প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির দুর্গে মরিয়া আওয়ামী লীগ

সমকাল : বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম। এখন সেই দুর্গ আগলে রাখতে পারছে না দলটি। গত ১০ বছরে দেশের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ এই জেলায় ভালো অবস্থান গড়ে তুলেছে আওয়ামী লীগ। সরকারের ধারাবাহিকতা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলেও আস্থা অর্জন করেছে তারা। বিপরীতে এখানকার বেশিরভাগ আসনে এলোমেলো হয়ে পড়েছে বিএনপি। সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মামলা ও ধরপাকড়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলছুট হয়ে গেছে। পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে দলটি। তবে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এই দুর্গ পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে প্রস্তুত আওয়ামী লীগ। জেলার মোট ১৬ আসনের সবগুলোতে জয় নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে মাঠে রয়েছে তারা।

চট্টগ্রাম একটি জেলা হলেও চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চল নিয়ে রাজনৈতিক তিনটি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। রাজধানী ঢাকার পরই চট্টগ্রামের এসব সাংগঠনিক জেলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে দলগুলো।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এমএ ছালাম এবং মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন  বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কল্পনাতীতভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। চলমান এই ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারেরও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। তাই আগামী নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রামের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় শুধু বিপুল উন্নয়ন কাজই হয়নি, সেই সঙ্গে দলকেও শক্তিশালী করা হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি এমএ হালিম দাবি করেছেন, চট্টগ্রামের মানুষ বিএনপিকে ভালোবাসে। আগের নির্বাচনগুলোর ফলাফলের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। মামলা, গ্রেফতারসহ বিভিন্নভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এতে বিএনপি দুর্বল হচ্ছে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে দল হিসেবে জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই এর প্রতিফলন ঘটবে।

চট্টগ্রাম জেলায় রয়েছে জাতীয় সংসদের ১৬টি আসন। এগুলো হলো- চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই), চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড), চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী), চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান), চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া), চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও), চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া), চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী), চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া), চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ), চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী)।

চট্টগ্রামের বেশিরভাগ আসনই ছিল বিএনপির দখলে। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে জয়ী হয় বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে এসব দুর্গে ধীরে ধীরে দূর্বল হতে শুরু করে দলটি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রায় দুর্গছাড়া তারা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে দুর্বল হয়ে পড়েছে বিএনপি। বিশেষ করে রাউজানে আওয়ামী লীগের সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম ও রাঙ্গুনিয়ায় সাংসদ ড. হাছান মাহমুদের দাপটে কোণঠাসা বিএনপির নেতাকর্মীরা। অথচ একসময় এসব এলাকা ছিল বিএনপির দখলে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে রাঙ্গুনিয়ায় সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ২০০৮ সালে নির্বাচনে আসন দুটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী বলা হয় রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন মামলায় কারাবন্দি নেতা আসলাম চৌধুরীকে। তার অনুপস্থিতিতে বিপাকে পড়েছে বিএনপিও। কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে জয় ছিনিয়ে আনার মতো প্রার্থী সংকটে পড়বে দলটি।

চট্টগ্রামের পটিয়া আসনে ভালো অবস্থান গড়ে তুলেছে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করে সাংসদ হন সামশুল হক চৌধুরী। উন্নয়নসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। এর আগে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েল আসনটি থেকে সাংসদ নির্বাচিত হলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সপরিবারে কানাডায় চলে যান। আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছেন তিনি। এতে বিএনপির রাজনৈতিক গতি কমে গেছে। এ সুযোগে এগিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ।

বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনটিকে একসময় বিএনপির আসন বলা হতো। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী মইনুদ্দিন খান বাদলের কাছে আসন হারানোর পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি। এখানে দলটির প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান এবার প্রার্থী হতে পারেন। কিন্তু দলের অগোছালো অবস্থা বিএনপিকে ভোগাতে পারে। আনোয়ারা আসনটিও ছিল বিএনপির। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জ্যেষ্ঠ ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ গত নির্বাচনে সাংসদ হওয়ার পর এলাকায় প্রচুর উন্নয়ন কাজ করেছেন। আসনটিতে এবার তিনি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী। আরও কয়েকজনকে নিয়ে আওয়ামী লীগ টেনশনমুক্ত হলেও এখানে কয়েক ভাগে বিভক্ত বিএনপির এলোমেলো অবস্থা।

আরও কয়েকটি আসনে বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি। আগামী নির্বাচনে এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হবে দলটিকে। সব মিলিয়ে এক সময় বিএনপির দখলে থাকা আসনগুলোতে ‘হানা’ দিয়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে আওয়ামী লীগ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ