প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুবিধাজনক অবস্থায় জামায়াত?

বিভুরঞ্জন সরকার: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকার কথা জামায়াতে ইসলামীর। এই দলটি একাত্তরে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ-লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। অনেক বছর পরে হলেও শেখ হাসিনার সরকার একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করেছিলেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করেছেন। শীর্ষ অপরাধীদের কয়েকজনের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড, কার্যকর হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। এই বিচারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এই দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছেন। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায়। দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার হারিয়েছে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি বিভিন্ন মহল থেকেই উঠছে। উচ্চ আদালতে এ নিয়ে একটি মামলাও আছে। সরকার বাহ্যত জামায়াতকে আইনি চাপের মধ্যেই রেখেছে।

এতো কিছু সত্ত্বেও মনে হয়, জামায়াত ভালোই আছে। ভালো আছে বিএনপির ছোঁয়ায় এবং ছায়ায়। জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্বটি পালন করেছেন জিয়াউর রহমান; মুক্তিযোদ্ধা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। জিয়া-পরবর্তী সময়েও বিএনপির সব ধরনের আনুকূল্য জামায়াত পেয়েছে। খালেদা জিয়া দুই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের সম্মানিত করেছেন আর অসম্মান করেছেন জাতীয় পতাকাকে। চরম অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এবং সর্বোপরি শহীদদের রক্তের প্রতি। বিএনপির রাজনীতি এখন প্রায় জামায়াত নিয়ন্ত্রিত। জামায়াতের চেয়ে বিএনপির জনসমর্থন অনেক বেশি। কিন্তু তারপরও বিএনপি জামায়াত-নির্ভর একটি দল হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। বিএনপির পেটে জামায়াত ঢুকেছে, নাকি জামায়াতের পেটে বিএনপি- এটা এখন রীতিমতো একটি গবেষণার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত আবার আলোচনায় এসেছে। সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার যে উদ্যোগ-আয়োজন, তার প্রেক্ষাপটেই আলোচিত হচ্ছে জামায়াতের নাম। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার কথা বলা হয়েছিলো। বৃহত্তর ঐক্যে জামায়াতকে না রাখার দাবি অনেকেরই। কিন্তু বিএনপি স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ২০-দলীয় জোটে জামায়াত থাকবে আবার বিএনপি থাকবে ‘জাতীয় ঐক্যে’। হয়েছেও তাই। ড. কামাল হোসেন শুরুর দিকে জামায়াত নিয়ে আপত্তি জানালেও, শেষ পর্যন্ত বিএনপির অবস্থান মেনেই ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছেন। এতোদিনের জামায়াতবিরোধী এবং বঙ্গবন্ধুর ‘সামান্য কর্মী’ কামাল হোসেন এখন জামায়াতের প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছেন। আর জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে এতোদিন যিনি রাজনীতি করতে দ্বিধা করেননি, সেই ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী জামায়াতের প্রশ্নে অনমনীয়তা দেখিয়ে ঐক্যে যোগ দিলেন না। এটাই তার শেষ অবস্থান কি-না সেটাও জোর দিয়ে বলা যায় না। কোন ঘাটে কে নৌকা ভেড়াবেন অথবা কোন মাঠে কে ধানের শীষের চাষ করবেন তা আগে থেকে আন্দাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের রাজনীতির বিচিত্র গতি-প্রকৃতি বোঝা সহজ নয় !

রাজনীতির দৃশ্যমান চাঞ্চল্যের বাইরে অত্যন্ত কৌশলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং অগ্রসর হচ্ছে জামায়াত। প্রকাশ্য এবং গোপন- এই দুই পদ্ধতিতেই কাজ করতে অভ্যস্ত জামায়াত। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক দল হওয়ায় যেকোনো বিপদ-আপদ মোকাবেলায় জামায়াতের মতো পারদর্শিতা এখন আর কোনো দলের নেই। একসময় সিপিবি’র এমন সুনাম ছিল। এখন সিপিবি হীনবল, দুর্বল। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার নিয়ামক শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বসে যাওয়ার পর সিপিবিও ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু জামায়াতের আন্তর্জাতিক মুরুব্বি সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্ব এখনও সক্রিয় এবং দাতার ভূমিকায় আছে। ফলে অভ্যন্তরীণভাবে কিছুটা বেকাদায় থাকলেও জামায়াতের কার্যক্রম বন্ধ নেই। জামায়াতের আর্থিক সক্ষমতাও বহাল আছে। তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াত তাদের কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের মগজ ধোলাইয়ের কাজটি নিখুঁতভাবে করছে। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ইতিবাচক কাজ করছে শেখ হাসিনার সরকার, আর নারী ভোটাদের প্রভাবিত করছে জামায়াত। মসজিদসহ মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে জামায়াত ।

মাঝে মাঝে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের মনোমালিন্যের খবর প্রচারিত হলেও সেগুলো বড়ো ধরনের কোনো সংকট তৈরি করে না; করবে বলেও মনে হয় না। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত আলাদা প্রার্থী দিয়ে একদিকে বিএনপিকে চাপে রাখতে চেয়েছে; অন্যদিকে নিজেদের শক্তিরও পরিচয় দিতে চেয়েছে । সিলেটে জামায়াত প্রার্থী হাজার দশেক ভোট পেয়েছেন। এ থেকে কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াতকে যতোটা সবল মনে করা হয় ততোটা সবল তারা নয়। এই ধারণাটা সঠিক নয় বলেই আমার মনে হয়। জামায়াত সিলেটে কৌশলের খেলা খেলছে। নিজেদের প্রার্থী দিলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত তাদের ভোট বিএনপিকেই দিয়েছে। বিএনপির মন ভালো করা এবং সরকার বা আওয়ামী লীগকে কষ্ট দেওয়ার কাজটি জামায়াত চাতুর্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করেছে।

আগামী নির্বাচনেও জামায়াত এই কৌশলের খেলাই খেলবে বলে মনে করার কারণ আছে। সরকারকে ধোঁকা দেবে, বিএনপিকে করবে সহযোগিতা। জামায়াত জানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মৈত্রী করলে তার ভোট এবং সিট কমে। আর বিএনপির সঙ্গে থাকলে ভোট বাড়ে, সিটও বাড়ে। তাই বিএনপিকে বুক এবং আওয়ামী লীগকে পিঠ দেখানোর রাজনৈতিক লাইনের বাইরে যাবে না। অথচ দুই পক্ষকে খুশি রেখে নিজেদের বেশ আরামেই আছে জামায়াত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ