প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শুভ জন্মদিন
মায়াবী মুখের এক দেবশিশু

এম নজরুল ইসলাম : রূপকথার গল্প নয়, মায়াবী মুখের এক দেবশিশুর গল্প শোনাই। তার দুই চোখজুড়ে ছিল অপার বিস্ময়।

ছিল অন্যকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা। সহজাত সারল্য ছিল তার। মা-বাবার মমতা, ভাই-বোনের ভালোবাসার ভেলায় ভেসে দিন যাচ্ছিল তার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বয়স তখন ছিল কাঁচা, হালকা দেহখানা/ ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা। ’ কাঁচা বয়সই ছিল তার। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটির সামনেই লেক। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে সামনে অনেকটা দূর চলে যাওয়া যায়। ধানমণ্ডি লেকের পার আর এই রাস্তা দিয়ে তিন চাকার সাইকেল চালাতে চালাতে একটু একটু করে নিজের চেনা জগতের পরিধি বাড়িয়ে নেওয়ার ভেতর দিয়েই তো দিন কাটত তার। বাড়িতে সর্বকনিষ্ঠ হওয়ায় সবার আদর আদায় করা তো ছিলই।

পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে সবার আদরকাড়া শিশুটির কি কোনো স্বপ্ন ছিল? সকালের সূর্যোদয় কি কোনো বার্তা পাঠাত তাকে? সন্ধ্যার পশ্চিমাকাশ কেন আবির মাখে—এমন প্রশ্ন কি কোনো দিন উঁকি দিয়েছে তার মনে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই তো ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে তাকে। কী দোষ ছিল তার? একরত্তি শিশু, জাগতিক কোনো বোধ যাকে ছুঁয়ে যায়নি তাকে কেন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হলো? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। যে বয়সে আপন ভুবনে রাজা হয়ে থাকার কথা তার, সেই বয়সে তাকে পরপারে পাড়ি জমাতে হলো। স্বপ্নপূরণের বয়স ছোঁয়ার আগেই তাকে পাড়ি জমাতে হয়েছে পরপারে। ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম বুলেট বিদ্ধ করেছিল তাকে। নিষ্পাপ শিশুটি কি বাঁচতে চেয়েছিল? চেয়েছিল নিশ্চয়ই। পার্থিব পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। রাজনীতির দাবার চাল বুঝে ওঠার আগেই নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে তাকে। মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল শিশুটি। তার মা, সর্বংসহা বঙ্গমাতা আমাদের, ততক্ষণে বুলেটের শিকার হয়েছেন। শিশুটিকেও বাঁচতে দেওয়া হয়নি। কবি লিখেছেন, ‘ঘাতক বোঝেনি অবুঝ শিশুর মন/ ঘাতক বোঝেনি বোনদের ভালোবাসা/ ঘাতক কেবল ট্রিগার চালাতে জানে/ ঘাতক বোঝে না জাতির ভবিষ্যৎ। / বর্তমানের মিথ্যা হিসাব নিয়ে ঘাতকরা মাতে হত্যার উল্লাসে/ অবুঝ শিশুও টার্গেট হয় তার। তাতে যে দীর্ঘ হয়েছে দীর্ঘশ্বাস/ সেই কথা ঢের লেখা আছে ইতিহাসে। / শুধু লেখা নেই আড়ালে কাদের বুকে/ শোকের সাগর বয়ে চলে অবিরাম। ’

আকাশের কাছ থেকে উদারতা শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল তার। বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে সে হয়তো দেখত সকালের সূর্যোদয়। পূর্ণিমা রাতের ভরা চাঁদ তার মনে কোনো প্রশ্নের জন্ম দিত কি না, তা আমাদের জানা হয়নি। কিন্তু কল্পনা করতে পারি, সেই শিশুটি নিজের জগতে ছিল রাজা। বাবার ব্যস্ততা, মায়ের গৃহকর্ম, ভাই-বোনদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া দেখে তার শিশুমনেও হয়তো আগামী দিনের স্বপ্ন সঞ্চারিত হচ্ছিল একটু একটু করে।

মায়াবী মুখের এই দেবশিশুর জন্ম এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে। মা-বাবা আর দুই ভাই ও দুই বোনের আদরের এই চপল শিশুটিকে যেন চোখে চোখে রাখত সবাই। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যটি ছিল সবার আদরের, ভালোবাসার। তাকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল বাড়ির সবার। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের সব অভিভাবকই সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। দেখেছিলেন এই শিশুর অভিভাবকরাও। এই শিশুর ছিল দুই ভাই, দুই বোন। দুই ভাইয়ের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী অর্থাৎ তার দুই ভাবি। ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বালক নামে একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘জুটেছি বৌদিদির কাছে ইংরেজি পাঠ ছেড়ে,/মুখখানিতে ঘের দেয়া তার শাড়িটি লালপেড়ে। চুরি করে চাবির গোছা লুকিয়ে ফুলের টবে স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে। ’ এই শিশুও হয়তো শৈশবের চপলতায় তার ভাবিদের এভাবে স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতে পারঙ্গম ছিল।

রাজনৈতিক পরিবারটি ছিল দেশের রাজনীতির কেন্দ্র। কাজেই দিনরাত সেখানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। সবার আদর পেত শিশুটি। সহজাত সারল্য ছিল তার। ছিল অন্যকে আকর্ষণ করার অসামান্য মায়াবী ক্ষমতাও। আপন ভুবনে শিশুরা রাজাধিরাজ। এই শিশুও শিশুরাজ্যের রাজা ছিল। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র হিসেবে সমবয়সী কিছু বন্ধুও ছিল তার। সবার সঙ্গেই ছিল সদ্ভাব। মানুষকে আকর্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা তখনই অর্জন করেছিল সে। স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে গৃহশিক্ষক, সবারই পছন্দের শীর্ষে ছিল সে।

আমরা ধারণা করতে পারি, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে আজকের বাংলাদেশে কিছু না কিছু ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়তো তৈরি হতো তার জন্য। কিন্তু অকালেই তো হারিয়ে গেছে সে। মা, বাবা, ভাই-ভাবিদের হারিয়েছে। নিজেও হারিয়ে গেছে কোন দূরলোকে! সেই অনন্তলোক থেকে কেউ কোনো দিন ফেরে না। শুধু কিছু স্মৃতি রয়ে গেছে তার দুই বোনের মনের গহিন কোণে, যে স্মৃতি তাঁরা বয়ে বেড়াবেন আজীবন। তাঁদের হৃদয়ের সেই গভীর ক্ষত কোনো দিন দেখবে না কেউ। কেউ জানবে না ছোট ভাইটির জন্য দুই বোনের গোপন অশ্রু বিসর্জনের কথা। ছোট ভাইয়ের জন্য দুই বোনের মনে স্নেহ ও ভালোবাসার যে ফল্গুধারা তা বাইরের কেউ বুঝতে পারে না। হয়তো এখনো ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গেলে দুই বোনের চোখে ভাসে সেই মায়াভরা মুখ, সেই দুষ্টুমিভরা চাহনি। কিন্তু বোনের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে ধরা দেয় না আদরের ছোট ভাইটি আর। তাকে আর বুকে তুলে নেওয়া হয় না। শুধু বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো ঝরে পড়ে দুই চোখ বেয়ে অশ্রুর ঝরনা হয়ে।

এই দেবশিশুর নাম শেখ রাসেল। আজ ১৮ অক্টোবর তার জন্মদিন। আজকের সব ফুল বুঝি ফুটেছে শুধু তার জন্য। পাখিদের কণ্ঠে কি আজ রাসেলের গান? আজ পুবের আকাশ কি রাসেলের রক্তের রঙে লাল! দুই বোনের জন্য আজকের দিনটি অন্য রকম। আজ তাঁরা অবগাহন করবেন রাসেলের স্মৃতির সরোবরে। সবার অলক্ষ্যে রাসেল এসে কি ঝাঁপিয়ে পড়বে বোনদের কোলে? আদরের ভাইটির কপালে চুমুর রেখা এঁকে দিয়ে দুই বোনই হয়তো বলবেন, ‘হ্যাপি বার্থ ডে রাসেল!’ আজ হয়তো হৃদয়ের সেলুলয়েডে ধরে রাখা ছবিগুলো তাঁদের চোখে আনবে অশ্রুবন্যা। ছোট ভাইটির মায়াভরা সেই মুখ তাঁদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বেদনার অতল সাগরে। সে বেদনা বইবার ভার শুধুই তাঁদের!

লেখক : অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী

[email protected]
সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ