প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসছে ভোট, প্রস্তুত ইসি

সমকাল : একাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা এবং ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারণ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যদিও নির্বাচনকালীন সরকারে কে থাকবে- তা নিয়ে বিভক্ত দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে বর্তমান কমিশনের মধ্যেও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায়। তারা আশা করে, সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। কারণ বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব দলের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। পৃথক বক্তব্যে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং ভারতীয় হাইকমিশনারও আশা প্রকাশ করেছেন স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলে বিদ্যমান কাঠামোতেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তৎকালীন রকিবউদ্দীন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে তাদের নানা দাবি-দাওয়া থাকলেও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এখনও আসেনি। উল্টো এবার বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, আন্দোলন প্রস্তুতির পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে।

বিগত রকিব কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আবদুল মোবারক আলাপকালে বলেন, বিদ্যমান কাঠামোতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। তবে তার জন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে আচরণবিধি মানতে বাধ্য করতে ইসিকে কঠোর হতে হবে।

বিগত ১০ম সংসদের তুলনায় এবার অনেক বেশি দল ভোটে অংশ নেবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে আবদুল মোবারক বলেন, ওই নির্বাচনে নিবন্ধিত ৪০টি দলের মধ্যে ১২টি দল অংশ নিলেও ২৮টি দল বর্জন করে। অনেক ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সেই পথে হাঁটবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই নির্বাচন অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক হবে এবং ভোটার উপস্থিতিও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

৩০ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে সংসদ নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগে ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবে কে. এম. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি। এর আগে আগামী রোববার কমিশন সভা বসতে যাচ্ছে। সেখানে আইন সংস্কারসহ বেশকিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। সিইসি কে. এম. নুরুল হুদা এরই মধ্যে সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধনের কথা জানিয়েছেন। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও সংশোধন বিষয়ে সরকারের তরফে এখনও কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। গত ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রেখে আরপিও সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয় ইসি, যা এখন আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

ইসি-সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন, আগামী সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরপিও সংশোধনের প্রস্তুাবটি উঠতে পারে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে বিষয়টি সংসদের বিবেচনার জন্য উঠবে। রোববার থেকে ১০ম সংসদের শেষ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, সর্বোচ্চ ৫ কার্যদিবসেই শেষ হতে পারে এবারের অধিবেশন। আরপিও সংশোধন বিষয়ে সিদ্ধান্ত না পেলে আচরণবিধি সংশোধনের কাজে হাত দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

তফসিল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে :নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দলকে এ কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন ভবনে ইইউর সঙ্গে ইসির বৈঠক শেষে ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

ইউ রাষ্টদূত ইসিতে :বৈঠক শেষে ইইউ রাষ্ট্রদূত রেনসে তেরিং সাংবাদিকদের বলেন, আগামী নভেম্বরের শেষে ইইউ নির্বাচন বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ ছোট দল বাংলাদেশে পাঠাবে। ওই দল কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করবে। এই দলটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভোটের প্রাক-প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি বলেন, ইইউ বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচন চায়। তারা আশা করে, সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। কারণ সব দলের অংশগ্রহণ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বৈঠক শেষে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ইইউর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইইউ প্রত্যাশা করে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। নির্বাচন কমিশন তাদেরকে আশ্বস্ত করেছে- আইনের মধ্যে থেকে নির্বাচন কমিশনের যতুটুকু ক্ষমতা রয়েছে তা প্রয়োগ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন করা হবে।

সচিব বলেন, ইইউ জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার বিষয়ে জানতে চেয়েছে। ইসি বলেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে স্বল্প পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনি ভিত্তি পেলে সংসদ নির্বাচনে দৈব চয়নের ভিত্তিতে স্বল্প পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ইইউ প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষক, জনবল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে. এম. নুরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ও সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ অংশ নেন।

সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র; ভারতও আশাবাদী :এদিকে গতকাল বনানীর সেতু ভবনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট ও ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে তিনি আগামী মাসে বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছেন। তার আগে বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে। সাক্ষাতে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা বলেননি বার্নিকাট। তবে আগামী নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের কথা জানান মার্কিন দূত। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়।

পরে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে আসন্ন নির্বাচনে ভারতের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেন হর্ষবর্ধন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে ভারত আশা করে, একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। প্রশ্নোত্তরে তিনি জানান, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে কোনো নাশকতার আশঙ্কা করছে না ভারত। প্রতিবেশী দেশটি আশাবাদী, সবার অংশগ্রহণে সুন্দর নির্বাচন হবে।

প্রভাবশালী দুই দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ভারতের চাওয়া- বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যহত থাকুক। তারা বাংলাদেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করে। নির্বাচনে জনগণের মত প্রতিফলিত হবে- গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত তা প্রত্যাশা করে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বার্নিকাটও নির্বাচনের সহায়ক পরিবেশের কথা বলেছেন।

তফসিলের সিদ্ধান্তে নেই মাহবুব তালুকদার :নির্বাচনের তফসিল চূড়ান্তের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারকে ছাড়াই। কে. এম. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের একাধিক সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ এবং একাধিকবার সভা বর্জন করে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত-সমালোচিত হয়ে উঠেছেন মাহবুব তালুকদার। আগামী ২০ অক্টোবর থেকে তিনি ২০ দিনের সফরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। এমনকি তফসিলের আগে রেওয়াজ অনুযায়ী কমিশন সদস্যদের বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে পারছেন না তিনি।

এ বিষয়ে মাহবুব তালুকদার জানান, পূর্বনির্ধারিত পারিবারিক সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। তফসিল চূড়ান্ত হলেও ঘোষণার আগেই তিনি দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন বলে জানান। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কমিশনের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, পরে তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন।

ভোট আয়োজনে ইসির কর্মযজ্ঞ :ইসি-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল সংশ্নিষ্ট ফরম ও প্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্য মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে। নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত ম্যানুয়েল ছাপার কাজ ৫ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান জানিয়েছেন, তফসিলের আগে মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপত্র, ভোটার তালিকার সিডিসহ সব ধরনের সামগ্রী পাঠানো হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে ভোট করতে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সবকিছু প্রস্তুত থাকবে।

ইতিমধ্যে ভোট সংক্রান্ত ইসি সচিবালয়ের ‘একাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে (প্রাক নির্বাচন ও তফসিল পূর্ববর্তী) প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা’ এবং ‘(তফসিল ঘোষণার পর) নির্বাচন পরিচালনার জন্য কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সূচি’ সংক্রান্ত চেকলিস্ট কমিশন অনুমোদন করেছে। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, ৩০ অক্টোবরের মধ্যে ভোটের তফসিল নিয়ে কমিশনে বৈঠক হবে। এর পর যে কোনোদিন তফসিল ঘোষণা করবে ইসি। ভোট সামনে রেখে সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

ইতিমধ্যে ভোট প্রস্তুতির সার্বিক পরিস্থিতি গত সোমবার কমিশনকে জানিয়েছে ইসি সচিবালয়। মঙ্গলবার ইসি সচিবালয়সহ আঞ্চলিক, জেলা পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাসহ শতাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন সিইসি।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছরের ১৬ জুলাই রোডম্যাপ ঘোষণা করে ইসি। পরে তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটের ফল প্রকাশ পর্যন্ত আরেকটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন কাজে সহায়তায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি; ইসির অধীনে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ফল ঘোষণা পর্যন্ত বদলি না করা; স্থানীয় সরকারের সহায়তা; আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা; মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে ঋণখেলাপিরর তথ্য পেতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি তফসিল ঘোষণার দিনই পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ