প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণতন্ত্র শুধু দেশে চাই, দলে নয়

প্রভাষ আমিন : জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্য খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছি। পড়তে পড়তে আমি অভিভূত হয়ে গেছি। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে স্বপ্নে আছি। আহা, এমন চমৎকার একটা দেশ বুঝি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমনও মনে হয়েছে, চাকরি-বাকরি ছেড়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের লড়াইয়ে শামিল হই।

আসলেই যারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চায়, যারা অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়, যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার চায়, স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করতে চায়, সুশাসন নিশ্চিত করতে চায়, ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে চায়, আইনের শাসন কায়েম করতে চায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়, বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়, কোটার সংস্কার চায়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে চায়, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চায়, প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করতে চায়, যারা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন করতে চায়, যারা নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের সঙ্গে না থেকে কারো উপায় আছে?

আপনি এর কোনটার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন? এত ভালো ভালো কথা, সুযোগ থাকলে আমি তাদের দাবি ও লক্ষ্য পুরোটাই তুলে দিতাম। কোনোটাই বাদ দিতে ইচ্ছা করে না। আহা, আমি এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, কবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় আসবে?

কিন্তু যখন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠি, বাস্তবতার কঠিন জমিনে পা রাখি; বুঝতে পারি স্বপ্নের পোলাওয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটু বেশিই ঘি দিয়েছে। তবে তারা কিন্তু ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছেন না। বরং এই স্বপ্ন তাদের ঘুমাতে দিচ্ছে না। তারা দাবি আদায় করে লক্ষ্যে পৌঁছাতে মাঠে নামার কর্মসূচি দিয়েছে। কিন্তু আমি তাদের দাবির পক্ষে থাকলেও বাস্তবতা হলো- সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের মতো মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়ার কোনো সময় বা সুযোগ নেই। ৭ দফা দাবি না মানলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে কিনা, সেই প্রশ্নের জবাব এখনও জানা নেই। তবে ১১ দফা লক্ষ্য অর্জন করতে তাদের ক্ষমতায় যেতে হবে। আর ক্ষমতায় যেতে হলে নির্বাচনে যেতে হবে।

তবে সবগুলো দাবি বা লক্ষ্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ এই পরিসরে নেই। তবুও দেশে যারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চান, যারা ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান; তাদের দলে কতটা ভারসাম্য আছে, কতটা গণতন্ত্র আছে? একটু দেখে আসি চলুন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল নেতা ড. কামাল হোসেন। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গণফোরাম গঠন করেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই, পরিবারতন্ত্র আছে; এ অভিযোগ সত্য এবং পুরোনো। কিন্তু যারা রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তন আনতে চান, যারা দেশে গণতন্ত্র আনতে চান; তাদের দলের কী অবস্থা? গত ২৬ বছর ধরে গণফোরাম মানেই ড. কামাল হোসেন। আইনজীবী হিসেবে তার আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে পুঁজি করেই রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে চায় দলটি। এটা ঠিক গণফোরামে ড. কামালের ধারে-কাছে ঘেষার মতো আর কেউ নেই। পরিচিতিতে ড. কামালের চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে হলেও আরেকজনকেই মানুষ একটু-আধটু চেনে, তিনি হলেন মোস্তফা মহসিন মন্টু। তার সেই পরিচিতিও যতটা না রাজনীতিবিদ হিসেবে, তারচেয়ে বেশি গডফাদার হিসেবে। আওয়ামী রাজনীতিতে জড়িত থাকার সময় তিনি গডফাদার খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। যে ড. কামাল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তার দলের সাধারণ সম্পাদক একজন পরিচিত গডফাদার! ইদানীং অবশ্য গণফোরামে আরেকজন পরিচিত নেতা যুক্ত হয়েছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মনসুর। ১/১১-এর সময় সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে থাকায় ছিটকে গেছেন আওয়ামী রাজনীতি থেকে। নিরুপায় হয়ে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন ড. কামালের ঘরে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আরেক বড় নেতা আ স ম আব্দুর রব। তিনি কিন্তু সত্যিই বড় নেতা। মুক্তি সংগ্রামে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। স্বাধীনতার পর গঠিত জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব এখন বহুধাবিভক্ত জাসদের একটি অংশের নেতৃত্ব দেন। জেএসডি নামে এই অংশে তিনি একাই একশ। এই দলের আরেকজনের নাম মাঝে মধ্যে পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, তিনি তানিয়া রব, যিনি আ স ম রবের স্ত্রী।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। ১/১১ ঝড়ে আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়ার পর তিনি নাগরিক ঐক্য গঠন করেন। ৫ বছর সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করার পর গত বছর জুনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নাগরিক ঐক্য। রবের পাশে তবু তার স্ত্রী আছেন, কিন্তু নাগরিক ঐক্যে মাহমুদুর রহমান মান্না নাগরিক ঐক্য একাই দুইশ।

ফাইনাল রাউন্ডে বাদ পড়ে গেছে, কিন্তু ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা বিকল্পধারায়ও প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বি চৌধুরী এক নম্বর আর তার ছেলে মাহি বি চৌধুরী দুই নাম্বার নেতা।

যারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছেন; তাদের দলে গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই। আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও- বলে একটা প্রবাদ আছে; সেটা বোধহয় ড. কামাল অ্যান্ড গং কখনো শোনেনইনি।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
সূত্র : বার্তা২৪.কম