প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বালুগর্ত গিলছে গ্রাম

কালের কন্ঠ : যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম বালুর গর্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এলাকাবাসী প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে। কিন্তু, প্রশাসনের কর্মকর্তারা চোখে ঠুলি পরে থাকায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারছেন না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৭.৩৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাতিবিলা ইউনিয়নের অবস্থান। ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের মধ্যে ছোট নিয়ামতপুর, বড় নিয়ামতপুর, পাতিবিলা, মুক্তদাহ, হয়াতপুর বালু উত্তোলন চক্রের ফাঁদে পড়েছে।

চৌগাছা-কোটচাঁদপুর পাকা সড়ক ধরে পাতিবিলা ইউনিয়নে ঢুকলে সড়কের দুই পাশে বালু উত্তোলনের দৃশ্য চোখে পড়ে। শত শত বিঘা জমি বিলীন হয়ে গেছে। পাকা সড়কও ক্ষতির মুখে। যেকোনো সময় পাকা সড়ক ধসে পড়বে। প্রতিদিন এই ইউনিয়ন থেকে কমপক্ষে ৫০০ থেকে এক হাজার ট্রাক বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। চাষযোগ্য জমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এলাকার পুকুরগুলোও বালুগর্তে ধসে পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পাতিবিলা ইউনিয়নের মানচিত্রই পাল্টে যেতে পারে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বসবাস এলাকা, মাঠের জমি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশির ভাগ জমিতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সবজি ও বাদাম চাষের জন্য ইউনিয়নটি বিখ্যাত হলেও ধীরে ধীরে আবাদি জমি সংকুচিত হচ্ছে। কৃষক ও গ্রামবাসীকে প্রলোভনে ফেলে ব্যবসায়ীচক্র বালু উত্তোলন করছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামবাসী বাধা দিলেও জোর করা হচ্ছে।

বড় নিয়ামতপুর গ্রামের মিজানুর রহমান, জমিরউদ্দীন, হাবিবুর রহমান, আব্দুর রব, ইউনুচ আলী অভিযোগ করে বলে, এ গ্রামের শহীদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ভনা, মহাসীন রেজা, নুরুল আমিন ও পাতিবিলা গ্রামের আতিয়ার রহমান বালু উত্তোলন করে বেচে। প্রতিদিন ১০-১৫ টি ট্রাকে ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক বালু উত্তোলন করছে। বারবার বাধা দিলেও কাজ হচ্ছে না। প্রভাবশালী মহলের মদদে তারা কাউকে তোয়াক্কা করছে না।

গত কয়েক মাসে বালু উত্তোলনের ফলে গ্রামের মমিনুল হকের জমি ও বেশ কয়েকটি বড় মেহগনি গাছ পুকুরে তলিয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘বেশ কয়েকবার বালু উত্তোলনকারীদের বারণ করেছি। তার পরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি।’ গ্রামের আমিনুল হক বলেন, ‘পুলিশকে জানিয়েছি। কিন্তু থানা পুলিশ বলেছে, জমির বিষয়ে আমরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারি না। ভূমি কর্মকর্তা কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আপনারা জানান।’

বালু উত্তোলনের ফলে অনেকের বাড়ির রাস্তা ধসে গেছে। ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম, ওলিয়ার রহমান, রবিউল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম বলে, ‘ইউনিয়ন পরিষদের নায়েবকে বিষয়টি জানিয়েছি। তারপরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি।’

ভুক্তভোগী নুর ইসলাম, শামছুল আলম, রুহুল আমিন, মশিয়ার রহমান, নূর নবি, নাসির উদ্দিন অভিযোগ করে বলে, তারা নুরুল আমিন ও আতিয়ার রহমানকে ডেকে তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা দেখিয়েছে। একই সঙ্গে বালু উত্তোলন করতে নিষেধ করে। কিন্তু তারা কোনো কথা শুনছে না। হয়াতপুর এলাকায় সাবেক এক জনপ্রতিনিধির সহযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী মর্জাদ বাঁওড় থেকে অবৈধ পন্থায় উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। গ্রামের নিচ দিয়ে প্রবহমান এই বাঁওড়ে কমপক্ষে পাঁচটি স্থানে বসানো হয়েছে ড্রেজার। দিন-রাত যন্ত্রের মাধ্যমে বাঁওড়ের তলদেশ থেকে তুলে আনা হচ্ছে বালু। সেই বালু বাঁওড়পারেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।

গ্রামবাসী জানায়, পাতিবিলা গ্রামের সাইফুল ইসলাম, বিপ্লব হোসেন, ফারুক হোসেন, আব্দুল মমিন, কামাল হোসেন, আশরাফ হোসেন, রুলু মিয়া, নিয়ামতপুর গ্রামের ফজলুর রহমান, হয়াতপুর গ্রামের জসিম উদ্দিন বাঁওড় থেকে বালু উত্তোলন করে। এর ফলে আশপাশের জমি, বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান লিফটন জানান, পাতিবিলা ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ পাঁচ হাজার ১৫৪ একর। এর মধ্যে নিয়ামতপুর, বড় নিয়ামতপুর, পাতিবিলা, মুক্তদাহ, হয়াতপুর গ্রামে জমি রয়েছে প্রায় ২১ একর। বালু উত্তোলনের ফলে ১৩৩ একর অর্থাৎ ৪০০ বিঘা জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কমপক্ষে শতাধিক ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে আগে ফসলি জমি ছিল। তিনি বলেন, ‘বালু উত্তোলনের বিষয়টি বারবার উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। এরই মধ্যে বিশে মেম্বারের বালু উত্তোলনের শ্যালো মেশিন জব্দ করা হয়েছে।’

চৌগাছা থানার দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আকিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। কিন্তু ভূমির বিষয়টি আমরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারি না। এটা ভূমি অফিসের বিষয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা ভূমি কর্মকর্তা যদি আমাদের বিষয়টি লিখিতভাবে জানান, তাহলে আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারব।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফুল আলম বলেন, ‘বালু উত্তোলনের বিষয়ে গত সোমবার একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। ঘটনাস্থলে যাব। পরিবেশের ক্ষতি করে কেউ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত