প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘চৌধুরী এন্ড সন্স’ বড় মগবাজার থেকে বারিধারা

এরশাদুল আলম প্রিন্স : আলোচনায় এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তার মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। বিষয়টি স্পষ্ট হয় ১৩ অক্টোবরের ঐক্যপ্রক্রিয়ার সংবাদ সম্মেলনে বি চৌধুরীর অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে। একই দিনে বি. চৌধুরী কামাল হোসেনের বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে ফিরে গিয়েছেন। এ বিষয়টি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য সত্যি অপমানজনক। ড. কামাল হোসেন সাধারণত শনিবার তার চেম্বারেই থাকেন। কিন্তু এসময়ে ড. কামাল হোসেন কেন তাকে বাসায় দাওয়াত দিলেন আর কেনই বা দাওয়াত দিয়ে তিনি চেম্বারে চলে গেলেন তা এখন জলবত তলরং।

এ থেকে এটাই পরিষ্কার যে ড. কামাল সেদিন বি. চৌধুরীর সাথে দেখা করতে চাননি, চাননি তার ঐক্য প্রকিয়ায় চৌধুরীকে শামিল করতে। আর বি. চৌধুরীও নেতৃত্বের প্রশ্নে ছাড় দিতে চাননি গণফোরামকে।

নেতৃত্ব ও সুযোগের সদ্ব্যবহার সবাই করতে চায়। কিন্তু বিকল্প ধারা সে সুযোগের অতিব্যবহারে সব সময়ই অগ্রগামী, কিন্তু কৌশলী নয়। ফলে নেতৃত্ব ও কৌশলের প্রশ্নে তাদের অবস্থান খুব সহজেই ধরা খেয়ে যায়।

নির্বাচন সামনে রেখে একটি ঐক্য প্রকিয়া শুরু হয়েছে। বিএনপি ১৯৭৮ সাল থেকে এপর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে। এরশাদ বিএনপির অনেক লোক বাগিয়ে নিয়ে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু এরপরও বিএনপি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বি. চৌধুরীকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি করেছে। কিন্তু আবার বঙ্গভবন থেকে বেরও করে দিয়েছে। বি. চৌধুরী এমন কোনো অপরাধ করেনি যে জন্য তাকে এই শাস্তি ভোগ করতে হবে। দলের রাষ্ট্রপতি বদল হতে পারে। কিন্তু তা না করে শেষ পর্যন্ত তাকে বিএনপি থেকে বেরই করে দেয়া হলো। কিন্তু, কথা আছে, চিরদিন কারো নাহি সমান যায়। চৌধুরী সাহেবের দিন ফিরেছে। বাবার অপমানের বদলা নিতে এবার তাই মাঠে নেমেছে ছেলে। বাপকা বেটা, সিপাইকা ঘোড়া।

ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হবার প্রথম দিক থেকেই বিএনপি এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার একটা মওকা খুঁজছিল। ওদিকে আওয়ামী লীগও তার বিদ্যমান ১৪ দলীয় জোটের বাইরে বাম দলগুলোকে সাথে নিয়ে জোটের পরিধি বাড়াতে তৎপর। এরই ধারাবাহিকতায় ওবায়দুল কাদের সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছেন বামজোটের অন্যতম নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের কাছে। ওবায়দুল কাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন এ সময়ে হঠাৎ এ সাক্ষাৎ। ওবায়দুল কাদেরের জবাব, সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছি। ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন দুই বছর আগে। আর সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য এসেছেন দুই বছর পরে। পুরানা পল্টন থেক বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দূরত্ব দুই মাইলের বেশি হবে না আশা করি। কিন্তু তাও আমরা আশা করতেই পারি, রাজনীতিতে ‘সৌজন্য’ এখনও হারিয়ে যায়নি। তবে নির্বাচনের আগে এমন সৌজন্যবোধ বাড়ে বৈ কমে না। ব্যতিক্রম শুধু ড. কামাল হোসেন। তিনি বি. চৌধুরীকে দাওয়াত দিয়ে বাসায় তালা ঝুলিয়ে অফিস করতে গিয়েছেন।

যাই হোক, এমনই এক সৌজন্য সাক্ষাতে মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গিয়েছিলেন বদরুদ্দোজার বাসায়। রাজনীতিতে একটা কথা আছে, রাগ, লজ্জা, ভয়-এ তিন থাকতে নয়। তাই ফখরুল অতীত ভুলে গিয়েছেন বদরুদ্দোজার সাথে দেখা করতে। তাদের সাথে একটা জোট করা যায় কিনা এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে। কিন্তু অতীত কি এতো সহজে ভোলা যায়? কিন্তু অপমান যে সয় সেই বোঝে এর জ্বালা। তাই চৌধুরী ও তার পুত্র মীর্জাকে ১৫০ আসন দিতে রাজি হয়েছেন। এই শর্তে তারা বিএনপির সঙ্গে জোট করতে রাজি আছে এমন কথা শুনিয়ে দিয়েছেন বাপ-বেটা।

বিএনপিরতো শরীকের অভাব নেই। কমপক্ষে ২০। বিকল্পধারা যদি বিএনপিকে ১৫০ আসন দেয় সেই ১৫০ আসন তো ভাগাভাগি করতে হবে তার ওই ২০ শরীকের কাছে। তা সত্ত্বেও ‘চৌধুরী এন্ড সন্স’ এর এমন প্রস্তাবও বিএনপি হাসিমুখে হজম করে নিয়েছে। কিন্তু হজম হয়েছে কি? আসলে সব কিছুই হজম হয় না। হজমেরও একটা সীমা আছে। রাজনীতিও এর বাইরে না। চৌধুরী পরিবার গণভবন থেকে বের হয়ে আসার কথা এতো সহজে হজম করবেন কী করে? বিকল্পধারা বারবার ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্যই নাকি এমন প্রস্তাব দিয়েছেন। ক্ষমতার এ ভারসাম্যের সুযোগে নাগরিক ঐক্যের মাহামুদুর রহমান মান্নাও দুই বছরের জন্য গদির গরম সহ্য করতে চান। আর এদিকে, লোকে এখন সামাজিক গণমাধ্যমে বলাবলি করছে, এবার হয়েছে আসল ক্ষমতার ভারসাম্য, বাবা ১৫০, ছেলে ১৫০। এর চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য আর কী হতে পারে!

চৌধুরী সাহেবের বারিধারার বাসায় (২৫ সেপ্টেম্বর) মাহি চৌধুরী সভা শেষে বলেছিলেন, ঐক্যে আসতে হলে জামায়াতকে ছাড়তে হবে বিএনপির্। বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিতে ছেলে সেদিন আরো বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী দল বা ব্যক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনও ঐক্য হতে পারে না। বিএনপির সঙ্গে আমরা জাতীয় ঐক্য চাই। তবে ঐক্যে আসতে হলে বিএনপিকে অবশ্যই জামায়াতকে ছেড়ে আসতে হবে।

একই কথার প্রতিধ্বনি শুনি মাহি-মান্নার ফোনালাপে। ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্য থেকে ছিটকে পড়ে মাহি চৌধুরী ফোনে অনেক অভিযোগ করেছেন। মাহি যেসব কথা বলেছেন, তা আপাতত শ্রুতিমধুর মনে হলেও অতীতের অনেক কথাই মনে করিয়ে দেয়।

মাহি বি চৌধুরী এ ঐক্য প্রক্রিয়াকে ‘ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’, ‘বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর ঐক্য, ‘জামায়াতের সাথে গোপন আতাত’, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। এসব অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নিয়ে আমার এ লেখা নয়। বরং বিকল্পধারার এ অভিযোগের যৌক্তিকতা নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই।

বিকল্পধারা এই ষড়যন্ত্র ও আতাত থেকে বাইরে থেকে শোকর করছে। রাজনীতিতে শোকরিয়া আদায়েরও এক নজির সৃষ্টি করলেন মাহি। যদি তাই হয়, নাগরিক হিসেবে আমরাও শোকর আদায় করছি। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করা ও জামায়াতের সাথে যে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন তা কি নতুন কিছু? ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ে তারা হঠাৎ এসব অভিযোগ করছেন কেন? বিএনপির সাথে বা জামায়াতের সাথে কি সিনিয়র চৌধুরীর জামানায় ঐক্য হয়নি? নাকি সে ঐক্যে বি. চৌধুরী ছিলেন না?

জিয়ার আমলে ১৯৭৮ সালের ৩ জনু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। ১২ জুন জিয়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। জিয়ার ৩০ সদস্যবিশিষ্ট ওই মন্ত্রিসভায় বদরুদ্দোজা চৌধুরীও ছিলেন, দুইজন ছিলেন মুসলিম লীগের।সেদিন মুসলিম লীগ হালাল হলে আজ জামায়াত তাদের কাছে হারাম হলো কীভাবে? মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা কি কেউ কম করেছে? আসলে রাজনীতিতে আজ যা হালাম কাল তা হারাম। স্থান, কাল, পাত্র, অবস্থা ও অবস্থান ভেদে এটি নির্ধারণ করা হয়।

আজকে বদরুদ্দোজা চৌধুরী জামায়াত বর্জন করে সাধু বনে গেছেন। কিন্তু জামায়াতকে রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জিয়াউর রহমান। আর তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, মন্ত্রী। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির ৭৬ সদস্যের আহবায়ক কমিটি করা হয়। এই কমিটির ৪ নম্বর সদস্য ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান আর ৯ নম্বর সদস্য ছিলেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সেদিনতো তার শাহ আজিজের সাথে একই আহবায়ক কমিটিতে থাকতে বাধেনি।

১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির পুর্নাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এখানে ১২ সদস্যের একটি স্থায়ী কমিটিও ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিতেও শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন। চৌধুরী সাহেব সেই স্থায়ী কমিটিতেও ছিলেন। জিয়াউর রহমান চৌধুরীকে দলের মহাসচীবও করেন। দলের মহাসচীব হওয়ার পর দলের নীতিগত কারণে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন, কিন্তু শাহ আজিজ থাকায় স্থায়ী কমিটির পদতো ছাড়েন নি। জাতি কি ভুলে গেছে, শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করেছে জিয়া। এই শাহ আজিজ বাংলাদেশর বিপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে হেন কাজ নাই যা করেন নি।

আজ জুনিয়র চৌধুরী বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিতে বিএনপি-জামায়াতকে গালাগাল দিচ্ছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বয়ান করছেন। আমরা অখুশি না, বরং খুশি। কিন্তু সেদিন সিনিয়র চৌধুরীই বয়ান করেছিলেন, ‘রাজনৈতিক শূন্যতা তখন ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছিল। জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্ভুত বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, উৎপাদন ও সমাজকর্ম সমন্বিত রাজনীতি দিতে পারবে, এমন রাজনীতির জন্য দেশ ও জাতি তাকিয়ে ছিল অনেক আশা ভরসা নিয়ে। কেননা এগুলোই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আসল চেতনা। এই প্রতিটি মূল্যবোধকে আওয়াম বাকশালী সরকার সম্পূর্ণ ধ্বংস করে গেছে ‘৭২-৭৫ সালে। ইতিহাস বরই নির্মম।

বিএনপির ওপর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর গোস্বা অযৌক্তিক না, কারণ বিএনপি তাকে দল থেকে বের করে দিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু জামায়াতের ব্যাপারে তার এলার্জির কারণটি বোধগম্য নয়। কারণ, বিএনপি-জামায়াত জোটের স্বর্ণযুগের তিনি ছিলেন অন্যতম কারিগর। প্রধান কারিগর ছিলেন জিয়া।

বিএনপির ওপর তার ক্ষেদ থাকাই স্বাভাবিক। কারণ, জাগদল থেকে বিএনপির জন্মলগ্নে এমনকি তারও আগে যখন জিয়া রাজনীতিতে আসি-আসি করছেন তখন থেকেই বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন জিয়ার ছায়ার মতো। জীবনের শেষ রাতটিও ছিলেন জিয়ার সাথেই। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭৮ সালের ৩০ আগস্ট বিএনপি দল হিসেবে অনুমোদনের যে আবেদন করে তাতে অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (তখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী) বড় মগবাজারের বাসার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। চৌধুরী পরিবার এখন বড় মগবাজারে থাকেন না। বিএনপি এখন বড় মগবাজারে নেই। দূরত্ব বেড়েছে অনেক। চৌধুরী পরিবার এখন বারিধারায়। বিএনপি আজ নয়াপল্টন, কাল হাওয়া ভবন, পরশু গুলশান, পরের দিন নাজিমুদ্দিন রোডের পুরান কারাগার, তার পরের দিন লন্ডন-মানে ছন্নছাড়া। সেখানে এ ঐক্যে কী আসে যায়? তবুও বেঁচে থাকুক, ‘সৌজন্যবোধ’ ও ‘শোকরিয়া’ আদায়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

সূত্র : বার্তা২৪.কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত