প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মা-মেয়ের দুঃখের জীবন

কালের কন্ঠ : অজুফা খাতুনের বয়স ৫৮ বছর। ভাঙা ছনের খুপরি ঘরে শুয়ে আছেন। চোখ-মুখে কান্নার ছাপ। ২০ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। ছেলে নেই। একটি মেয়ে জীবিত। তিনিও মায়ের কাছে থাকতে পারেন না। তাঁকে পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনা ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার হুরবাড়ী গ্রামের। মেয়ে মিনারা খাতুন আশ্রয় নিয়েছেন হরিপুর গ্রামে আত্মীয় বাড়িতে। গত ২৭ আগস্ট তাঁকে পেটানো হয়েছে। এরপর আর তিনি ভয়ে গ্রামে ফিরতে পারেননি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হুরবাড়ী গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী আতরজান দুই ছেলে ও চার মেয়ে রেখে মারা গেছেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর বছরখানেক পর উসমান গনির মেয়ে অজুফা খাতুনকে বিয়ে করেন মোসলেম। অজুফার ঘরে জন্ম নেয় দুই কন্যা। বড় মেয়েটি সন্তান প্রসবের পর নবজাতকসহ মারা গেছেন। ছোট মেয়ে মিনারার বয়স যখন আড়াই বছর তখন তাদের বাবা মোসলেম মারা গেছেন। হুরবাড়ী মৌজায় ১০৮৬, ১০৮২ ও ১১৩৫ নম্বর দাগে সোয়া ৬৭ শতাংশ জমির পৈতৃক সূত্রে মালিক মিনারা।

২০১৫ সালের আগস্টে উপজেলা ভূমি অফিসের মাধ্যমে নামজারি (খারিজ) হয়েছে। এরপর জমি দখল নিতে সৎ ভাতিজা ও ভাতিজিরা নির্যাতন শুরু করে মা-মেয়ের ওপর। পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা ও সৎ ভাতিজা, ভাতিজিদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের থেকে মুক্তির আশায় গত মে মাসে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে একটি অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয়নি। গত ২৭ আগস্ট সকালে সত্ভাই শামছুল হকের ছেলে হাবিবুর রহমান (ভাতিজা) বৃদ্ধা মায়ের সামনে মেয়েটিকে নির্দয়ভাবে মারধর করে। ভাতিজা ও ভাতিজিরা মারতে মারতে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন। প্রায় দুই মাস ধরে অসহায় মিনারা দরিদ্র মামার বাড়িতে বসবাস করছেন।

গত বুধবার দুপুরে হুরবাড়ী গ্রামে গিয়ে মেয়ের কথা জানতে চাইলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন বৃদ্ধা অজুফা।

তিনি বলেন, ‘দেড় মাস অইয়া গেল মায়-জিয়েরে (মা-মেয়ে) ইচ্ছামতো মারছে। মাইরা মিনারে বাইত্বে (বাড়ি) বাইর কইরা দিছে অর হতাল (সৎ) ভাইয়ের পোলা-মাইয়ারা। বাইত আবার দেয় না, বাইত আইলে মিনারে অরা মাইরা আলাবো কইছে। এই ডরে বাইত আবার পাইতাছে না। জমিজমা দহল কইরা নিছে, আমারেও বাইত্বে বাইর কইরা দিব কইতাছে।’

কালাদহ ইউনিয়ন পরিষদের ওই গ্রামের সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী উজ্জ্বল বলেন, ‘মা-মেয়েকে সৎ ভাতিজা-ভাতিজিরা যেভাবে অত্যাচার করেছে তা অকল্পনীয়।’

সৎ ভাতিজা হাবিবুরর রহমান জমি দখল ও মারধর করার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘জমি নিয়ে সমস্যা আছে। এ কারণে জমি দখল নিয়েছি। এক বাড়িতে থাকলে মহিলাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হয়।’

বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কে বলছে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি? বাড়ির মাহিলাদের জিজ্ঞাসা করেন, কেউ যদি ইচ্ছা করে বাড়ি থেকে চলে যায়, বাড়িতে না আসে, আমি কী করব?’

মিনারা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারিয়েছি, ৯ বছর বয়সে বড় বোনকে। ছোটবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে অন্যের বাড়িতে কাজ করেছি। কাজের ফাঁকে লেখাপড়াও করেছি। পৈতৃক জমি কখনো শ্রমিক দিয়ে, আবার কখনো মাকে নিয়ে নিজেই চাষাবাদ করেছি। এসএসসি, এইচএসসি ও বিএ পাস করেছি বাড়িতে থেকেই। পরে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে সমাজকর্মে মাস্টার্স শেষ করেছি। আশা ছিল, চাকরি করব। শেষ বয়সে বৃদ্ধা মাকে সুখে-শান্তিতে রাখব। এখন বাড়িতেই থাকতে পারছি না।’

কালাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মাস্টার বলেন, ‘ভাতিজা হাবিবুর রহমান মানুষ হিসেবে ভালো না। মিনারার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ইউনিয়ন পরিষদে ডাকা হয়েছিল। সে আসেনি। মাঝেমধ্যেই মেয়েটিকে মারধর করত। জমিটুকু দখল নিয়ে মেয়েটিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।’

ফুলবাড়িয়া থানার পরিদর্শক শেখ কবিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। শিক্ষিত অসহায় মেয়েটির ওপর এমন অত্যাচার-নির্যাতন হয়ে থাকলে অতন্ত দুঃখজনক ঘটনা। খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত