প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীদের ভোগান্তি

কালের কণ্ঠ : অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়ও কমতি নেই। আছে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও ওষুধ-পথ্য। রোগীদের ভিড়ও উপচে পড়ার মতো। কোনো কোনো কক্ষের সামনে দীর্ঘসময় জটলা করে থাকতে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের। তবে যাঁদের অপেক্ষায় রোগীদের ভিড়; সংকট সেই চিকিৎসকদের। দিন দিন শুধু শূন্য হয় যাচ্ছে একের পর এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ। ফলে প্রতিদিনই রোগীর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তপক্ষকে আর হয়রানি হতে হচ্ছে রোগীদের। এখন এমনই চিত্র রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের। এখানে পদায়নকৃত চিকিৎসকের অর্ধেকের বেশি পদই এখন শূন্য পড়ে আছে।

গত বুধবার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ২১৯ নম্বর কক্ষের সামনে দেখা যায় মানুষের ঠাসাঠাসি অবস্থা। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে কখন ডাক পড়বে ভেতর থেকে। কক্ষের ভেতরেও ভিড় রোগীদের। এক কক্ষের ভেতরে দুটি ভাগ করে চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন একেকটি যন্ত্র দিয়ে। ভিট্রিও রেটিনা বিভাগের অধ্যাপক ডা. দীপক কান্তি নাগসহ আরো চারজন চিকিৎসক রোগীদের একদিকে পরীক্ষা করছেন, আরেক দিকে পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ বা অপারেশনের শিডিউল মেলাচ্ছেন। তুলনামূলক জটিল রোগীদের একটু বেশি সময় নিয়ে দেখতে গেলেই অপেক্ষমাণ রোগীরা তাড়া দেয় দ্রুত করার জন্য।

এক রোগীর স্বজন কানিজ সুলতানা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘সকাল ৮টায় আসছি, এখন বাজে সাড়ে ১২টা, তবু ডাক্তার পর্যন্ত পৌঁছতে পারছি না। এখানে এত রোগীর ভিড়, অথচ সেই হারে ডাক্তার নেই। এত বড় একটি হাসপাতালে যদি এমন ডাক্তার সংকট থাকে তবে কিভাবে চলবে?’

আরেক রোগী বলেন, ‘এখানে এসে শুনছি অন্য বিভাগগুলোতে মোটামুটি ডাক্তার থাকলেও রেটিনা বিভাগের অবস্থা খুবই নাজুক। যে কয়জন ডাক্তার আছেন তাঁরা রোগী দেখে কুলাতে পারছেন না। এর মধ্যে নাকি এই বিভাগ থেকে ডাক্তার অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। এটা তো কোনো কথা হতে পারে না। চক্ষুর মতো একটা বিশেষায়িত হাসপাতালে যদি রেটিনার পর্যাপ্তসংখ্যক বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র চিকিৎসক না থাকেন তাহলে রেটিনার জটিল রোগীরা কোন ভরসায় এই হাসপাতালে আসবে?’

ভিট্রিও রেটিনা বিভাগের অধ্যাপক ডা. দীপক কান্তি নাগ বলেন, ‘রোগীদের অভিযোগ খুব একটা অযৌক্তিক নয়। এখানে রোগীর ভিড় অনুসারে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যে কয়জন সিনিয়র-জুনিয়র আছে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানোর। এর পরও কুলানা যাচ্ছে না। সিনিয়র ডাক্তারদের তো শুধু আউটডোরে রোগী দেখাই নয়, এর সঙ্গে বিভিন্ন

কোর্সের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া, অপারেশন করা, বিভিন্ন পরীক্ষা, মিটিং, সেমিনার, ইনডোরে রাউন্ড দেওয়ার মতো কাজেও সময় দিতে হয়। তাই জনবল কম থাকলে রোগীরা তো হয়রানি হবেই।’ দীপক কান্তি জানান, রেটিনায় একটিমাত্র অধ্যাপক পদে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। আরেকটি সহযোগী অধ্যাপকের পদ আছে। তাঁকে ঢাকার বাইরে বদলি করে দেওয়ার কারণে সেটা শূন্য পড়ে আছে।

শুধুই কি রেটিনায় এমন জনবল সংকট? জানতে চাইলে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘অনেকগুলো পদই শূন্য পড়ে আছে। বেশ কয়েকজন সিনিয়র ডাক্তারকে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুসারে। ফলে এখানে একধরনের সংকট বা ঘাটতি তো আছেই। তবু আমরা চেষ্টা করছি কাজ চালিয়ে নেওয়ার।’

ওই কর্মকর্তা জানান, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে আইটডোরে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগীর ভিড় থাকে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে অধ্যাপকের ১০টি পদের মধ্যে চারটি শূন্য। এ ছাড়া সহযোগী অধ্যাপকের ২০টি পদের মধ্যে শূন্য পড়ে আছে ১২টি, সহকারী অধ্যাপকের ২১টি পদের মধ্যে ১৫টিই শূন্য, তিনটি আবাসিক সার্জনের একটি শূন্য এবং আরেকটিতে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। চারটি সিনিয়র কনসালট্যান্টের দুটি শূন্য, একটিতে কাজ চালাচ্ছেন একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট। সাতটি জুনিয়র কনসালট্যান্টের দুটি পদ শূন্য। তবে এত শূন্যতার ধকল কিছুটা হলেও সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডিকৃত চারজন অধ্যাপক, ছয়জন সহযোগী অধ্যাপক, চারজন সহকারী অধ্যাপক ও একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট দিয়ে।

শুধু এই একটি বিশেষায়িত হাসপাতালেই নয়, ঢাকায় বা জাতীয় পর্যায়ের সব বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালেই সংকট রয়েছে চিকিৎসকের।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন জানান, তাঁর হাসপাতালে মোট চিকিৎসকের পদ ২২০টি, এর বিপরীতে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে এখন দায়িত্ব পালন করছেন মোট ১৮৫ জন চিকিৎসক। যাঁদের মধ্যে কয়েকজন আছেন সংযুক্তিতে। সব মিলিয়ে ৫০টির কাছাকাছি পদ শূন্য আছে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদুর রহমান খান  বলেন, তাঁদের হাসপাতালে ১১৬টি অনুমোদিত পদ থাকলেও এর মধ্যে ২০-২২টি পদ শূন্য আছে। এ কারণে চিকিৎসা চালাতে অনেকটাই সমস্যা হচ্ছে এবং রোগীদেরও ভোগান্তি হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

একইভাবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনবার্সন কেন্দ্র, নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল, নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউটসহ আরো কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতালে একইভাবে চিকিৎসক সংকটে বিঘ্ন ঘটছে চিকিৎসাসেবা। অনেক রোগীই হয়রানির শিকার হয়ে ছুটে যায় প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। অনেক ক্ষেত্রেই শিকার হয় প্রতারণার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, অধ্যাপক-সহযোগী অধ্যাপক পদের ক্ষেত্রে পদোন্নতিজনিত কিছুটা জটিলতা থাকে, এ ক্ষেত্রে শূন্য পদ পূরণে একটু সময়ও লাগে। সহকারী অধ্যাপকের শূন্য পদ পূরণেও আবার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ ছাড়া নতুন আরো পাঁচ-সাত হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হবে। তখন এ সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।

তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবা সারা দেশের মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই সরকার সারা দেশে অসংখ্য অবকাঠামো ও সরকারি চিকিৎসা এবং চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানেও জনবল প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঢাকার বাইরে নতুন এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ