প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চোখের জল মুছতে মুছতে শেষ শ্রদ্ধায় সহকর্মী, ভক্ত-অনুরাগীরা

শিমুল মাহমুদ: ‘সেই তুমি কেনো এতো অচেনা হলে’ সেই অচেনা মানুষ গুলো আজ চেনা মানুষ হয়ে এসেছেন সংগীত জগতে কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। এসেছেন তার সহ কর্মীরাও।

প্রিয় শিল্পীকে ভালোবাসা জানানোর জন্য দুর দুরান্ত থেকে আসে তার ভক্ত- অনুরাগীরা। ছোট ছোট ফুল হাতে দীর্ঘ লাইনে থাকা ভক্ত-অনুরাগীরা চোখে কোনে জমে থাকা অশ্রুতে প্রকাশ পায় প্রিয় শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা। অনেক কেই চোখের জল মুছতে মুছতে শেষ শ্রদ্ধা জানায় প্রিয় শিল্পীকে।

শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হয় আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ।

শ্রদ্ধা জানাতে এসে শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, শতকোটি মানুষের একটি প্রশ্ন ‘তুমি ছাড়া কেউ বুঝে না, তুমি ছাড়া আমি কত অসহায়’ আজকে আমাদের অসহায় করে সে উড়াল দিল।

শিল্পীদের সচেতন হওয়া খুব বেশী প্রয়োজন হয়ে পরেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাচ্চু হৃদ রোগে ভুগছেন অনেক দিন ধরে। তার শরীর ভালো যাচ্ছিল না। অথচ গতকাল রংপুরে শো করে সারা রাতে ফিরলেন, আবার সকালে হার্টএটাক করে চলে গেলেন। এতা অসময়ে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না।

সংগীত সমন্বয় সংগঠন পরিষদের এক সদস্য বলেন, প্রকৃতি কারো কোন কথা শোনে না। তার কোন বাঁধা নেই। জাতি আজ অনেক কিছুই হারিয়েছে। আমরা অনুরোধ থাকবে তার গান গুলো যেনো হাজার হাজার বছর বেচেঁ থাকে।

আইয়ুব বাচ্চুর প্রিয় বন্ধুরা বলছিলেন, একজন শিল্পী তার সত্তায় বেঁচে থাকে। তার সত্তা, তার গান, তার সংগীত। তবে এই সত্তার পরিপূর্ন পারিশ্রমিক, পরিপূর্ন প্রাপ্তি, তার কাঁধে এসে বসে কিনা সেটা জানার বিষয়।

তারা জানান,শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও কনসার্টে গান গাওয়া যখন জীবিকা এবং জীবনের তাগিদে অত্যন্ত জরুরী হয়ে উঠে । তখনতো তার অপমৃত্যু হবেই।

প্রিয় শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা এক ভক্ত জানায়, আজ কথা একটাই ‘সেই তুমি কেন অচেনা হলে’ তিনি আমাদের চেনা মানুষ ছিলেন,তিনি এখন অচেনা জগতে, অচেনা পরিবেশে, যে জগত সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। এখন তিনি কি অবস্থায় আছেন, কি করছেন, এই বিষয় গুলোই আমাদের কাছে বড় হয়ে দাড়িয়েছে।

গোলাপ হাতে নিয়ে শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর এক স্বজন জানান, গত কোরবানী ঈদে তিনি বাড়িতে গিয়েছিলেন। তিনটা গরু কুরবানী দিয়েছে। নামাজ শেষে মায়ের কবর পাশে দাড়িয়ে তিনি এক ঘন্টা যাবৎ মোনাজাত করেন, অনেক কান্নাও করছিলেন।
‘আর কত এভাবে আমাকে কাদাঁবে, আরো বেশি কাদাঁলে উড়াল দেবো আকাশে’ গান গেয়ে এক ভক্ত-অনুরাগী বলেন, আইয়ুব বাচ্চু আজ আকাশে উড়াল দিয়েছেন, তিনি আজ আমাদের ধরা ছোয়ার বাহিরে। মনের কথা গুলো তার গানের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করায় তিনি আমাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।

সংগীত ভুবন থেকে পরপারে পারি জমানো এই শিল্পীর এক ভক্ত সরকারের কাছে কয়েটি দাবিও জানিয়েছেন, তিনি বলেন, বাচ্চু ভাই যে গান গুলো করে যেতে পারেনি, সে গান গুলো যেনো এলআরভি টিমে যারা আছেন তারা যেনো করেন। এবং তার সংরক্ষনে থাকা ৬৭ টি গিটার। যে গিটারে তার স্পর্শ ছিল সঙ্গতি ছিল। সে গিটার গুলো সংরক্ষনের ব্যবস্থা করেন এবং তার ইচ্ছা গুলো ছিল যেনো সরকার পূরণ করেন।

বরিশাল থেকে আসা এক ভক্ত- অনুরাগী বলেন, বাচ্ছু ভাইয়ের গান শুধু যে তার জীবনের থেকে নেওয়া তা নয়। তার গানের চরন গুলো বাংলার প্রতিটা মানুষের জীবনের কথা বলেছে। হারানো বাবার কথার মনে করিয়েছে। পুরোনো প্রেমিকাকে মনে করিয়ে দিয়েছে।

অসুস্থ আইয়ুব বাচ্চুর খুব কাছের এক বন্ধু জানান, কিছুদিন আগে হার্টের বাইপাস করলাম, তখন বাচ্চু ভাই আমাকে বললো, তুমি বাইপাস করলা, আমি হার্টে রিং পড়লাম, আমরা দুজনে একই সঙ্গে বেঁচে থাকবো। কিন্তু আজ তিনি চলে গেলেন। তার তো যাওয়ার সময় হয়নি। তবুও তিনি চলে গেলেন।

কিংবদন্তী এই শিল্পীর ‘বাঁচাও বিধাতা’গানের গীতিকার বলেন,৯৮ সালে যখন দেশে চার দিকে বন্যা তখন বাচ্চু ভাই বন্যার উপরে লিখা একটা গান চাই। আমিও খুব উৎসাহ নিয়ে বাঁচাও বিধাতা গানটালিখি। আমার লিখা, গগনের তারাগুলো, পাল তোলা নায়ে, মুসলেম ভাণ্ডারী, কবরের বিষয়ে লিখা ‘বান্দা’ গানটাও তিনি গেয়েছেন। আমার সর্বশেষ লিখা ‘গোর খোদক’ নামে গানটি তিনি গেয়ে যেতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, আমি গাইতে পারবো না আমার খুব ভয় লাগে।

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আইয়ুব বাচ্চুকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, ফোয়াদ নাসের বাবু, রফিকুল আলম, ফকির আলমগীর, কাজী হাবলু, প্রিন্স মাহমুদ, মানাম আহমেদ, শাফিন আহমেদ, হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল, শাহেদ, শফিক তুহিন, তানজীর তুহীন, জয় শাহরিয়ার, ডিরকস্টার শুভ, অভিনয়শিল্পী সূবর্ণা মুস্তফা, ফয়সাল, লুৎফর রহমান জর্জ, শতাব্দী ওয়াদুদ, নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলুসহ অনেকে। ছিলেন এলআরবি’র সদস্যরাসহ দেশের বেশিরভাগ ব্যান্ড সদস্যরা।

এরপরে বেলা সাড়ে ১২টায় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় ঈদগাহ মাঠে। সেখানে বাদ জুমা প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় আইয়ুব বাচ্চুর স্টুডিও মগবাজারের এবি কিচেন প্রাঙ্গণে। সেখানে কিছুক্ষণ রাখার পর নিয়ে যাওয়ার হয় চ্যানেল আই কার্যালয়ে। এখানে ২য় জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে।

শুক্রবার মধ্যরাতে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা আইয়ুব বাচ্চুর ছেলে ও মেয়ে। এরপর কাল শনিবার সকাল নাগাদ মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে চট্টগ্রামের এনায়েত বাজারে, আইয়ুব বাচ্চুর জন্মস্থানে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করার কথা রয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ