প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্যাটেলাইট ক্লিনিক পাড়ায় পাড়ায়

সমকাল : সংসার সামলানো আর ঘরদোরের সব কাজ করেন মাসুদা আক্তার। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ধুমঘাট চরার চরের বাসিন্দা এই নারী। চর্মরোগ, আমাশয়, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এক সময় তাকে যেতে হতো বাড়ি থেকে প্রায় চার মাইল দূরের কমিউনিটি ক্লিনিকে। এখন আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ঝক্কি পোহাতে হয় না তাকে। পাড়ার ‘স্যাটেলাইট ক্লিনিক’ পারে এসব সমস্যা মেটাতে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ বাংলাদেশের উদ্যোগে শ্যামনগরে এ রকম ৭০টি কমিউনিটিতে গড়ে উঠেছে স্যাটেলাইট ক্লিনিক। সিডর-আইলায় বিধ্বস্ত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে এসব ক্লিনিক। ক্লিনিকগুলোর পাশাপাশি জটিল-কঠিন রোগের চিকিৎসায় উপজেলা সদরের শুয়ালিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে বৃহৎ ‘ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’।

স্যাটেলাইট ক্লিনিকের এ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৩ সালে। একজন প্যারামেডিক ও এক থেকে তিনজন ফ্রেন্ডশিপ কমিউনিটি মেডিক-এইডিস (এফসিএম) নিয়ে গঠিত একটি স্যাটেলাইট ক্লিনিক। ওষুধ বণ্টন, ক্লিনিকের প্রচারণা, সুবিধাভোগীদের ট্রেনিং দেওয়া এবং পুষ্টি প্রদর্শনীতে প্যারামেডিকদের সহযোগিতার জন্য রয়েছেন একজন করে ‘ক্লিনিক-এইড’। বর্তমানে মোট ১৭ জন প্যারামেডিকের সঙ্গে রয়েছেন ১৭ জন ‘ক্লিনিক-এইড’।

এ রকম একজন প্যারামেডিক সোমা হালদার বলেন, চর্মরোগ, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগ এবং পরিবার-পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিষয়াদির ওপর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে। সপ্তাহে বা মাসে একবার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লিনিক বসে। সেদিন ৫০-৬০ জন রোগী আসেন।

কমিউনিটির নারী সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করা হয় এফসিএম। মূলত এফসিএমই হলেন স্যাটেলাইট ক্লিনিকের স্থায়ী প্রতিনিধি। ওষুধ থাকে তারই কাছে। তাদের পুষ্টি, ওষুধ বণ্টন প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ রকম একজন এফসিএম হলেন কৃষক মাজেদ গাজীর মেয়ে রাবেয়া খাতুন। তিনি বলেন, মাসে তারা পাঁচবার উঠান বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে মায়েদের পুষ্টি সচেতনতা তৈরিতে পরামর্শ দেওয়া হয়। আয়োজন করা হয় পুষ্টি প্রদর্শনীর। বিভিন্ন ধরনের সবজি, ডাল, চাল মিশিয়ে সুষম পুষ্টিকর খিচুড়ি তৈরি করে সব শিশুকে খাওয়ানো হয়। মায়েরা যাতে তাদের হাতের কাছে থাকা শাক-সবজি দিয়েই ছোট্ট সোনামণিদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে পারেন, সে জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘পুষ্টি খেতে ফাইন লাগে’- এই অনুভূতি জানিয়ে ৯৪ নং দক্ষিণ শ্রীপলকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আশিক জানায়, মা মাঝে-মধ্যেই ঘরে এই খাবারটি তৈরি করে তাকে খাওয়ায়। গত ৯ সেপ্টেম্বর পুষ্টি প্রদর্শনীতে পাড়ার অন্যান্য শিশু-কিশোরের সঙ্গে সেও অংশ নিয়েছিল।

ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল :২০০২ সালে দেশের নদীতীরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় সর্বপ্রথম ‘লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’ ভিন্নমাত্রা যোগ করে। দক্ষিণাঞ্চলের নোনা জলে ভাসমান মানুষের স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসতে শ্যামনগর সদর ইউনিয়নের শুয়ালিয়ায় ৪৬ হাজার ৭০০ বর্গফুটের বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। স্থানীয় মানুষের দান করা জমিতে এ হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। ২০১৩ সালের শেষদিকে শুরু হয়ে চলতি বছরের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। ২৩৩টি গ্রামের ৭০ হাজার পরিবারের সাড়ে তিন লাখ মানুষ এ প্রকল্পের সুবিধাভোগী হতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সমন্বয়ক শাহীন আহমেদ বলেন, ২৪ ঘণ্টা জরুরি, ফার্মেসি ও ইনডোর সার্ভিসের সঙ্গে রয়েছে অত্যাধুনিক ও সুপরিসর অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি ল্যাব, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ও ডিজিটাল এক্সরে। আরও আছে জেনারেল, ডেন্টাল, চক্ষু, ফিজিওথেরাপিসহ আউটডোর সার্ভিস। স্বল্পমূল্যে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকারী এ হাসপাতাল শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।

প্রকল্পটি সম্পর্কে ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান বলেন, সিডর ও আইলার পর মূলত উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার দিকে দৃষ্টি দেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের পর এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান করতে স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে প্রকল্পগুলো নিয়েছেন তারা। তাদের প্রতি আস্থা রেখে স্থানীয় মানুষ হাসপাতাল নির্মাণে জমি পর্যন্ত লিখে দিয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ