প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইয়ুব বাচ্চুর কষ্ট স্পর্শ করুক সবাইকে

মঞ্জুরুল আলম পান্না: এই লেখাটি যখন প্রকাশ হচ্ছে, কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চুকে মাটির কোলে শুইয়ে দেয়ার সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। কিন্তু সেই মুহুর্তে ক্ষণজন্মা এই নক্ষত্রের লালিত স্বপ্ন মানুষকে নতুন করে ভাবাতে শুরু করেছে। তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে নিজের কাছেই বারবার ধাক্কা খাচ্ছি। আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে শোকগাঁথার নতুন কী লিখবো! তাঁর জন্য নানা রঙের ভালবাসা, হৃদয় নিংড়ানো আবেগ, সাত সুরের কান্না এরই মধ্যে মানুষ প্রকাশ করে ফেলেছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া সাহিত্যিক আর সংস্কৃতিমনা মানুষগুলোর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের পর আইয়ুব বাচ্চু হলেন সম্ভবত সেই ব্যক্তি, যার জন্য দেশের মানুষের আবেগ-ভালবাসা-শ্রদ্ধা একসাথে মিশেছে চোখের জলে। কিন্তু এই যে এতো অসংখ্য মানুষের শোক, তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে ছুটে যাওয়া, সবটাই কী প্রাণের গহীন ভেতর থেকে উপচে পড়া ভালবাসার প্রকাশ? নিশ্চয় না। মানুষের মৃত্যুতে অনেকের শোক যে কেবল আনুষ্ঠানিকতা, সেই নির্মম সত্যটি লাভ রান্স ব্যান্ডের (এলআরবি) স্বপ্নবাজ মানুষটি প্রমান করে গেছেন ছোট্ট নদীর স্বচ্ছ জলধারার মতো স্পষ্ট করে।

এই উপমহাদেশের শীর্ষ গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চুর শেষ জীবনের শখ ছিলো- দেশব্যাপী গিটার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। সেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে নিজের সংগ্রহে রাখা প্রাণের চেয়ে প্রিয় গিটারগুলো পুরস্কার হিসেবে তুলে দিতে চেয়েছিলেন যাতে করে তারা প্রাণ উজাড় করে গিটার বাজাতে পারে। তরুণদেরকে এভাবে উৎসাহ দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একটা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে দীর্ঘদিনের সেই ইচ্ছে পূরণ হয়নি জাদুকরী এই সঙ্গীত শিল্পীর। কারণ প্রতিযোগিতার জন্য কোন স্পন্সর পাননি তিনি। তাই আক্ষেপে-অভিমানে নিজের গিটারগুলো বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন গত বছর। এক বুক কষ্টে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়তো বা আমার স্বপ্নটা একটু বেশিই বড় ছিল গিটার নিয়ে! গিটারগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বেশ কষ্টকর। তাই আমি ঠিক করেছি, প্রথম দিকে পাঁচটি গিটার বিক্রি করে দেব তাদের কাছে, যারা গিটার বাজায় কিংবা যারা আমার গিটারগুলো সংরক্ষণে রাখতে চায়।’ দেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আইয়ূব বাচ্চুর অকাল মৃত্যূর পর দেখলাম পাহাড় সমান টাকা-পয়সার মালিকদের অনেকে মায়াকান্না কাঁদছেন। সেই শিল্পীরই সামান্য স্বপ্নের বাস্তবায়নে পৃষ্ঠপোষকতা করতে টাকা লাগলেও মায়াকান্নায়তো আর এসবের ঝামেলা নেই। তাই কেন কাঁদবেন না! অথচ ইচ্ছে করলেই তাদের কেউ একজন সুর স্রষ্টার শেষ ইচ্ছেটি পূরণ করতে পারতেন অবলীলায়। কত টাকাই বা খরচ হতো এই আয়োজনে!

যে তরুণদের মাঝে গিটারের ছয় তারে সুরের মুর্চ্ছনায় ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সেই সুরেই তিনি তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন দেশের প্রতি অপার ভালবাসায়। তরুণদের চোখেই তিনি স্বপ্ন দেখতে চেয়েছেন নিজের দেশটাকে অসম্ভব সুন্দর করে গড়ে তোলার। আস্থা আর বিশ্বাস রেখেছেন তরুণদের ওপর। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, তরুণরাই আগামী। সমাজ ভাবনায় কাতর সৃষ্টিশীল এই মানুষটি মনে করিয়ে দিয়েছেন, এদেশের অসংখ্য উদ্যমী-মেধাবী তরুণের মধ্য থেকেই বেরিয়ে এসেছে ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মুস্তাফিজের মতো বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা। এই তরণদের মাঝ থেকেই আমরা এভারেস্ট জয়ী মুসা ইব্রাহীম, ওয়াসফিয়া নাজনীন, এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদারকে পেয়েছি বলে তাঁর ছিলো আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। তার বিশ্বাস ছিলো এই তরুণদের থেকেই বেরিয়ে আসবে একের পর এক ক্রিকেটার, গানের মানুষ, অভিনয়ের মানুষ, সবই। তরুণরা ভুল কিছু করবে, এটা তিনি মানতেই পারতেন না। বাংলাদেশকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গায় তরুণ প্রজন্মই নিয়ে যাবে বলে তাঁর ছিলো অগাধ বিশ্বাস। গণমাধ্যমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তরুণ বয়সে তাঁর নিজের বিপথগামী হওয়ার যথেষ্ট হাতছানি থাকলেও তা থেকে নিজেকে সংবরণ করেছেন কেবল মায়ের কথা ভেবে। কারণ তেমন কিছু ঘটলে মা কষ্ট পেতেন। আর মা কষ্ট পেলে দেশ কষ্ট পাবে।

একজন সুর সাধক, একজন শিল্পীর এই যে অসাধারণ এক অনুভূতি, তা স্পর্শ করুক সবাইকে। এই দেশ জ্বলে পুড়ে খাটি হোক আইয়ুব বাচ্চুদের মনন যন্ত্রণায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ