প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মনোনয়ন জুটবে কার ভাগ্যে

মানবজমিন : তোফায়েল আহমেদের নিজ জেলা ভোলা। রাজনীতির ইতিহাসে ঠাঁই করে নেয়া বর্ষীয়ান নেতা, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদের পরিচিতি দেশজুড়ে। মেঘনা পাড়ের দৌলতখান আর প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ বোরহানউদ্দিন উপজেলা নিয়ে গঠিত ভোলা-২ আসন। এক সময় এ আসনের এমপি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তার ছেড়ে দেয়া এ আসনে একাদশ নির্বাচন নিয়ে অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে প্রচারণা। এরই মধ্যে পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে ২ উপজেলা। হাটবাজার ও মহল্লার চায়ের দোকানে চলছে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে আলোচনা। তাদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন ভোটাররা।

স্বাধীনতার আগে দৌলতখান, তজুমদ্দিন ও মনপুরা উপজেলা নিয়ে ছিল ভোলা-২ আসন। দেশ স্বাধীনের পর এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষাসৈনিক রেজা-এ-করিম চৌধুরী (চুন্নু মিয়া)। পরে বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান নিয়ে আসনটি পুনর্বিন্যাস হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি নেতা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে হাইকমান্ড সিদ্দিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের পরবর্তী সময়ে ৪ বার আওয়ামী লীগ ও একবার বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে পর পর দুইবার তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০১ সালে বিএনপি’র মনোনিত প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম এ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১/১১ সরকারের বিভিন্ন মামলার জটিলতার কারণে হাফিজ ইব্রাহিম ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। ওই সময় বিজেপি’র প্রার্থী ডক্টর আশিকুর রহমান শান্ত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলেও তোফায়েল আহমেদ বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তোফায়েল আহমেদ ভোলা-১ (সদর) আসনে নির্বাচন করায় ভোলা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী তোফায়েল আহমেদের ভাতিজা আলী আজম মুকুল নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। নির্বাচিত হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। নদী ভাঙন রোধে ব্লক নির্মাণ, বন্যার পানি ঠেকাতে বেড়িবাঁধ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্রিজ-কালভার্ট ও পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের বিপদে আপদে কাছে থেকে খোঁজখবর রাখায় ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছেন। দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় সভা করছেন। উঠান বৈঠকও করেছেন প্রায় প্রতিটি গ্রামে। ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে জানান দলের তৃণমূলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

এমপি সদস্য আলী আজম মুকুলের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নাজিউর রহমান মঞ্জুর মেজো ছেলে ড. আশিকুর রহমান শান্ত। ড. শান্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিনে গণসংযোগ করছেন। এলাকায় পোস্টার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থিতার কথা। ইতিমধ্যে সন্ত্রাসমুক্ত ভোলা গড়তে ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণা চালিয়েছেন। উপজেলায় নির্বাচনী কেন্দ্রে কেন্দ্রে কমিটিও করছেন তিনি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগও রক্ষা করছেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন ভাষাসৈনিক ও সাবেক এমপি মরহুম রেজা-এ-করিম চৌধুরী চুন্নু মিয়ার ছেলে ও বোরহানউদ্দিন উপজেলা চেয়ারম্যান মহব্বত জান চৌধুরী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার আমলে দৌলতখান-বোরহানউদ্দিনের ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভাগ্যের উন্নতি হয়নি, আমি নির্বাচিত হলে সেদিকেই আগে নজর দেবো। আমার পিতা দেশ স্বাধীনের পর এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এখানকার জনগণের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ভোলা-২ আসনের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন। আমিও আমার পিতার মতো জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। জননেত্রী আগামী নির্বাচনে এমপি পদে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কৈশোর থেকে দেখে এসেছি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই এদেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তার উন্নয়নের কথা দেশবাসী ভুলতে পারেনি। আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার আমলের উন্নয়নের ছোঁয়া রয়েছে। যত ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে সবই তিনি করেছেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে এদেশের মানুষ আবারো ক্ষমতায় দেখতে চায়। আল্লাহর রহমত থাকলে জাতীয় পার্টি থেকে ভোলা-২ আসনে আমি মনোনয়ন পাবো। পার্টিতে আমি অনেক মূল্যায়ন পেয়েছি। এবার দৌলতখান-বোরহানউদ্দিনের জনগণের সেবা করতে চাই।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আসনে যাকে মনোনয়ন দেবেন তার জন্যই দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কাজ করবেন।

অন্যদিকে, নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। বিএনপি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতাকর্মীরা ব্যাপক নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা-মামলা মোকাবিলা করে নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহিম নিয়ন্ত্রণ করছেন দৌলতখান- বোরহানউদ্দিন বিএনপি। বিভিন্ন মামলার জটিলতা থাকার পরেও তিনি মাঠে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। বিএনপি’র আমলে দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিনে ব্যাপক উন্নয়ন ও নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে তিনি তাদের খোঁজখবর রাখায় তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। রাজনৈতিক মাঠে বিভিন্ন দিবস, সভা-সমাবেশ উপলক্ষে ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার সাঁটিয়ে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছেন। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমের মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত। স্থানীয় বিএনপি’র নেতারা জানান, মামলা জটিলতার কারণে হাফিজ ইব্রাহিমের মনোনয়ন নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হলে তার স্ত্রী ও ছেলে রয়েছেন। তাদের যেকোনো একজন মনোনয়ন চাইবেন।

এ ছাড়াও বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে জাহাঙ্গীর এম আলমের নামও শোনা যাচ্ছে।
আলী আজম মুকুল মানবজমিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছি। আমার জীবন বাজি রেখে নির্বাচনী এলাকার জন্য ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিনবাসীকে রাক্ষুসী মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার করাল ভাঙন থেকে বাড়িঘর ও ফসলি জমি রক্ষার জন্য সাড়ে ৯ কিলোমিটার সিসি ব্লকের কাজ করছি। রাস্তাঘাট নির্মাণসহ এলাকার ৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি করতে সফল হয়েছি। এই এলাকার মানুষ উন্নয়নে বিশ্বাসী। আমি আগামীতেও এ উন্নয়ন অব্যাহত রাখবো। এলাকার মানুষ ফের আমাকে এমপি হিসেবে দেখতে চায়। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী আমাকে আবারো মনোনয়ন দিয়ে এলাকার উন্নয়নের সুযোগ দেবেন।

ড. আশিকুর রহমান শান্ত মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে ভোলা-২ আসন থেকে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো। দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিন থেকে সকল ধরনের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূল করবো। আমি নৌকার লোক। যতদিন বাঁচবো নৌকা ও আওয়ামী লীগের হয়েই থাকবো। আমি মনোনয়ন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। ভোলা-২ আসনের জনগণ আমার সঙ্গে আছেন। আপাতত দুর্নীতি মুক্ত নাগরিকবান্ধব আধুনিক ভোলা গড়ার কাজ করে যাচ্ছি।

সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম মানবজমিনকে বলেন, ‘আমি ভোলা-২ আসনে সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেছি। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এলাকায় নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেছি। আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত রাখবো। দেখছি এ আসনের বেশির ভাগ মানুষ আবারো আমাকে সংসদে দেখতে চায়। দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। তাই দলীয় নেতাকর্মীদের আমার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস আছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ