল হক, জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, এস এম ফয়সল চিশতী, ইসলামী ফ্রন্টের আল্লামা আবু সুফিয়ান, বিএনএর সেকান্দার আলী মণি, জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম, শেখ সিরাজুল ইসলাম, রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, রুস্তম আলী ফরাজী, ইসলামী মহাজোটের আলহাজ আবু নাছের ওয়াহেদ ফারুক।

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। আর এরশাদ স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। জাতীয় পার্টি আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যা যা করার দরকার এবার তাই করবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশ আজ মাদক আর সন্ত্রাসে ছেয়ে গেছে। এ থেকে জাতিকে পরিত্রাণ দিতে হলে জাতীয় পার্টির সরকারের বিকল্প নেই।’

এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘গত ২৮ বছর বহু উত্তাল পরিস্থিতি উপেক্ষা করে, অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্য দিয়েও জাতীয় পার্টি সগৌরবে বিশাল শক্তি নিয়ে রাজনীতির ময়দানে বীরদর্পে টিকে আছে। এর কারণ পল্লীবন্ধু এরশাদের শাসনামল ছিল উন্নয়নের স্বর্ণযুগ। সে সময় ছিল না সন্ত্রাস, খুন-গুম ও জঙ্গিবাদ। মানুষের মাঝে উপলব্ধি হয়েছে উন্নয়ন ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে এরশাদের বিকল্প নেই।’

ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জাপার সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, ‘এরশাদ ছাড়া এ দেশে কোনো জোট হবে না। এরশাদের নেতৃত্বাধীন যে জোট, সে জোটই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে। কারণ, আমাদের এ জোট গণমানুষের জোট।’

নেতাদের শোডাউন : এইচ এম এরশাদকে বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসা থেকে যুবসংহতির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসিবুল ইসলাম জয়ের নেতৃত্বে মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে সমাবেশস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরশাদ ১১টা ২৭ মিনিটে মঞ্চে এসে ওঠেন। এর আগে সকাল ৭টায় জাপা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার ও তার স্ত্রী নাসরিন জাহান রত্না এমপির নেতৃত্বে বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী মাঠে চলে আসেন। ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার মিছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকতে না পেরে উদ্যানের গেট থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে শেষ পর্যন্ত। সমাবেশে উপস্থিত ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, সাহিদুর রহমান টেপা, মুজিবুল হক চুন্নু, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, সুনীল শুভরায়, মীর আবদুস সবুর আসুদ, সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, মো. আজম খান, এ টি ইউ তাজ রহমান, মশিউর রহমান রাঙ্গা, মেজর (অব.) খালেদ আখতার, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, রিন্টু আনোয়ার, শেখ মোস্তাফিজুর রহমান, রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, জিয়াউল হক মৃধা, মাহজাবিন মোর্শেদ, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, জহিরুল ইসলাম জহির, আরিফুর রহমান খান, আলমগীর সিকদার লোটন, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, দেওয়ান আলী, নুরুল ইসলাম নুরু, কাজী মামুন, পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, আমির হোসেন ভুইয়া, লিয়াকত হোসেন খোকা, গোলাম মোহাম্মদ রাজু, এ কে এম আসরাফুজ্জামান খান, মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক, ইয়াহইয়া চৌধুরী, জহিরুল আলম রুবেল, নোমান মিয়া, সুমন আশরাফ, জামাল রানা, আলহাজ মো. আলমগীর কবির মজুমদার, রেজাউল ইসলাম, হাজী মো. আনোয়ার হোসেনসহ প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে মাঠে আসেন। এ ছাড়া শরিক দল ইসলামী ফ্রন্ট ও খেলাফত মজলিসের নেতা-কর্মীদের সুশৃঙ্খল উপস্থিতি ছিল। মহাসমাবেশে শোডাউন ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী নিয়ে মহাসমাবেশস্থলে আসেন। খুব সকাল থেকেই সারা দেশ থেকে আসা নেতা-কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মিছিলের চাপ। নানা রঙের ব্যানার, ফেস্টুন আর নানা সাইজের লাঙল নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন পার্টির উজ্জীবিত নেতা-কর্মীরা। বাদ্যের তালে তালে নেচে-গেয়ে তরুণরা উৎসবমুখর করে তোলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যত মানুষ ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল মঞ্চের পেছনে এবং মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত। জাপার এ মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে রাজধানীতে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। বন্ধ করে দেওয়া হয় পল্টন প্রেস ক্লাব মৎস্য ভবন ও শাহবাগ সড়ক। এদিকে সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় মহাসমাবেশের সংবাদ সংগ্রহে গণমাধ্যমকর্মীরাও ভোগান্তির শিকার হন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত