প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধানমণ্ডির সেই উন্মুক্ত স্থানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন

সমকাল : গণপূর্ত বিভাগের নকশায় প্রথমে জায়গাটি ছিল দৃষ্টিনন্দন উন্মুক্ত স্থান। এই উন্মুক্ত স্থানটিকে পরে তেলের পাম্প হিসেবে ব্যবহারের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। সরকারি এ জায়গাটিতে এখন তৈরি হচ্ছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন।

প্রায় পৌনে এক বিঘা আয়তনের ওই জায়গাটির অবস্থান সায়েন্স ল্যাবরেটরি সংলগ্ন গ্রিন রোড, ধানমণ্ডি ৩ নম্বর রোড ও মিরপুর রোডের সংযোগস্থলে ল্যাবএইড হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে।

পূর্ত বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে এখানে বহুতল ভবন করা হচ্ছে। এখানে বহুতল ভবন চালু হলে নগরবাসীর ভোগান্তি ব্যাপক আকার ধারণ করবে। স্বাভাবিকভাবেই বহুতল ভবন তৈরি হলে সেখানে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করবে। পাঁচটি সড়কের সংযোগস্থলে জায়গাটির অবস্থান হওয়ায় সেখানে যানজটও তীব্র আকার ধারণ করবে।

এমনিতেই ওই সংযোগস্থলে যানজট লেগে থাকে, তার ওপর সেখানে বহুতল ভবন উঠলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। উন্মুক্ত স্থানের তীব্র সংকটের এই রাজধানীতে দৃষ্টিনন্দন সবুজভূমি আরও কমে যাবে।

জানা যায়, পঞ্চাশের দশকে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা তৈরির সময় গণপূর্ত বিভাগ প্রথমে পৌনে এক বিঘা আয়তনের ওই জায়গাটিকে দৃষ্টিনন্দন উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণের জন্য লেআউট প্ল্যানে উল্লেখ করে। ১৯৬২ সালে সেখানে একটি তেলের পাম্প করার জন্য আবেদন করেন ধানমণ্ডির ৩০ নম্বর সড়কের ৭০৮ নম্বর রোডের জনৈক শফিকুর রহমান। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন আশপাশে কোনো জ্বালানি তেলের পাম্প না থাকায় ধানমণ্ডিবাসীকে বিপাকে পড়তে হয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পূর্ত বিভাগ তার নামে ওই জমির ১৩ দশমিক ৮ কাঠা ইজারা দেয়। তবে শর্ত দেওয়া হয় যে জায়গাটি কেবল তেলের পাম্প হিসেবেই ব্যবহার করা যাবে। অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি জায়গাটি তার স্ত্রী হাসিনা রহমানের নামে দলিল করেন। পরে ওয়ারিশ সূত্রে তাদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে যথাক্রমে আহমেদ ফয়জুর রহমান, রেজাউর রহমান, ফৌজিয়া কবির, জিয়া ইয়ামিন ও রিয়া রহমানের নামে জায়গাটির নামজারি হয়।

২০১০ সালে সরকার গ্রিন রোড, ধানমণ্ডির ২ নম্বর রোড ও সাতমসজিদ রোডের (পুরনো ২৭ নম্বর রোড) দু’পাশের আবাসিক ভবনগুলোকে বাণিজ্যিক হিসেবে রূপান্তরের সুযোগ দেয়। প্লটের বাজারমূল্যের ২৫ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে এটা করার নীতিমালা ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ডা. এ এফ এম মাসুদ নামের এক ব্যক্তি একটি রিট মামলা করলে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন স্থগিত হয়ে যায়। আদালতের স্থগিতাদেশ ও লিজ বরাদ্দের মূল শর্তকে অবজ্ঞা করে পূর্ত বিভাগ ওই প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

২০১৪ সালের ৪ মার্চ গণপূর্ত বিভাগের কার্য সহকারী শফিকুল ইসলাম, ধানমণ্ডি উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী-১ কামাল হোসেন ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবী বাণিজ্যিক হিসেবে রূপান্তরের পক্ষে মত দেন। বাণিজ্যিকে রূপান্তরের পর তারা প্লটটি বিআরবি কেবল কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করে দেন। বিআরবি কেবল সেখানে ১৬তলা বাণিজ্যিক ভবন তৈরির কাজ শুরু করেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মেসার্স গ্রিন ভিউ ফিলিং স্টেশনটির জায়গাটিতে চারপাশে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে ভেতরে নির্মাণকাজ শুরু করেছে বিআরবি। তেলের পাম্পটিরও কোনো অস্তিত্ব ভেতরে নেই। এ প্রসঙ্গে দলিলে উল্লিখিত মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত শফিউর রহমানকে তার ধানমণ্ডির ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায়নি। ওই ভবনের বাসিন্দারাও কেউ শফিকুর রহমান নামের কাউকে চেনেন না। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশদের নামে নামজারি হওয়া গুলশানের ৫৫ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাসায় গিয়ে দেখা যায় একটি বহুতল ভবন। সেখানেও ওয়ারিশদের কেউ থাকেন না। তবে ওই ভবনের বাসিন্দাদের ধারণা, তারা হয়তো বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশ-বিদেশে থাকতে পারেন।

তেলের পাম্পের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ব্যবহারের পক্ষে মত দেওয়া গণপূর্ত বিভাগের ধানমণ্ডি এলাকার উপসহকারী প্রকৌশলীও এখন ধানমণ্ডিতে কর্মরত নেই। কয়েক বছর আগে তিনি সাভারে বদলি হয়ে যান। টেলিফোনে তিনি জানান, এটা তো কয়েক বছর আগের ঘটনা। তবে জায়গাটি গ্রিন রোডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে তিনি বাণিজ্যিক করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কারণ, তখন সরকার গ্রিন রোডের দু’পাশের প্লটকে ‘কনভার্সন ফি’ দিয়ে বাণিজ্যিকে রূপান্তরের সুযোগ দিয়েছিল। সেই সুবাদে তিনি মত দিয়েছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, বহু রাস্তার সংযোগস্থলে বহুতল ভবন উঠলে ওখানে যানজট বাড়বে। এলাকাবাসীরও সমস্যা হবে।

গণপূর্ত বিভাগের ঢাকা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক হোসেনও ভোগান্তি বাড়ার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, কয়েকজন বাণিজ্যিক ব্যবহারের মতামত দিলেও আরও অনেকেই তো ফাইলটি দেখেছেন। তাহলে তারা কেন আপত্তি দিলেন না। রাজউকই বা কেন নকশার অনুমোদন দিল। রাজউকও তো নকশা বাতিল করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বিআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের কেউ পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাননি। তবে তাদের দাবি, নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেই তারা সবকিছু করছেন।

তবে এলাকাবাসী জানান, ওই প্লটের পাশেই জনপ্রিয় ল্যাবএইড হাসপাতাল থাকার কারণে সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহনের সমাবেশ ঘটে। এর পাশে আরেকটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবন উঠলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তারা চান পেট্রোল পাম্পটি বাদ দিয়ে বাকি জায়গা প্রয়োজনে সরকার অধিগ্রহণ করে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করুক।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান  বলেন, ওই জায়গাটি সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিছু দিন হলো সেখানে তেলের পাম্পটি তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। যেখানে পাঁচটি সড়কের সংযোগস্থল। এ ছাড়া অনেক গাড়িও ইউটার্ন নেয়। এ রকম জায়গায় কারা তেলের পাম্পের জন্য লিজ দিল সেটার তদন্ত হওয়া উচিত। রাজধানীতে সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানের অভাব থাকায় সেটাকে উন্মুক্ত স্থান হিসেবেই রাখা প্রয়োজন। ওই জায়গাটি এমন যে সেখানে একতলা ভবন হওয়াও উচিত না। যাদের কারণে এসব কাহিনী ঘটল সেটা তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।

এদিকে ওই প্লটটি পাম্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট এক দশমিক ২ কাঠা জায়গা রয়ে যায়। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) সড়কদ্বীপটির সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব দেয় হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিল নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার রাফেয়া আবেদীন অর্ধকোটি টাকা খরচ করে সেটার সৌন্দর্যবর্ধন করেন। সড়কদ্বীপটির নাম দেন ‘অর্ঘ’। কয়েকটি বিলবোর্ড স্থাপন করে তার ব্যয় নির্বাহ করছিলেন তিনি। কিন্তু বিআরবি কর্তৃপক্ষ প্লটটি কেনার পর ওই সড়কদ্বীপটিও নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তারা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সড়কদ্বীপটির আধুনিকায়নের জন্য একটি নকশাও জমা দেন।

রাফেয়া আবেদীন বলেন, সড়কদ্বীপটি সজ্জিত করে দুটি বিলবোর্ড বসিয়ে তিনি বিনিয়োগের টাকা তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ডিএসসিসি সেই বিলবোর্ড দুটিও কেটে নিয়ে গেছে। ফলে তিনি ব্যাপকভাবে আর্থিক লোকসানে পড়েছেন। ওই জায়গাটি বিআরবিকে দিলে পুরোটাই তাদের দখলে চলে যাবে। সবুজে ঘেরা সড়কদ্বীপটিও থাকবে না। সবুজ ধ্বংস করে তারা ইট-কংক্রিটের জঞ্জাল তৈরি করবে।

দেখা গেছে, বিদ্যমান সড়কদ্বীপটি এখনও বেশ দৃষ্টিনন্দন। এর মধ্যে রয়েছে ছোট্ট একটি কৃত্রিম লেক। সেটাতে আছে নানান জলজ উদ্ভিদ। শামুক, ঝিনুক, ছোট মাছ। আছে কয়েকটি হাঁসও। কৃত্রিম পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছে কয়েকটি দোয়েল-চড়াইও। এরই মধ্যে আছে কিছু সবুজ বৃক্ষ ও লতাগুল্মও। এ পথে চলতে গেলে এসব যে কারোরই নজর কাড়বে।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও বিউটিফিকেশন সেলের প্রধান ইউসুফ আলী সরদার বলেন, হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিলকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ সময়ে ডিএসসিসিকে যে পরিমাণ ট্যাক্স পরিশোধের কথা, সেটাও তারা করেনি। পরে বিআরবি গ্রুপ সড়কদ্বীপের সৌন্দর্যবর্ধনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। তারা সেই ডিজাইনটি থ্রিডি ফরম্যাটে দেখিয়েছে। বিউটিফিকেশন সেলের সদস্যদের সেটা পছন্দ হয়েছে। বিআরবির নকশা বর্তমান উদ্যানের চেয়ে অনেক ভালো বলে সবাই মত দিয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ