প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নীতিমালা নেই, অ্যাপস চালুর চিন্তা

মানবজমিন : চার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে আটকে আছে অ্যামু্বলেন্স সেবা নীতিমালা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালা খুব জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মোটরযান আইনটি ১৯৮৪ সালের পুরনো আইন। সব কিছুই সময়ের সঙ্গে যুগোপযোগী করা দরকার বলে তারা মত দিয়েছেন। ওই সময় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে ব্যবসায়িক মনোভাবে ছিল না। এখন কমার্শিয়াল (বাণিজ্যিক) হয়েছে। বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) আইন এবং ট্রাফিক আইনের মধ্যকার জটিলতায় অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে দিন দিন মামলা বেড়েই চলছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি মামলা হয় অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে।

বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৩শ’ থেকে ৪শ লাশ বহন করা হয়। সারা দেশে ১০ থেকে ১২ হাজারের মতো অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করে। ঢাকাতেই চলাচল করে প্রায় ৪ হাজার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুপারিশ থাকার পরও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। এই সেবাটিকে আরো সহজ ও দ্রুত করতে সংশ্লিষ্ট প্রভাইডাররা এখন অ্যাপস ভিত্তিক সার্ভিস দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর অ্যামু্বলেন্স মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নীতিমালা জরুরি। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্স-চার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে আটকে আছে অ্যাম্বুলেন্স সেবা নীতিমালা। নীতিমালার জন্য চাই ঐক্য, যা স্বরাষ্ট্র, সড়ক ও যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে গড়বে সমন্বয়। এখন পর্যন্ত এ সমন্বয় বা নীতিমালা দেখা যাচ্ছে না। তিনি জানান, নিজ নিজ মন্ত্রণালয় আন্তরিক থাকলেও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। ১৯৮৪ সালের মোটরযান আইনের সংশোধন দরকার। এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও হয়নি। আলমগীর হোসেন বলেন, নতুন আইজিপির সঙ্গেও ১২ই আগস্ট বৈঠক করেছি। আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এখনও পদক্ষেপ নেননি। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি সকল অ্যামু্বলেন্স বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন পায় ‘ভাড়ায় চালিত নয়’ মর্মে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি সাংঘর্ষিক একটি বিষয়। এটা সংশোধনের কথা বলেছি বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে। সংস্থাটির চেয়ারম্যানের পরামর্শে গত বৃহস্পতিবার (১১ই অক্টোবর) বিআরটিএ-এর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. নূরুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করি। তিনি তাদের জানিয়েছেন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সে ৬ সিটের জায়গায় ৯ সিট দিতে পারছেন না। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি সমাধান দেবেন পরিচালক। সংগঠনের সভাপতি বলেন, ডিজিটাল হিসেবে তারাও অ্যাপস ভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্সের আধুনিক সেবার সুবিধা দিতে আগ্রহী যাত্রীদের।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বলেন, দিন দিন মামলা বেড়েই চলছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ মামলা হয় অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৩শ’ থেকে ৪শ লাশ বহন করা হয়। কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স লাশ বহন করে না। সারা দেশে ১০ থেকে ১২ হাজারের মতো অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করে। ঢাকাতেই চলাচল করে প্রায় ৪ হাজার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। বিআরটিএ-এর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. নূরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, মোটরযান আইনটি ১৯৮৪ সালের। এখন মানুষ বেড়েছে, চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সবকিছুই সময়ের সঙ্গে যুগোপযোগী করতে হয়। ওই সময় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ব্যবসায়িক মনোভাবে ছিল না। এখন কমার্শিয়াল (বাণিজ্যিক) হয়েছে। আইনের বাইরে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি নতুন সড়ক আইন হয়েছে। এখানে বিধি দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হবে। নতুন বিধিতে অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টি থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, বিআরটিএ আইন এবং ট্রাফিক আইনের মধ্যকার জটিলতায় সৃষ্ট মামলা থেকে জাতীয় জরুরি সেবা অ্যামু্বলেন্স সেবাকে রক্ষার্থে আবেদন করেছে ঢাকা মহানগর অ্যামু্বলেন্স মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড। সংগঠনটি গত ২২শে মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বরাবর ওই আবেদন করেন। আবেদনে তারা এই সেবাকে আরো ত্বরান্বিত ও বেগবান করতে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। মন্ত্রী ওই আবেদনটি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে মার্ক করে দেখার নির্দেশ দেন। সংগঠনের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে আরো বলা হয়, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অন্তর্ভুক্ত অ্যামু্বলেন্স সেবা সারা বাংলাদেশে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহাপুলিশ পরিদর্শক-এর সভাপতিত্বে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এ বছরের ৩রা জানুয়ারি এক গোলটেবিল বৈঠক হয়।

ওই সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ অন্যান্য পুলিশের কর্মকর্তার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বিআরটিএ আইন ও ট্রাফিক আইনের কিছু জটিলতা তুলে ধরা হয়। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি সকল অ্যাম্বুলেন্স বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন পায় ‘ভাড়ায় চালিত নয়’ মর্মে, অ্যাম্বুলেন্সের কোনো রুট পারমিট থাকে না, রোগীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে অ্যাম্বুলেন্স কালোগ্লাস বা কালো পেপারের ব্যবহার, আমদানিকৃত অ্যাম্বুলেন্সের আসন সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা, রোগী বহনের ক্ষেত্রে পার্কিং সংক্রান্ত জটিলতা, অ্যাম্বুলেন্সকে অন্য পরিবহন থেকে বিশেষ লক্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই বিভিন্ন কালারের স্টিকার সংবলিত জটিলতা। বিষয়গুলো প্রত্যেকটি অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য অতীব জরুরি।

কিন্তু বিষয়গুলো সবই ট্রাফিক আইন বিরোধী এবং অ্যাম্বুলেন্স সংক্রান্ত সরকারি কোনো নীতিমালা না থাকায় দিন দিন জটিলতা আরো তীব্রতর হয়ে উঠছে। ফলে প্রতিদিন ভাড়ায় চালিত অ্যাম্বুলেন্সগুলো ট্রাফিক আইনে নিয়মিত মামলার সম্মুখীন হয়ে মালিকরা অনেক অর্থ ভর্তুকি দিচ্ছেন। বিষয়গুলো জানতে পেরে আইজিপি তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিশ্রুতি দেন যে, বিআরটিএ থেকে দেয়া কাগজপত্র ঠিক থাকলে উল্লিখিত বিষয়ে ট্রাফিক আইনে অ্যাম্বুলেন্সকে মামলা দেয়া হবে না এবং এই মর্মে স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এরপর গত ২৬শে জুলাই পুলিশের এআইজি (ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) একেএম মোশাররফ হোসেন মিয়াজী স্বাক্ষরিত এক ঠিকিতে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ৯৯৯-এ অ্যাম্বুলেন্স এর পরিপূর্ণ ডাটাবেজ সংকলন করার জন্য পুলিশ কমিশনার ডিএমপি, সিএমপি, কেএমপি, আরএমপি, বিএমপি, এসএমপি, মহানগরকে অনুরোধ করেন। এছাড়া চিঠির কপি দেশের সকল জেলা পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার (৯৯৯) ঢাকায় পাঠান। এদিকে মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে গাড়ি অনুপাতে অ্যাম্বুলেন্সের আসন নিবন্ধন ও বর্ধিতকরণের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন করেন। সংগঠনটি বলছে অ্যাম্বুলেন্সের চলাচলের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আসন সংখ্যা! বিআরটিএ অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে ৬ আসনে নিবন্ধন দেয়। বর্তমান সময়ের যে অ্যাম্বুলেন্সগুলো নিবন্ধন নেয়া হয় বা হয়েছে তা পূর্বের অ্যাম্বুলেন্সের চেয়ে বেশ বড়, সিসি বেশি, আধুনিক ও বেশি জায়গা সম্পন্ন। যাতে ৯ আসনের জায়গা রয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স প্রসঙ্গে কথা হয় ঢাকা মহানগরে দায়িত্বরত একাধিক পুলিশ সার্জেন্ট-এর সঙ্গে। তারা জানান, অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন তারা পাননি। তবে অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে তারা একটু নমনীয়। বিআরটিএ কাগজপত্র ঠিক থাকলে তারা মামলা দেন না। রোগী নিয়ে উল্টোপথে গেলেও ধরেন না। হোটেল সোনাগাঁও সিগ্যানালে দায়িত্ব পালন করেন সার্জেন্ট রাজীব ও মুসাব্বির। সার্জেন্ট রাজীব মানবজমিনকে জানান, অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে তারা নরমাল (নমনীয়) থাকেন। রোগী নিয়ে উল্টো পথে গেলেও ধরেন না। কিন্তু রোগী ছাড়া উল্টোপথে সাইরেন বাজিয়ে গেলে ধরেন এবং মামলা দেন। অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে কোনো চিঠিপত্র পুলিশের এই কর্মকর্তা পাননি। একই স্থানে দায়িত্ব পালনকারী অপর সার্জেন্ট মুসাব্বির বলেন, যদি কোনো মাইক্রোবাসকে কেটে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে ৬ সিটের জায়গায় ৯ বা ১০ সিট করে রোগী নিয়ে যায় তখন মামলা দেই। কারণ বিআরটিএ’র যে আইন বা অনুমোদন আছে সেটা আমরা অনুসরণ করি। বাংলামোটর মোড়ে দায়িত্ব পালন করেন পুলিশের সার্জেন্ট ইসলাম। তিনি জানান, বিআরটিএ কাগজপত্র সঠিক থাকলে অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দেয়া হয় না। এই মাসে একটি অ্যাম্বুলেন্সও ধরেননি তিনি। গত মাসে দু-একটি ধরেও সঠিক কাগজপত্র থাকায় ছেড়ে দিয়েছেন। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, বিআরটিএ অনুমোদিত আসন ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স পেলে মামলা দেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ