প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্যার, আপনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন!

সাম্য শরিফ: স্যার, আপনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের অধিক নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সমর্থনে আপনি দেশের সবচেয়ে মর্যাদাবান আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু সেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আপনি বেশি দিন থাকতে পারেননি। ২০০২ সালের ২১ জুন আপনি পদত্যাগ করে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন বা আপনাকে আসতে হয়েছিল। তারপর এই দীর্ঘ ষোল বছরে আপনার রাজনৈতিক কার্যক্রম, সংশ্লিষ্টতা, ব্যাপ্তি ও অর্জন কি একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট-এর সাথে যায় স্যার? আপনি ঐক্যফ্রন্ট গঠন প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে অনিবার্য যে অবহেলা বা পরিত্যক্ততার শিকার হয়েছেন এবং গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে আপনার হাতে গড়া বিকল্প ধারার হাতে ’অব্যাহতিপ্রাপ্ত’ হওয়ার মাধ্যমে সারা দেশে রাজনৈতিক বিনোদনের একটি খোরাক হয়েছেন তা কি আপনার সাথে মানানসই ? এগুলো কি আপনার প্রাপ্য ছিল ? আপনার আজকের এই পরিণতির জন্য কে দায়ী স্যার?

স্যার, বিএনপির সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০২ সালে আপনি বিএনপির প্রতিষ্টাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁর মাজারে যাননি নিরপেক্ষ থাকার জন্য। বিএনপির কোটি সমর্থক ও ভোটারদের সাথে সাথে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্যরাও এটা মেনে নিতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির সংসদীয় কমিটির মিটিং আহবান করা হয় ২১ জুন ২০০২। বিএনপির তরুণ সংসদ সদস্যরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন যে, ‘আমাদের সিনিয়ররা কোনও কথা বলছেন না তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে আমরা তরুণরাই শুধু এটা নিয়ে কথা বলছি’? তখন মাইক্রোফোনের সামনে চলে আসেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম, সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, ’¯্রষ্টার সাথে বেঈমানি করে কোনও সৃষ্টি টিকে থাকতে পারে না, আমরাও তোমাদের সাথে আছি’। স্যার, এখন এতদিন পর ভেবে দেখুনতো তিনি সঠিক বলেছিলেন কিনা?

স্যার, আপনি যখন পদত্যাগ করে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসেন তখন সাংবদিকরা আপনাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে নতুন কোনও দল করবেন কিনা। আপনি উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ’আমার বয়স কত’? মনে পড়ে স্যার? পরবর্তীতে আপনি নতুন দল গঠন করে রাজনীতিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। নাগরিক হিসাবে করতেই পারেন। কিন্তু আপনার রাজনীতিতো ছিল শুধুমাত্র বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ। আপনি বিএনপির জন্য ঘৃণাস্তম্ভ করেছিলেন। রাজনীতিতে নয়, আসলে আপনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন বিএনপি বিরোধিতায়। একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট এর জাতীয় রাজনীতি কি শুধু একটি দলের প্রতি ঘৃণা, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে? যে বিএনপি আপনার সকল দাবি পূরণ করেছিল, যে বিএনপি আপনাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে মাননীয় থেকে মহামান্য করেছিল, যে বিএনপির জন্যই আপনি এত বড় জাতীয় ব্যক্তিত্ব সেই বিএনপির বিপক্ষে আপনি কিভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন স্যার?

স্যার, বিভিন্ন কারণে পরবর্তীতে আপনি এবং বিএনপি খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। আপনি বিএনপিতে ফিরে আসবেন এমন খবরও বিভিন্ন পত্রিকায় একাধিকাবার প্রকাশিত হয়েছিল। বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে বেগম জিয়ার পাশের চেয়ারটি আপনার জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়। অবশেষে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের সাথে একাত্ম হয়ে যখন বিএনপির সাথে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন আপনার বিকল্প ধারা এক রহস্যময় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নতুন করে অবিশ্বাস শুরু হয়। আপনার পক্ষ থেকে এমন অবাস্তব প্রস্তাব ও শর্ত দেয়া হয় যা আপনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথেও যায় না, আবার বিএনপির পক্ষে মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়। বিএনপি ও ঐক্যপ্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যন্য দল ও পক্ষের কাছে আপনার উদ্দেশ্য ও ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। অবশেষে অনিবার্য পরিণতি। আপনিতো আজ ঐক্যফ্রন্টের মধ্যমণি থাকবেন। এভাবে কেন মাইনাস হতে হলো স্যার?

না, স্যার, আপনার এ রাজনৈতিক পরিণতিতে কেউ খুশি নয়। আপনি মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছিলেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় আপনার বর্তমান অবস্থার কারণে খুশি হওয়াটা অশোভন ও সংকীর্ণতা। রাজনীতিতে ট্রাজিক হিরো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে জাতীয় রাজনীতিতে আপনার প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। যে কোনও বিচারে দেশে যে কয়জন সজ্জন রাজনীতিবিদ আছেন আপনি তাদের মধ্যে অন্যতম। সবচেয়ে প্রবীণ ও রাজনীতিতে সক্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। খুব বিনয়ের সাথে বলছি, কোনও কূট-চাল, প্রতিহিংসা, একটি নির্দিষ্ট দলের উত্থান-পতনের বিবেচনায় রাজনৈতিক পদক্ষেপ, শুধুমাত্র আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এসব আপনার বয়স ও ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না স্যার।

কোনও ফ্রন্ট কিংবা জোট নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষে কিংবা বিপক্ষে নয়, আগামী পাঁচ কিংবা দশ বছরের জন্য নয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেশের সতের কোটি মানুষের আগামী বাংলাদেশের জন্য আপনার কি কোনও স্বপ্ন নেই স্যার? সেই স্বপ্ন নিয়ে শেষ একটা ডাক কি দিতে পারেন না ? বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসাবে এটাতো দেশবাসী আপনার কাছে আশা করতেই পারে। ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী থেকে বিএনপির বি চৌধুরী নয়, বিকল্পধারা, যুক্তফ্রন্ট কিংবা ঐক্যফ্রন্টের বি চৌধুরী নয়, একজন বাংলাদেশের বি চৌধুরী হওয়ার চেয়ে বড় প্রাপ্তি ও তৃিপ্ত আর কি হতে পারে স্যার?

ই-মেইল:ংযধসসড়ংযধৎরভ@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ