প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোম চুক্তি, আইসিসি, সৌদি আরব এবং একটি পেছনের দরজা :প্রহসন নাকি সম্ভাবনা?

আসিফুজ্জামান পৃথিল : ১৯৩৪ সালে আরব উপদ্বীপে ওসমানিয় খেলাফতের অধিনে থাকা কিংবা প্রভাবে থাকা বেশ কিছু রাজ্য একত্রিতকরণের মাধ্যমে গঠিত হয় এক নতুন রাজ্য। জাজিরাতুল আরব পরিনত হলো ব্যক্তি নামের রাজ্য সৌদি আরবে। হেজাজি এবং নেজাদিরা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইতালির সহায়তায় ওসমানিয় সেনাবাহিনী এবং জাবাল সামার আমিরাতকে পরাজিত করে। আব্দুলআজিজ ইবনে আব্দুল রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মোহাম্মদ আল সৌদ প্রতিষ্ঠিত করলেন নতুন এক রাজবংশ।

সৌদি আরবের প্রথম বাদশাহও আল সৌদ। সরাসরি পশ্চিমাদের সহায়তা এবং বদান্যতায় ক্ষমতায় এলও সৌদি রাজবংশ সবসময় এড়িয়ে গেছে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ সম্পর্কিত বিভিন্ন নীতিমালা এবং আইন। শক্তিধর পশ্চিমারাও তাদের অনেকটাই তৈলমর্দন করেছে এবং রক্ষাকবচের ভুমিকা পালন করেছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এড়িয়ে গেছে পশ্চিমারা। কিন্তু বাধ সাধলেন জামাল খাসোগজি। নিজে ‘হারিয়ে গিয়ে’ (খুন হবার নতুন প্রতিশব্দ খুব সম্ভবত হারিয়ে যাওয়া) নাড়িয়ে দিলেন ইয়ামামা প্রসাদের ভিত। সৌদি তেলেও খুব একটা কাজ হচ্ছে না। বিশ্বের তাবড় তাবড় গণমাধ্যম এ প্রতিবাদি সাংবাদিকের অন্তর্ধানকে খুব ভালোভাবে নেয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি রাজপরিবারের রক্ষাকবচ হবার চেষ্টা করেও একরকম ব্যর্থই হয়েছেন। মোটামোটি স্পষ্টভাবেই বলা যায় প্রেমিকাকে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রেখে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করে বিভৎসভাবে খুন হয়েছেন খাসোগজি। সারা বিশ্বেই চলছে এ হত্যার প্রতিবাদ। সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে সৌদি আরবের সবচাইতে ক্ষমতাশীন ব্যাক্তি ভবিষ্যত বাদশাহ মোহাম্মদ বিন সালমানকে। যিনি পশ্চিমা মিডিয়ায় এমবিএস নামে পরিচিত। অনেকের দাবী জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে সৌদি আরব এবং এমবিএস এর বিচার করা হোক। কিন্তু এ দাবী কি বাস্তবসম্মত। সত্যই কি এ কৃত্তিম রাষ্ট্রটির আইসিসি’র মাধ্যমে বিচার সম্ভব।

উত্তরটি খুব সম্ভবত না। দু:খজনক হলেও সত্য আন্তর্জাতিক সকল চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো সৌদি আরব কখনই আইসিসি’র সদস্যই ছিলো না। সৌদ পরিবার কখনই রোম ঘোষণায় স্বাক্ষর করেনি। ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই রোমে এক কূটনৈতিক সম্মেলনে স্বাক্ষরিত হয় রোম চুক্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী নরওয়ের হেগ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এবং এই ১২৩টি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের মধ্যে নেই সৌদি আরব।

তবে অনেকেই বলছেন একটি বিকল্প পথের কথা। সেজন্য আপনাকে তাকাতে হবে আরো পূর্ব দিকে। গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তথাকথিত সন্ত্রাসী হামলার ধোঁয়া তুলে এক বিশেষ অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী তামটাডোও। এর এক বছর পর জাতিসংঘের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এ ঘটনাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করে। একই সাথে এ কমিটি এ ঘটনার তদন্ত ও বিচার আইসিসি’র মাধ্যমে করার সুপারিশ করে। মিয়ানমার সাথে সাথেই এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলে তারা আইসিসি’র সদস্য নয়। তারা রোম চুক্তিকে সমর্থন করে না। তাই এ ঘটনায় তাদের বিচার করার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতটির নেই। কিন্তু এর কিছুদিন পর আইসিসি রুলিং দেয় যেহেতু বাংলাদেশ আআিিসসি’র সদস্য এবং ঘটনার সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা রয়েছে, এ ঘটনার বিচার অবশ্যই আইসিসি’র মাধ্যমে করা সম্ভব।

খাশোগজি’র হত্যাকা- ঘটেছে তুরস্কে। এ কারণে হয়তোবা একই রকম রুলিং তুরস্কের ক্ষেত্রে দেয়া যেতো। তবে দুখ্যজনক হলেও সত্য তুরস্কও রোম ঘোষণায় স্বাক্ষর করে নি। আর তুরস্কের নিজের বিরুদ্ধেও রয়েছে রাজনৈতিক বিরুদ্ধমতকে দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় রকমের অভিযোগ। তাই আপাতত তুরস্কের দোহাই দিয়ে সৌদি আরবের বিচার করার আশা সুদুর পরাহত।
শেষ একটি রাস্তা নিশ্চয়ই রয়েছে। খাসোগজি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসিত। যুক্তরাষ্ট্র আইসিসি’র সদস্য এবং রোম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী। তবে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ভাবে রোম চুক্তি মেনে চলে না। এর পরেও যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তিতে নিশ্চয়ই এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে আইসিসি। তবে এজন্য মূলত প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক মনোভাব, এবং সকল স্বার্থ আর লোভের উর্ধে ওঠার ইচ্ছে। উত্তর আমেরিকার দেশটিও নিশ্চয়ই জানে, জীবাশ্ম জ্বালানী একদিন নিশ্বেস হয়ে যাবে কিন্তু মানবিকতার কোন ক্ষয় নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ