প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ছোট দলের বড় কদর

সমকাল : সারাবছর গুরুত্ব না থাকলেও নির্বাচনের আগে নামসর্বস্ব ছোটগুলোকেও কাছে টানছে বড় দলগুলো। ছোট দলগুলোর এখন বড় কদর। আদর্শিক মিল না থাকলেও ছোট দলগুলো এখন বড় দলের জোটে ভেড়ার চেষ্টা করছে। বড় দলগুলোও তাদের কাছে টানার চেষ্টা করছে। জোটের টানাটানিতে ভাঙাগড়া চলছে ছোট দলে। ভোটের মাঠে অস্তিত্ব নেই, এমন দল মিলে নতুন জোট গড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলেছেন, নীতি-আদর্শের বালাই নেই এই ভাঙাগড়ায়। সবার লক্ষ্য ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া। সংসদে প্রবেশের রাস্তা প্রশস্ত করা।

দেশে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৩৯। অনিবন্ধিত দল আছে দেড় শতাধিক। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা আটটি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে সমসংখ্যক নিবন্ধিত দল রয়েছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতৃত্বাধীন ৫৮ দলের জোটে নিবন্ধিত দল আছে তিনটি। সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বাধীন আট দলের জোটে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা তিন। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বহুল আলোচিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা মাত্র দুটি।

নিবন্ধিত বাকি ১৫ দলের মধ্যে সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে একমাত্র বিএনএফের। ইসলামী আন্দোলন, বিকল্পধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, জাকের পার্টি ও ইসলামিক ফ্রন্টের কার্যক্রম চোখে পড়লেও বাকি দলগুলোর অস্তিত্ব কাগুজে। কিন্তু এসব দলের নেতারাও এমপি-মন্ত্রী হতে ছুটছেন বড় দলের জোটে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোটে থাকলে এমপি হওয়ার সুযোগ বেশি, তাই সেদিকেই ঝোঁক বেশি।

নিজেদের জোট অটুট রেখে অপরের ঐক্য ভাঙতে বড় দুই দল সচেষ্ট বলেও অভিযোগ রয়েছে। জোটের টানাপড়েনে সম্প্রতি ভেঙেছে বিকল্পধারা। গোড়া থেকে সঙ্গে থেকেও ড, কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়নি সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা।

গতকাল শুক্রবার বিকল্পধারার একাংশের কয়েক নেতা দলের প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ‘বহিস্কার’ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বিকল্পধারা ভাঙনের জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো কতটা দেউলিয়াপনার পরিচয় দিচ্ছে, এ ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত।

ক’দিন আগে ভেঙেছে বাংলাদেশ ন্যাপ। দলটি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়লে ন্যাপের একাংশ সভাপতি জেবেল রহমান গাণিকে বহিস্কার করে ২০ দলে থেকে যায়। এনডিপিরও একই পরিণতি হয়েছে। একাংশ ২০ দলে রয়ে গেছে। ন্যাপ ও এনডিপির ২০ দল ত্যাগ করা অংশ ক্ষমতাসীন জোটের দিকে যেতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

দল দুটি ২০ দল ছেড়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করেন জোট সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, সরকার বহু আগে থেকেই চেষ্টা করছে জোটে ফাটল ধরাতে। কিন্তু পারেনি। ভোটের আগে কয়েক নেতাকে টোপ দিয়ে ভাগিয়ে নিয়েছে, যা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ। বিকল্পধারা, ন্যাপ ও এনডিপির ভাঙনে বিএনপির হাত নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে জোট সম্প্রসারণ সম্পর্কে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, অনেকেই তাদের সঙ্গে আসতে চান। তবে কাকে কাকে নেওয়া হবে, এ সিদ্ধান্ত নেবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার মতে, জোট হয় সমমনাদের সঙ্গে। ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক ১৪ দলে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভেড়ার চেষ্টা সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, যে কেউ আসতে চাইতে পারে। তবে নেওয়া হবে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক দলগুলোকেই। সাম্প্রদায়িক কোনো দলের স্থান হবে না আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন এ জোটে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে ভাঙনে আওয়ামী লীগের হাত রয়েছে। এ অভিযোগের জবাবে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট এমনিতেই শক্তিশালী। বিএনপির জোট ভাঙার প্রয়োজন নেই। বিএনপি নিজেই ভেঙে যাচ্ছে। উদ্ধার পেতে ড. কামাল হোসেনের ওপর ভর করেছে। বিএনপি বলতে পর্যন্ত পারছে না নির্বাচনে জয়ী হলে কে তাদের প্রধানমন্ত্রী হবেন। এমন একটি দলের জোটকে ভাঙার কী প্রয়োজন আওয়ামী লীগের!

ছোট দলগুলোর এ ভাঙাগড়াকে সুবিধাবাদী রাজনীতির নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেছেন, রাজনীতিতে জোট গঠন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যা হচ্ছে, তা অস্বাভাবিক। নীতি-আদর্শে কোনো মিল নেই, তবু জোট হচ্ছে। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দাবিদার দল ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে জোটে যাচ্ছে। আবার ধর্মভিত্তিক দল যাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দাবিদার দলের সঙ্গে।

কেন এমন অনৈতিক আদর্শবিহীন জোট হচ্ছে? এর উত্তরে আবুল মকসুদ বলেন, এককভাবে নির্বাচনে জেতার ক্ষমতা রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। তারপরও ছোট দলগুলোকে কাছে টানার কারণ, প্রতিপক্ষকে দেখানো যে, তার সঙ্গে অনেক দল রয়েছে। পরগাছার মতো ছোট দলগুলো নীতি-আদর্শের মিল না থাকলেও জোটে যাচ্ছে সুবিধা পাওয়ার আশায়। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার লোভে। এমপি-মন্ত্রী হতে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ইসলামী ঐক্যজোট, জাকের পার্টি ও ইসলামিক ফ্রন্ট যেতে চাইছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, জাকের পার্টি ও ইসলামিক ফ্রন্ট নেতারা তার সঙ্গে দেখা করে আওয়ামী লীগের জোটে যোগ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। সাতটি বাম দলের জোট, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন বিএনএও ক্ষমতাসীন জোটে আসতে চায়। আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে অংশ নিতে চায় তারা।

গত বছর বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টে ছিল বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। পরে দলটি যুক্তফ্রন্ট ছেড়ে দেয়। সম্প্রতি ওবায়দুল কাদের ও কাদের সিদ্দিকীর মধ্যে বৈঠক হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন রয়েছে, আওয়ামী লীগের জোটে যোগ দিতে পারে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। এ বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, তিনি চেয়েছিলেন একটি অর্থবহ জাতীয় ঐক্য, যা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে সমদূরত্বে থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। তাই জন্মলগ্নেই যুক্তফ্রন্ট ত্যাগ করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, তার জন্ম আওয়ামী লীগে। তার নেতা বঙ্গবন্ধু। তবে এই সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সিদ্ধান্ত এককভাবে চলা। ভবিষ্যতে জোট হবে কি-না তা নির্ভর করছে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।

২০০৬ সালে বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ওই বছরই যোগ দেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। এক বছরের মাথায় মহাজোট ছাড়ে দলটি। ২০১২ সালে যোগ দেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ তিনি।

২০১৩ সালে এলডিপিকে ‘নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে’ নিতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ। সম্প্রতি অলি আহমদকে টেলিফোন করেন ওবায়দুল কাদের। অলি আহমদ  বলেন, কুমিল্লায় তার গাড়িতে হামলা হয়েছিল। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করতে টেলিফোন করেছিলেন ওবায়দুল কাদের। রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি-না তা বলতে চাননি অলি আহমদ।

সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়ে চমক দেখিয়েছে চরমোনাইর পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। এ দলটি কোনো জোটে নেই। তাদের কাছে টানতে চাইছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, তিন দলের দিক থেকেই তাদের প্রস্তাব রয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সঙ্গে তাদের একটি সমঝোতা রয়েছে। এ কারণে গত আট বছরে নির্বিঘ্নে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাতে পেরেছেন তারা। ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী জানিয়েছেন, তাদের কাছে জোটের প্রস্তাব রয়েছে। কারও সঙ্গে জোট হবে কি-না সে সিদ্ধান্ত নেবে দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।

জাপার নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটে দলের সংখ্যা ৫৮। সম্প্রতি একটি দল এ জোট ছেড়ে যোগ দিয়েছে ‘ইসলামী গণতান্ত্রিক জোটে’। জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঢাউস জোট করলেও তার দল এককভাবে নির্বাচন করবে, এমন সম্ভাবনা কম। বিএনপি ভোটে অংশ নিলে দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করবে বলে জানিয়েছেন এরশাদ। বিএনপি না এলে এককভাবে ভোট করবেন। তবে গুঞ্জন রয়েছে ভোটের হাওয়া যদি বিএনপির দিকে বেশি থাকে তাহলে সেদিকেও পাড়ি জমানোর চেষ্টা করতে পারেন এরশাদ। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা অবশ্য মনে করেন, নানা ‘জটিল’ কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গ ত্যাগ করা এরশাদের জন্য খুবই কঠিন হবে।

দলটির সাম্প্রতিক যৌথ সভাতেও সিদ্ধান্ত হয়েছে ক্ষমতায় যেতে পারে যে দল তার সঙ্গে থাকবে জাপা। জাপার মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন বলেন, কী হবে তা নির্ভর করছে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর। দলের চেয়ারম্যানকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন কার সঙ্গে জোট হবে।

নানা নাটকীয়তার পর রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপার একাংশ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরশাদ বিএনপিবিহীন সেই নির্বাচন থেকে কৌশলে দূরে থাকলেও এবার তিনি আওয়ামী লীগের দিকেই ঝুঁকে আছেন। ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলের কারণে আলোচিত সমালোচিত এরশাদের হাতে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বলেই নাটকীয়তার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তরীকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি ও সরকারপন্থি ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫টি নামসর্বস্ব দল ‘ইসলামী গণতান্ত্রিক জোট’ গঠন করেছে। এম এ আউয়াল বলেন, তাদের সোজাসাপ্টা অবস্থান আওয়ামী লীগের জোটে যেতে চান। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করতে চান।

গত জুলাইয়ে সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ আটটি বামপন্থি দল নিয়ে গঠিত হয় ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’। এ জোটের একাংশ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। গত জুলাইয়ে সিপিবি কার্যালয়ে দলটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে বৈঠক করেন ওবায়দুল কাদের। বাম জোট ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে যাবে এমন সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।